ফতুল্লায় বধ্যভূমি

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৩ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ রবিবার

ছবি প্রতিকী
ছবি প্রতিকী

পৃথিবীর অনেক দেশই সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আর এ অর্জনের জন্য তাদেরকেও দিতে হয়েছে চড়া মূল্য। বাঙালি জাতিকেও পাড়ি দিতে হয়েছে সুদীর্ঘ এক পথ। আর এ পথের বাকে বাকে কত অমূল্য জীবন অকালে ঝরে গেছে তার হিসেবও বা কে রেখেছে। এমনি এক অজানা অজ্ঞাতনামা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত বধ্যভূমি-৭১।

ফতুল্লার ফাজিলপুর এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত হয় ২০১০ সালে। বধ্যভূমি ৭১` রক্ষার্থে শহীদস্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ নামে একটি কমিটিও হয়। যেখানে রয়েছেন কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালে টানা নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে ৩০ লাখ প্রাণ আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করে বহু সাধনার স্বাধীনতা। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বাঙালি জাতিই আজ গর্ব করে বলতে পারে, এত ত্যাগ আর এত রক্ত কোন জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য দেয়নি। ৬৮ হাজার গ্রাম অধ্যুষিত এ জনপদে এমন একটি গ্রাম খুঁজে পাওয়া যাবে না যে গ্রামের একটি লোকও যুদ্ধে শহীদ হননি। এদিক দিয়ে বলা চলে তখন পুরো দেশটাই ছিল একটা বধ্যভূমি। হারিয়ে যাওয়ার পথে বধ্যভূমি-৭১ নারায়ণগঞ্জের ফতুলার উপকণ্ঠে পঞ্চবটি তদানীন্তন পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল (বর্তমানে যমুনা অয়েল) নদী সংলগ্ন। আর এর  পাশ দিয়েই বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। যে নদীতে হত্যা শেষে ফেলা হতো শত শত লাশ। অগ্নিঝরা সেই ২৫ মার্চের আগেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুক্তিকামী মানুষ। ফলে ফতুল্লার পঞ্চবটিস্থ পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল ডিপোতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও পাকবাহিনী তেল সংগ্রহ করতে পারেনি। পাক হানাদার বাহিনী যাতে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তৎকালীন জাতীয় পরিষদের সদস্য একে এম শামসুজ্জোহা ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আফজাল হোসেন (উভয়ে প্রয়াত) এর নির্দেশে এলাকার আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীকে ঠেকাতে পাগলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত প্রায় ৩০টির বেশি বিশাল আকারের কড়ই গাছ কেটে সড়কের উপর ফেলে রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তারা যাতে এলাকায় সহজেই ঢুকতে না পারে সেদিন এটাই ছিল সাধারণ জনতার চেষ্টা। প্রথম দিন পাকবাহিনী শহরে প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে যায়। পরদিন বিপুল শক্তি নিয়ে শহরে প্রবেশ করে। আর ২৭ মার্চ থেকেই পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েল (বর্তমানে যমুনা অয়েল) তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এখানে গড়ে তোলা হয় সেনা শিবির। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা নারী-পুরুষকে এই সেনা ক্যাম্পে হাত পেছনের দিকে বেধে তেল ডিপোর জেটির সামনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হতো বুড়িগঙ্গা নদীতে। একই সাথে নারীদের ধরে এনে চালানো হতো পাশবিক নির্যাতন।

স্থানীয় একজন মুক্তিযেদ্ধা জানান, ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে এই পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েলের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেছে সেখানে ভেতরে পড়ে আছে নারীদের ব্যবহৃত কাপড়, ব্লাউজ, চুড়ি। তৎকালীন বিবিসি`র সাংবাদিক মার্কটালি এই বধ্যভূমির উপর একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নয় মাসের প্রতিরাতে এ জেটিতে ধরে এনে যাদেরকে হত্যা করা হতো শুনা যেত তাদের মৃত্যুর করুণ আর্তনাদ, চিৎকার। প্রতিরাতেই দশটা থেকে বারটা মধ্যে প্রচুর গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যেত। ক্যাম্পের পাশের বাড়ির আমিনুল ইসলাম এই করুণ আর্তচিৎকার সহ্য করতে না পেরে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। ৫/৬টি ট্রাকে করে লোকদের এখানে ধরে এনে হত্যা করা হতো।

জানা যায়, শীষ মহলের জমিদার বাড়ির বিহারীরা পাকবাহিনীকে এ কাজে সহায়তা করতো। ১৯৪৭ সালে বিহারীরা এখানে এসেছিল। এছাড়া আরো কয়েকটি সেনা ক্যাম্প ছিল অত্র এলাকায়। এগুলো হলো করিম রাবার পাইপ ফ্যাক্টরি, মাসদাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢাকা ভেজিটেবল ফ্যাক্টরি।

মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধকালীন কমান্ডার একে এম ফজলুল হক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ গণি, আনোয়ার হোসেন, শুক্কুর আহম্মদ, মমতাজ উদ্দিন, শামসুল হক, মমিনুল ইসলাম, কামাল উদ্দিন মানিক, শ্রী সুভাষ চন্দ্র বসু, সানা লাল দাসসহ বহু লোক অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। প্রতিবছরই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বধ্যভূমিতে ২৫ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর পালন করা হয় অজানা শহীদদের স্মৃতিচারণ।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও