৯ বছরের স্বপ্নার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন ওসি

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:০৯ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০২০ সোমবার

৯ বছরের স্বপ্নার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন ওসি

নাম তার স্বপ্না আক্তার (৯)। বাবার নাম আমির হোসেন। মায়ের নাম আসমা বেগম। স্বপ্নার বয়স যখন ৯ মাস তখন স্ত্রী সন্তানকে ফেলে অন্যত্র চলে যায় আমির হোসেন। তার পর থেকে স্ত্রী সন্তানের খোঁজখবর নেয়নি। আর স্বপ্নার বয়স যখন ৩ বছর। তখন স্বপ্নাকে তার দাদীর কাছে রেখে মা আসমা বেগমও অন্যত্র চলে যায়। সন্তানের কথা তারা কেউ চিন্তা করেনি। স্বপ্নার ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের সুখের ঠিকানায় পাড়ি জমায় স্বপ্নার বাবা মা। আর মা বাবা হারা মেযেকে মানুষের মত মানুষ করতে দাদী নূরজাহান বেগম (৬৮) নামে বৃদ্ধ পড়ে বিপাকে। বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে এবং রাস্তায় লাকড়ি টোকাইয়াস্বপ্নাকে মানুষ করার যুদ্ধে নামে। স্বপ্নাকে স্কুলেও ভর্তি করায়। স্বপ্নাকে ৩য় শ্রেনীতে লেখাপড়ায় করায়। কিন্তু অর্থের অভাবে আবার সপ্নার লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়।

এমন একটি মর্মাহত ঘটনা ঘটে নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজার উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের কল্যানন্দী এলাকায়।

এদিকে প্রতিদিনের মত রোববার (১২ জানুয়ারী) নূর জাহান বেগম তার নাতনীকে নিয়ে লাকড়ি কুড়াতে যায় আড়াইহাজার থানার মাঠে। সেখানে দাদী নাতনীকে দেখতে পায় থানার ওসি নজরুল ইসলাম। তখন দাদী নাতনী স্বপ্নার জীবন কাহিনী শুনে স্বপ্নার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন থানার ওসি নজরুল ইসলাম। তিনি স্বপ্নাকে কাজ না করিয়ে স্কুলে পাঠানোর জন্য বলা হয়।

জানা যায়, আড়াইহাজার উপজেলার কল্যানন্দী এলাকার আমির হোসেন স্ত্রী সন্তানকে রেখে অন্যত্র চলে যায়। আমির হোসেন স্ত্রী সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের খোজখবর নেয়নি। তিন বছরের স্বপ্নাকে ফেলে মা আসমাও অজানার উদ্দেশে চলে যায়। কিন্তু স্বপ্নার এক মাত্র দাদী ছাড়া কেউ রইল না। অভাবের সংসার চালাতে তাদের দাদী নুর জাহান বেগমের অনেক কষ্ট হয়। তখন নুর জাহান নিজের নাতনীকে মানুষ করতে অন্যের বাড়ি কাজ করে সংসারের হাল ধরে। অভাবের সংসারে নুর জাহান বেগম এক মাত্র সন্তান স্বপ্নাকে স্কুলে ভর্তিও করায়। হাসি খুশি ভাবে লেখাপড়া করছিল স্বপ্না। সে কল্যানন্দী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেনীতে পড়ে। এ বছর স্কুল হতে নতুন বইও আনে। লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অভাবের সংসার নাতনীকে লেখাপড়া করার খরচ বহন করতে কষ্ট যখন হচ্ছিল ঠিক তখনি নাতনীকে নিয়ে রাস্তায় লাকড়ি কুড়াতে যায় নূর জাহান বেগম। রোববার লাকড়ি কুড়াতে যখন আড়াইহাজার থানায় যায় তখন দাদী নাতনীকে ওসি নজরুল ইসলামের চোখে পড়ে। তখন তাদেরকে ওসি ডেকে এনে জিজ্ঞেস করে স্বপ্নাকে স্কুলে না পাঠিয়ে কেন কাজ করানো হচ্ছে। ঐ সময় কান্না কণ্ঠে দাদী নুর জাহানের পরিবারের কাহিনী শুনে ওসি নজরুল ইসলাম নিজেকে সামলাতে না পেড়ে স্বপ্নার লেখাপড়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর স্বপ্নার যত খরচ লাগে তা বহনও করার দায়িত্বও নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি। ওসির এমন আশ্বাসে নুর জাহান বেগমের হাসিতে মুখ ভরে যায়। আর ওসি স্বপ্নাকে বুকে জড়িয়ে নেয় এবং তাকে লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হওয়ার জন্য বলা হয়।

আড়াইহাজার থানার ওসি জানান, আমার চোখের সামনে অর্থের অভাবে একজন ফুটফুটে কন্যার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে তা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। স্বপ্নাকে মানুষের মত হতে হলে তাকে লেখাপড়া করতে হবে। অর্থের অভাবে কিছুতেই স্বপ্নার জীবন ঝড়ে যেতে পারে না। স্বপ্নার লেখাপড়ার সকল খরচ আমি নিজে বহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়াও শিশুটির দায়িত্ব আমি নিয়েছি। তাৎক্ষনিক ভাবে যা লাগে সব কিনে দিয়েছি।

তিনি আরো জানান, শিশুটি যখন তার দাদীর সাথে লাকড়ি কুড়াতে থানায় আসে তখন তাকে দেখে আমার মায়া হয়েছে। কেন ছোট একটি মেয়ে কাজ করবে জানতে গিয়ে মর্মাহত কাহিনী জানতে পারলাম। আর বাবা মা হারা মেয়ের লেখাপড়া সহ তার দায়িত্ব আমি নিয়েছি। অর্থের অভাবে শিশুটির মত কারো জীবন যেন ঝড়ে না পড়ে সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আসুন আমরা সবাই স্বপ্নার মত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও