শীতলক্ষ্যার মতো ভালো নেই নদী তীরের মানুষগুলোও

সোহেল রানা, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:১৯ পিএম, ১৪ মার্চ ২০২০ শনিবার

শীতলক্ষ্যার মতো ভালো নেই নদী তীরের মানুষগুলোও

“শীতলক্ষ্যা নদীর পানির নিচে কি আছে আগে দেখা যেত। বন্ধুদের নিয়ে এই নদীতেই দুই বেলা গোসল করতাম। গরম দিনে রাতেও কত গোসল করেছি। মেরিন টেকনোলজির ওইখানে বন্ধুরা মিলে প্রতিদিন মাছ ধরেছি। কিন্তু এখন গোসল করা তো দুরের কথা শীতলক্ষ্যার পাড়ে বসেও থাকতে পারি না। এত দুর্গন্ধ যে এখন বাসাতেও শীতলক্ষ্যার পানির দুর্গন্ধ পাই।”

১৪ মার্চ শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে নাক চেপে পাড় হওয়ার পর বিশ্ব নদী রক্ষা দিবসে শীতলক্ষ্যা নদী নিয়ে প্রশ্ন করতেই এই কথাগুলো বলছিলেন বন্দর আমিননগরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. আব্দুল খালেক। নিজের অতিতের কথা মনে পড়তেই মুহূর্তেই ছলছল করছিল তাঁর চোখ। নদীর বর্তমান দৃশ্য দেখে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন তিনি।

এসময় তিনি আরো বলেন, “আগে গোসল করলে শরীর শীতল হতো। আর এখন গোসল করলে শরীর চুলকায়, শরীরে ঘা হয়। ছোট বেলায় আমি যে শীতলক্ষ্যা দেখেছি এই শীতলক্ষ্যা সেটা না। শীতলক্ষ্যা মনে হয় আর কোনো দিন ভালো হবে না। আর আমরাও কোনো দিন নদী পাড়ের আগের শান্তি ফিরে পাবো না।”

একসময়কার রূপসী কন্যার মত শীতলক্ষ্যারও ছিল রূপ সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য ফুরিয়ে এখন নানা পরজীবীর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত শীতলক্ষ্যার বুক। যেন বয়স ফুরিয়ে যাওয়া মৃত্যু পথযাত্রী। পরজীবীর আক্রমণে যেমন ভালো নেই শীতলক্ষ্যা, তেমনি ভালো নেই শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে বসবাসকাী মানুষগুলোও। যে শীতলক্ষ্যার অপরূপ সৌন্দর্য দেখে নদীর পাড় ঘেঁষে বসত বাড়ি তৈরী করেছিলেন এখন তাঁরাই নদীর দুর্গন্ধে বাড়িতে নাক চেপে থাকেন।

মো. আব্দুল খালেকের নাতি শাহরিয়ার হোসেন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে পানি বেশি থাকে তখন শীতলক্ষ্যা নদী দেখতেও সুন্দর লাগে নদীর পাড়ে বসে থাকতেও ভালো লাগে। কিন্তু পানি যখন কমতে শুরু করে তখন এর ধারে কাছে আসা যায় না। দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপে রাখতে হয়। নদীর পাড়ে বাড়ি হওয়ায় দুর্গন্ধ সোজা ঘড়ে ঢুকে, তাই সব সময় জানালা বন্ধ করে রাখি।

শতবর্ষী শীতলক্ষ্যা নদীর অবস্থা এক যুগ আগেও এত করুণ ছিল না। শুষ্ক মৌসুমেও থৈ থৈ করতো স্বচ্ছ পানি। নদীতে পলিথিন-আবর্জনা দেখা যেত না। প্রচুর পরিমাণ মাছের দেখাও পোতো জেলেরা। কিন্তু বর্তমানে নদীটির দিকে তাঁকালে এসব গল্পের মত লাগে। উজানের দিকে নদীটি শুকিয়ে আসায় প্রায়শই নাব্যতা সংকট তৈরী হয়। সেই সাথে পরজীবীর মত নদী তীরের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো চুষে নিচ্ছে শীতলক্ষ্যার শেষ প্রাণটুকুও। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য ক্যান্সারের মত বাসা বেঁধেছে শীতলক্ষ্যার বুকে।

শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প কারখানা। যে কারখানাগুলো শীতলক্ষ্যাকে ক্যান্সারে আক্রান্ত করছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইটিপি প্লান্টের মাধ্যমে বর্জ্য পরিশোধন করে নদীতে ফেলার আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে শিল্প কারখানাগুলো সরাসরি বিষাক্ত বর্জ্য ফেলছে শীতলক্ষ্যার বুকে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি কিছুটা পরিষ্কার থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নর্দমার পানির থেকেও বেশি নোংড়া ও বিষাক্ত হয়ে যায়।

শাকিল হোসেন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, “শীতলক্ষ্যা নদী হচ্ছে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রাণ। কিন্তু সেই নদীকে আমরা এত বেশি অত্যাচার করেছি যে শীতলক্ষ্যা এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য ক্যান্সারে পরিণত হচ্ছে। কারণ এর থেকে এখন নানান রোগব্যাধী ছড়াচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, শীতলক্ষ্যার জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলার এত উন্নয়ন। সেই শীতলক্ষ্যাকে যেভাবে ধুকে ধুকে মেরে ফেলছি, নারায়ণগঞ্জও একসময় এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে।”

তিনি আরো বলেন, “নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন শীতলক্ষ্যাকে বাদ দিয়ে করা যাবে না। আগে নদীকে বাঁচাতে হবে পরে উন্নয়ন করতে হবে। অন্যথায় নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন একসময় মুখ থুবড়ে পড়বে। আর এখনি সময় যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে শীতলক্ষ্যাকে রক্ষা করা।”


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও