নদী রক্ষা দিবসেও শীতলক্ষ্যার আর্তনাদ

সোহেল রানা, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫৮ পিএম, ১৩ মার্চ ২০২০ শুক্রবার

নদী রক্ষা দিবসেও শীতলক্ষ্যার আর্তনাদ

নারায়ণগঞ্জকে সমৃদ্ধি উপহার দিয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদী। কারণ শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করেই শিল্প ও বাণিজ্যসমৃদ্ধ নগরী হিসেবে স্থাপতি হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষ্যার পানি একমসয় এতটাই স্বচ্ছ ও সুস্বাদু ছিল যে দুই পাড়ের মানুষ শীতলক্ষ্যার পানি রান্নার কাজে ব্যবহার করতো। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নারায়ণগঞ্জবাসীর আশীর্বাদ শীতলক্ষ্যা নদী এখন চরম অসহায়। দখল, দূষণ আর অতি উন্নয়নের জাতাকলে চাঁপা পড়ে ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা দিবসেও যেন শীতলক্ষ্যা বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছে।

বর্তমানে শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে তাঁকালেই চোখে পড়ে লাগামহীন দখল আর ভয়াবহ দূষণের চিত্র। উন্নয়নের নামে বড় বড় শিল্প কারখানা থেকে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে রং ক্যামিকেল মিশ্রিত বিষাক্ত বর্জ্য।

অপরদিকে নদীর দুই তীরে অবাধে নদীর জায়গা ভরাট করে চলছে নদী দখলের মহোৎসব। নদীর জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে ডকইয়ার্ড, বহুতল ভবন সহ ছোট বড় অসংখ্য কাঁচা-পাকা স্থাপনা।

সম্প্রতি ‘শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলন’ স্লোগানে শীতলক্ষ্যাকে বাঁচানোর দাবি নিয়ে ‘নৌকা বন্ধন’ আন্দোলনের আয়োজক বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি লক্ষী চক্রবির্তী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, বর্তমানে শিল্প কারখানা তাঁদের বর্জ্যগুলো নদীতে ফেলছে। নৌকা বন্ধনের সময় দুর্গন্ধের জন্য আমরা নৌকাতেও দাঁড়াতে পারছিলাম না। সেখানে উপস্থিত মাঝিরাও বলিছিলেন যে তাঁদেরকে জীবন জীবিকার তাগিদে নৌকা চালাতে হচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদী যেন এখন বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছে। যদি নজরদারিতে এনে শীতলক্ষ্যায় শিল্প কলকারখানার বর্জ্য ফেলা বন্ধ করার ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে শীতলক্ষ্যা নদী মরে যাবে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১৬ জানুয়ারি থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের যৌথ ও একক অভিযান পরিচালনা করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে মোট ১৪৫১টি, ভরাট অপসারণ করা হয়েছে ৬টি, দখলকৃত নদীর তীরবর্তি জমি উদ্ধার করা হয়েছে ৭৮.৪ একর, জব্দকৃত মালামাল নিলাম করা হয়েছে মোট ২কোটি ৪৫লাখ ৩২হাজার ৬০০টাকা। এছাড়া জরিমানা করা হয় ৩০লাখ ৫১হাজার টাকা। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদী দূষণের দায়ে আরো ডজন খানেক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়।

এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৪ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে শীতলক্ষ্যা তীরবর্তি বন্দর এলাকায় আমিননগর ও গঙ্গাগুল সংলগ্ন এলাকায় ১৪টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। তবে উচ্ছেদের এক সপ্তাহ না পেরোতেই নতুন করে আবারো ডকইয়ার্ডের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ ডকইয়ার্ড মালিকরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জ জেলার যুগ্ম পরিচালক মাসুদ কামাল নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, আমরা নদী তীরবর্তি স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করেবো এবং নদী দখল মুক্ত করবো। এর আগে উচ্ছেদ করার পরে যেগুলো দখল হয়ে গেছে সেগুলো আবারো উচ্ছেদ করবো এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নদীর এক ইঞ্চি জায়গাও অবৈধ দখলে রাখার সুযোগ দিব না।

এদিকে পরিবেশ আন্দোলন ও নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এবি সিদ্দিক নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে উচ্ছেদের নামে প্রশাসন শুধু একদিন বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে চলে যায়। নদী দখল রুখতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যে কারণে একদিকে ভেঙ্গে দিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে আবার নদী দখলে চলে যাচ্ছে। স্থায়ী ভাবে নদী দখল রোধ করতে প্রয়োজনে উচু প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া যেখানে নদী উচু সেখানে খনন করে নদীর সমান করতে হবে। যাতে কেউ কোনো স্থাপনা তৈরী করতে না পারে।

শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যা নদী নারায়ণগঞ্জের প্রাণ। এই শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের উত্থান। ব্যবসায় কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠান সবগুলোই এই নদীকে কেন্দ্র করে। নদী না হলে এগুলো হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। সুতরাং এটার যে কতটুকু প্রয়োজন তা বলে বুঝানো যাবে না। শীতলক্ষ্যাকে যদি সঠিক ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় তাহলে আমাদের উন্নয়নও নষ্ট হয়ে যাবে। যদি শীতলক্ষ্যা নষ্ট হয়ে যায় আমাদের নারায়ণগঞ্জও ধ্বংস হয়ে যাবে।

নদী রক্ষ্যায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথম পর্যায়ে ১৭২জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তিতে শুধু বন্দর এলাকার জন্য বহুতল ভবন সহ আরো প্রায় ৪৫টি স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। খুব শিঘ্রই র‌্যাব, পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করে বড় ধরণের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করার কথাও জানা গেছে জেলা প্রশাসন সূত্রে।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অদিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সেলিম রেজা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, আমরা শীতলক্ষ্যা নদী নিয়ে কাজ করছি। যারা দূষণ করছে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখন বিশেষ করে সেই সব এলাকায় যেখানে নদীর জায়গা দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে কাজ করা হচ্ছে। প্রথম তালিকা প্রকাশের পর (জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদী দখলদারদের তালিকা) আবারো একটি তালিকা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা আসলেই শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের দিকে ৪২-৪৫টি বহুতল ভবন সহ সব ধরণের ভবনের তালিকা করা হয়েছে যেগুলো খুব শিঘ্রই উচ্ছেদ করা হবে।

এদিকে গত ১০ মার্চ বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ৬টি প্রকল্পের উদ্বোধন করতে এসে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, নদী নিয়ে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। নদীকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। যে সকল দখলদার ছিল তাঁরা সরে যাচ্ছে। যারা সরছে না তাঁদেরকে আমরা সরিয়ে দিচ্ছি। দূষণরোধে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সরকার নদীগুলো রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, একটা সংস্কৃতি চালু হয়েছিল নদীগুলোকে দখল করা ও দূষণের মাধ্যমে বিষিয়ে তোলার। তবে নদীগুলোকে রক্ষায় সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ঢাকার চারিপাশের নদীগুলো রক্ষায় ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ১৯টি আরসিসি জেটি ছাড়াও ১০ হাজার ৮২০টি সীমানা পিলার স্থাপন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩ হাজার সীমানা পিলার স্থাপনের কাজ চলছে। যার মধ্যে ৭শ’ সীমানা পিলার দৃশ্যমান। এছাড়া ৩টি ইকোপার্ক ও ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। যার মধ্যে ঢাকা নদী বন্দরের অর্ন্তভুক্ত অঞ্চল ২০.৮৫ কিলোমিটার, টঙ্গী নদী বন্দরের অর্ন্তভুক্ত অঞ্চল ১৪.১০৩ কিলোমিটার, নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের অর্ন্তভুক্ত অঞ্চল ১৭.০৫ কিলোমিটার।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও