ট্রেন চালক সালমাকে দেখে মানুষ হাসে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৩:২৫ এএম, ৮ মার্চ ২০২০ রবিবার

ট্রেন চালক সালমাকে দেখে মানুষ হাসে

‘নারায়ণগঞ্জে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, লাশ উদ্ধার, সংঘর্ষ সহ প্রায় বিভিন্ন ঘটনা ঘটে। এখানে কাজ করতে পারবে না। এখানকার মানুষ শান্তিতে কাজ করতে দিবে না। সহকর্মীদের অনেকেই এমনটা বলেছিলেন সালমা খাতুনকে। কিন্তু ওইসব কথাগুলোর গুরুত্ব না দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এখন সালমা খাতুন বলেন, ‘শুনতে অনেক কিছুই শোনা যায় আসলে নারায়ণগঞ্জের মানুষ অনেক ভালো’।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা কমলাপুরগামী ট্রেনে যাওয়ার পথে কথাগুলো বলেন এ লাইনে প্রথম নারী ট্রেন চালক সালমা খাতুন। তবে বর্তমানে আরো ১৪জন নারী ট্রেন চালকের আসনে কাজ করছেন দেশের বিভিন্ন লাইনে।

সালমা খাতুন বলেন,‘গত এপ্রিল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইনে ট্রেন চলানোর কাজ শুরু হয়। এরপর থেকে এখনও পর্যন্ত কাজ করছি কিন্তু কোন সমস্যায় পড়িনি যে নারী হিসেবে কাজ করতে সমস্যা হবে। মানুষ তাঁকিয়ে থাকে, হাসে ও কথা বলে। সবাই জিজ্ঞাসা করে নারী হয়ে কিভাবে ট্রেন চলাচ্ছি। তখন আমিও বলি এটা কোন কঠিন কাজ না। মানুষ চাইলে সবই পারে। আর নারীরাও পারে। 

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুরগামী ট্রেনে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক। বিশেষ করে ছাত্রীদের সংখ্যা। অনেক ছাত্রী আছে যারা বলে ‘আপা আমিও আপনার মতো হবো।’ তাদেরও কেও বলি নারীরা সব পারে। কঠিন কোন কাজ নয়। যত বেশি এ পেশায় নারীরা আসবে ততবেশি নারীদের সুযোগ সুবিধা বাড়বে। তবে এটা খুব কঠিন পেশা।

কঠিন পেশা কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারাক্ষণ ট্রেনের আসনে বসতে থাকতে হবে। চারদিকে চোখ রাখতে হবে। এছাড়া কখনো ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বাসায় ফিরতে পারবে না। সেটা যত রাতই হোক। তাছাড়া ইঞ্জিন বিকল হলে যাত্রীরাও ক্ষেপে যায়। রেগে গিয়ে ত্যাড়ে আসে। আবার নারী দেখে নীরবে চলে যায়। রোদে প্রচ- গরম থাকে। মাঝে মাঝে দুর্বৃত্তরা ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারে, এসব কিছু।

বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ট্রেন চালক বা লোকোমোটিভ মাস্টার সালমা খাতুন। লোকোমোটিভ মাস্টার এমন একটি পেশা, যেটি এখানো পর্যন্ত নারীর উপযোগী পেশা বলে বিবেচিত নয়। কাজেই প্রথম নারী ট্রেন চালক হিসেবে সালমা খাতুন যখন বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগ দিয়েছিলেন, তখন সেটা আলোড়ন তুলেছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যমে।

২০০৪ সালের সালমা খাতুন ঢাকা বিভাগে কর্মরত আছেন ট্রেন চালক হিসেবে। রেলের জটিল সব যন্ত্রপাতি এখন তাঁর জীবনের অংশ। ১৯৮৩ সালের ১ জুন সালমা খাতুন টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরের অর্জুনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৃত বেলায়েত হোসেন খান ও মা তাহেরা খাতুনের ৫ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সালমা খাতুন। তার আরো তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে। সালমা খাতুনের স্বামী মো. হাফিজ উদ্দিন জজকোর্টে কাজ করেন। তাদের সংসারে আদিবা বিনতে লাবণ্য (৭) ও বাবিয়া ইরতিজা (১) নামে দুই মেয়ে রয়েছে।

২০০০ সালে অর্জুনা মুহসীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০০২ সালে কুমুদিনী সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রানিবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ২০১৫ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স করেছেন সালমা বেগম। এর আগে বিএসএস ডিগ্রি ও বিএড কোর্স সম্পন্ন করেছেন।

সালমা খাতুন বলেন, ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করার পরই রেলওয়ের বিজ্ঞপ্তি দেখি যেখানে লোক নেওয়া হবে। এরপরই আমি পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাই।

তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই ব্যতিক্রমধর্মী কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল আমার। যেটা সাধারণত কেউ করে না তেমনি একটু চ্যালেঞ্জিং ধরনের কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল। এ ইচ্ছা পূরণ করাটা আমার জন্য এতো সহজ ছিল না। কেননা আমি ছিলাম গ্রামের নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। এদিকে আমাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্যও আমার বাবা মায়ের ছিল না। গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারনে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তবে আমি জেদ করি, আমি পড়বই। আবার বাবা মা আমাকে তখন এইচএসসিতে ভর্তি করায়। এদিকে আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন লেগেই ছিল। যে কারণে এইচএসসি পাস করার পর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আমার পরিবার থেকে বলা হয় আর পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। তখন আমার  মনে হলো আমার একটা কিছু করার দরকার যেন আমার পরিবারকে কিছুটা অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারি। আমি যখন একটা কিছু করার উপায় খুঁজছিলাম তখন আমার বড় ভাই আমাকে একদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে বললযে, তুমি চাইলে এখানে আবেদন করতে পার। চাকরির এ সুযোগটি আমার ইচ্ছার সাথে মিয়ে যায়। আর তাই আমি আবেদন করি।

সালমা খাতুন বলেন, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাই। মৌখিক পরীক্ষায় উপস্থিত কর্তাব্যক্তিরা খুব আগ্রহ নিয়েই আমার কাছে জানতে চান যে, এ চাকরিটি আমি করতে পারব কিনা? বললাম আমি পারব, এ চাকরিটি আমি করতে চাই। তাঁরাও আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন। 

তিনি বলেন, এটা চ্যালেঞ্জিং তবে আমার জন্য আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ আমার দুটা সন্তানকে ঠিক মতো সময় দিতে পারি না। সকালে ডিউটিতে আসার জন্য খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়। রান্না করে বাচ্চাদের খাইয়ে স্কুলে পাঠিয়ে তারপর আসতে হয়। আবার সময় মতো অফিসে উপস্থিত হতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে আমার স্বামী সব থেকে বেশি সহযোগিতা করেন। এবং আমাকে সাপোর্ট করে। এছাড়াও আত্মীয় স্বজনদের কাছেই বাচ্চাদের রেখে কাজ আসি। তারপরও কাজ থেকে ফিরতে দেরি হলে আমি বাচ্চাদের জন্য টান অনুভব করি।

সালমা খাতুন বলেন, এ পেশায় এসে সব থেকে বেশি কষ্ট ও খারাপ লাগে যখন দেখি মানুষ ট্রেনের সামনে চলে আসে। এছাড়াও কিছু পথচারী আছে অসচেতন। এগুলো যখন দেখি তখন খুব খারাপ লাগে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও