গোসলখানায় লুকিয়েও রক্ষা পায়নি স্কুলছাত্র মোসলেহউদ্দিন

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫৮ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার

গোসলখানায় লুকিয়েও রক্ষা পায়নি স্কুলছাত্র মোসলেহউদ্দিন

১৯৫২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী মহান ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ যখন শিক্ষিকা মমতাজ বেগমের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ যখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল তখন ইপিআর বাহিনীর হাত থেকে নিজেকে রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বায়তুল আমান ভবনের একটি গোসলখানায় দীর্ঘক্ষণ লুকিয়ে ছিলেন নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া নিবাসী ভাষা সৈনিক মোসলেহউদ্দিন। তবে দীর্ঘক্ষণ লুকিয়ে থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। তিনি যখন গ্রেফতার হন তখন তিনি হাইস্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। সবচেয়ে কম বয়সী ও স্কুল ছাত্র হলেও রেহাই পাননি বর্বর পাকিস্তানী ইপিআর বাহিনীর হাত থেকে। শিশু বয়সেও দেড় মাসের অধিক কারাগারে থাকতে হয়েছে তাকে। তবে কারাগারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সান্নিধ্য লাভের সেই সুখকর স্মৃতি আজো তাকে উদ্বেলিত করে।

ভাষা সৈনিক মোসলেহউদ্দিন ১৯৫২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারীর ঘটনা সম্পর্কে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ১৯৫২ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তখন তার বয়স ১০ থেকে ১২ এর মধ্যে। তাদের পৈত্রিক বাড়ি শহরের আমলাপাড়া এলাকায়। স্কুলে যাবার সময় দেখতে পান নারায়ণগঞ্জ কোর্টের সামনে মমতাজ বেগমের মুক্তির দাবিতে স্লোগান চলছে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে একজন তার মামাও ছিল।

তখন তিনিসহ স্কুলের অন্য ছাত্ররাও ওই আন্দোলনে যোগ দেয়। ওইসময় বিলাশ পাগলা নামের এক যুবক পুলিশের চাকা পাংচার করে দিয়েছিল। যে কারণে মমতাজ বেগমকে নিয়ে পুলিশের গাড়ি ঢাকায় যেতে পারেনি। পরে আদালত থেকে মমতাজ বেগমকে নিয়ে যাওয়া হয় চাষাঢ়া পুলিশ ফাড়িতে। আন্দোলনকারীরা খবর পান ঢাকা থেকে ইপিআর বাহিনী আসছে।

ওই ইপিআর বাহিনীতে প্রতিহত করতে আন্দোলনকারী সড়ক অবরোধের সিদ্ধান্ত নেন। পরে মোসলেহউদ্দিন বাসায় এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করে অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে গিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়ক অবরোধে অংশ নেন। এসময় তার সঙ্গে তাদের বাড়ির কাজের ছেলে নূরচানও ছিল।

তারা মাসদাইর কবরস্থান এলাকার জোর আমলিতলা ব্রীজ ভাঙ্গার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতে সফল হননি। সন্ধ্যায় যখন ইপিআর ও পুলিশ একযোগে আক্রমন চালায় তখন তারা চাষাঢ়ায় তৎকালীন এমএলএ খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়ি চাষাঢ়ার বায়তুল আমানে গিয়ে অবস্থান নেন। ইপিআর ও পুলিশ ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় বেধড়ক ধরপাকড় ও লাঠিচার্জ।

তিনি, তাদের বাড়ির কাজের ছেলে নূরচান সহ অন্তত ২৫ জন ওই বাড়ির ভেতরে একটি গোসলখানায় আশ্রয় নেন। তারা যে গোসলখানায় লুকিয়েছিলেন ওই গোসলখানার দরজাটি বাহিরের থেকে বোঝা যেতনা।

তবে এতেও তারা ইপিআর বাহিনীকে ফাঁকি দিতে পারেনি। পরে ইপিআরের সার্জেন্ট সাদেকের নেতৃত্বে গোসলখানার দরজা ভেঙ্গে তাদেরকে আটক করে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। তাদেরকে যখন ফাড়িতে নেয়া হয় তখন গ্রেফতার করা হয়েছিল ৭০ জনকে। পরে ঢাকা জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট কোরাইশীর নির্দেশে যৌথবাহিনী চাষাঢ়া রেলস্টেশন সংলগ্ন হিন্দু পট্টিখ্যাত কুন্ডু ব্রাদার্স নামের একটি কলোনীতেও অভিযান চালিয়ে গণগ্রেফতার করে।

পরে গ্রেফতারকৃত ১১০জনকে প্রথমে কোতয়ালী থানায় ও পরে ঢাকা কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে প্রথম রাতে তিনি অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন। পরে তাকে শিশুদের সেলে রাখা হয়েছিল। তার কান্নাকাটি দেখে সুবেদার আকবর খান তাকে ¯েœহ করতো। তিনি প্রায় দেড়মাস কারাগারে ছিলেন।

কারাগারে থাকার সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, কারাগারে ওইসময় ফাঁসির সেলে বন্দী থাকা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও তার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ যে কারণে বঙ্গবন্ধুও তাকে অনেক আদর করতেন। শিশু আসামী হিসেবে মিয়াসাবও তাকে আদর করতো। কারাগারে বন্দী থাকায় অবস্থায় প্রায়ই তিনি বঙ্গবন্ধুর কক্ষে যেতেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য খেতে দিতেন। তিনি দেড় মাসের অধিক কারাগারে ছিলেন। শিশু আসামী হওয়ায় তারই প্রথম জামিন হয়েছিল। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বায়তুল আমান ভবনটি সংস্কার করে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষনে জাদুঘরে রূপান্তর করার অভিমত ব্যাক্ত করেছেন ভাষা সৈনিক মোসলেহউদ্দিন।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও