দলিত সম্প্রদায়ের শিক্ষার আইকন ‘সনু’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৩:২১ এএম, ৮ মার্চ ২০২০ রবিবার

দলিত সম্প্রদায়ের শিক্ষার আইকন ‘সনু’

কাঁচা ও আধা পাকা টিনসেডের ছোট ছোট ঘরগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লাগানো। ঘরগুলো নিচু, রাস্তা নেই, দুর্গন্ধ, পয়নিষ্কাশন ড্রেনের স্লাবের উপর দিয়ে হাঁটা চলা করে বাসিন্দারা। এভাবেই কয়েক যুগ ধরে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনিতে দলিত সম্প্রদায়ের প্রায় দুই হাজার লোক বাস করে আসছে। তবে তারা বাংলাদেশী হলেও হিন্দি তাদের মাতৃভাষা। ফলে বাংলা ভাষা তাদের কাছে কঠিন ও অপ্রিয়। কিন্তু স্কুলগুলোতেও হিন্দি ভাষায় পড়ানো হয় না। যার কারণে এ সম্প্রদায়ের সন্তানদের প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। আর সেইসব মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানোর আইকন হলেন সনু রানী দাস। আর তাকে দেখেই এখন অনেক পরিবারের সন্তান পড়ালেখা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কারণ তিনিই নারায়ণগঞ্জের এ সম্প্রদায়ের সব থেকে উচ্চ শিক্ষিত যিনি মাস্টার্স প্রথম (প্রিলিমিনারী) পর্ব শেষ করে মাস্টার্স শেষ বর্ষে ভর্তি হবেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে সুপাইপার কলোনিতে গিয়ে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। তাদের কাছে সনু রানী দাস হলেন সন্তানদের শিক্ষার আইকন।

সনু রানী দাস সুইপার কলোনিতে বসবাস করা আজাদ দাস ও গীতা রানী দাসের মেয়ে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সনু চতুর্থ। আর ভাই বোনদের মধ্যেও সনুই একমাত্র শিক্ষিত।

৩৩ নম্বর মেথরপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শেষ করে সনু, মিনা ও পূজা ভর্তি হন র‌্যালী বাগান গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০০৬ সালে কলোনির মধ্যে প্রথম এসএসসি পাস করেন তিনজন। ২০০৮ সালে নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে এক সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) শেষ করার পর ২০১৪ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে ¯œাতক (বিবিএস) করেন সনু ও পূজা। বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়েন মিনা। কলোনিতেই বিয়ে হয় সানুর তবে পূজার বিয়ে হয় পুরান ঢাকার পাকিস্তান মাঠ এলাকার ছেলের সঙ্গে। আর তাতেই সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় পূজার পড়ালেখা আর মিনা আবারও পরীক্ষা দিবেন বিবিএস। তাই কলোনীতে সব থেকে শিক্ষিত নারী হলেন সনু।

সনু রানী দাস বলেন, ‘আমার পড়ালেখার জন্য ছোট থেকে বড় ভাই চাঁন দাস বেশি আগ্রহী ছিল। তিনই পড়ালেখার জন্য সব সময় চাপ সৃষ্টি করতেন। তিনিই শিক্ষাসামগ্রী কিনে দিতেন। তবে এখন আমার স্বামী গৌতম দাস বেশি আগ্রহী। আমার ছেলে রুদ্ধ (৪) জন্ম হওয়ার পর পড়ালেখা থেমে যায়। কিন্তু আমার স্বামীই চায় যাতে মাস্টার্স শেষ করি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায় সব থেকে বেশি কুসংস্কার ও পুরুষশাসিত সমাজ। এখানে নারীদের কোন কথাই চলে না। আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে সমাজের লোকজন সবাই বলতো মেয়ে মানুষ এত পড়াশোনা করে কী করবে? শেষ পর্যন্ত তো চুলাই সামলাতে হবে। তাই এসএসসি পাস করার পর মা চেয়েছিল পড়ালেখা বন্ধ করে হাতের কাজ শিখি। কিন্তু পরবর্তীতে বাবা, ভাই ও শিক্ষকদের কথায় পড়ালেখা করতে থাকি। তবে বিবিএস পড়ছি তাতেও কেউ সম্মান করতো না। তাদের কাছে সর্বোচ্চ পড়ালেখা মানে মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এসএসসি) পাস করা। এরপরও যে উচ্চ মাধ্যমিক, ¯œাতক ও মাস্টার্স পরীক্ষার সনদ অর্জন করা যায় বা এর মান যে আরো বেশি সেটা তাদের জানা নেই। এসএসসির পরও পড়লেখা করছি সেজন্য বাজে কথা বলতো। অনেক নোংরা কথা বলতো।’

তিনি বলেন, ‘স্কুল কলেজে পড়ালেখাটা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। ক্লাসের সবাই যখন জানতে পেরেছিল আমি সুইপারের মেয়ে, সবার প্রতিক্রিয়াটা ভিন্ন ছিল, কেউ মিশতে চাইতো না, কথা বলতে চাইতো না। সবাই ভাবত নোংরা। স্পর্শ করা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমি এইচএসসি শেষ করে প্রথম স্কটল্যান্ডে, গ্লোবাল এক্সচেঞ্চ প্রোগ্রামে অংশ নেই। বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এ কর্মসূচির তে তিন মাস সেখানে ছিলাম। আর চট্টগ্রামে তিন মাস ছিলাম। যার জন্য এক বছর পড়ালেখা পিছিয়ে যাই। তারপর জেনিভায় হিউম্যান রাইটসের এক সম্মেলনে অংশ নেই। এরপর জাতি সংঘের একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্রাজিলেও যাই। এখন শিশুদের পড়ালেখা ও নারীদের স্বাস্থ্য ও উপার্জনের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অধীনে একটি প্রকল্পে কাজ করছি। এছাড়াও সংসারের কাজ শেষে বিকেলে এলাকার ২৫ থেকে ৩০টা ছেলেকে পড়াই।’

তিনি বলেন, এখানে সবাই হিন্দি ভাষায় কথা বলে। তাই পড়ালেখায় ভাষাও তাদের জন্য একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এ কারণে শিশুরা ভাষাটা বুঝতে না পারায় পড়ালেখায় আনন্দ পায় না। শিক্ষার আগ্রহটাও তাদের কম। তাই তাদের পাঠ্যপুস্তকের প্রত্যেকটা লাইনের মানে হিন্দি ভাষায় ব্যাখা করে বুঝিয়ে দেই। এখন স্বপ্ন এ শিশুদের পড়ালেখা শেখানোর জন্যই শিক্ষক হওয়ার। এটার জন্যই চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা একটা বাংলাদেশ চাই যেখানে বৈষম্য থাকবে না। সবাই সব কাজকে, সব পেশাকে সম্মান করবে, সেই সঙ্গে সম্মান করবে আমাদের দলিত সম্প্রদায়কেও। কারন কোন কাজই যে ছোট নয়। সুইপাররা যদি কাজ না করে তাহলে দেশ পরিষ্কার রাখার কাজটা কে করবে?’

সনুর স্বামী গৌতম দাস বলেন, ‘বর্তমানে পড়ালেখা ছাড়া এক মানুষের কোন মূল্য নেই। তাছাড়া আমরা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। এমনিতেই মানুষ পছন্দ করে না। আমি নিজেই অষ্টম শ্রেনি পাস। তাই আমি চাই আমার স্ত্রী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তাকে সবাই সম্মান করুক।’ 

অষ্টম শ্রেনি শিক্ষার্থী কুমকুম দাস বলেন, ‘আগে পড়ালেখা করতে দিতো না। বলতো পড়ালেখা করে কি করবি। সেইতো রান্না করতে হবে। তার চেয়ে ভালো রান্না কিংবা হাতের কাজ শিখ। কিন্তু এখন সনুদিকে দেখিয়ে বাবা মাও ভালো করে পড়ালেখা করে সনুদির মতো হও। আমি চাই সনুদির মতো পড়ালেখা করে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াতে।’

নবম শ্রেনির কনিকা দাস বলেন, বাসা থেকে পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু সনুদির কারণেই আমি জেএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি। তিনিই মা বাবাকে বুঝিয়ে ছিল পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

ষষ্ঠ শ্রেনির কার্তিক দাস বলেন, ‘বাবা পড়ালেখা জানে না। তাই সুপাইরের কাজ করে। কিন্তু আমি পড়ালেখা করে বড় অফিসার হবো।’

প্রতিবেশী অনিতা রানী দাস বলেন, ‘সনু আমাদের কলোনির গর্ব। তার দেখাদেখি এখন অনেক শিশুই লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।’

দলিল সম্প্রদায়ের যুব সমাজ পঞ্চায়েত কমিটির সহকারী প্রধান সুকুমার লাল বলেন, আমরা চাই শিক্ষার আলো। আর সেই আলো সুন আমাদের সন্তানদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। পড়ালেখা করলে যে ভালো চাকরি পাওয়া যায় সেটা সত্য হবে যদি এখন সনু একটা ভালো চাকরি পায়। আমাদের সন্তানদের বলতে পারবো যে পড়ালেখা করলে তাদের আমাদের মতো সুপাইরের কাজ করতে হবে না।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, শিক্ষায় অনাগ্রহ মানুষদের জন্য সনু অনুকরণীয়। এলাকার মধ্যে ভালো পড়ালেখার আবহওয়া শুরু হয়েছে। যেহেতু কলোনীটা সিটি করপোরেশনের অধিনে সেহেতু মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে কথা বলে সনুকে কলোনীর প্রাইমারী স্কুলে প্যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। যাতে এ সম্প্রদায়ের মধ্যে পড়ালেখার যে আবহওয়া শুরু হয়েছে, সেটা নষ্ট না হয়।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও