শীতলক্ষ্যা নদীসহ সকল নদীকে বাঁচান

এস এম শহীদুল্লাহ || অতিথি লেখক ০৩:০৮ পিএম, ২২ মার্চ ২০২০ রবিবার

শীতলক্ষ্যা নদীসহ সকল নদীকে বাঁচান

২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস। দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত রাসায়নিক যৌগ হলো পানি। পানির তিনটি অবস্থা, তরল, কঠিন ও বায়বীয়। মেঘ হলো বায়বীয় অর্থাৎ সম্পৃক্ত বাতাসে ঘনীভূত পানি বিন্দুর সমষ্টি। পানির আরো নাম হলো- জল, বারি, সলিল। এটি অজৈব, স্বচ্ছ, স্বাদহীন, গন্ধহীন এবং প্রায় বর্ণহীন এক রাসায়নিক পদার্থ।

জীব জগতে পানির প্রভাব অপরিসীম। এটি যে কোন জীব-কোষ বা উদ্ভীদ-কোষের একটি উপাদান। যদিও পানি কোন প্রাণী বা উদ্ভিদকে কোন রকমের শক্তির বা জৈব পরিপোষকের যোগান দেয় না। তবে পরিপাক ও শ্বসন কাজে সাহায্য করে। এখন পর্যন্ত আমরা যা জানি, তাতে সমস্ত ধরনের প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য, তাই পানির অপর নাম জীবন।

পানির সবচেয়ে বড় উৎস সমুদ্র। কিন্তু সমুদ্রের পানি লবণক্তার কারণে মানুষ তার প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারে না। সমুদ্র বা জলাশয় হতে পানি বাস্প হয়ে (লবণ ব্যতিত) আকাশে গিয়ে মেঘ সৃষ্টি করে। সেই মেঘ পৃথিবীতে বৃষ্টিরূপে বর্ষিত হয়। সেই বৃষ্টিকে পাহাড়-পর্বত ধারণ করে পানির ঝর্ণা সৃষ্টি করে। সেই ঝর্ণা থেকে সৃষ্টি হয় অনেক নদী। তখন মানুষ নদী হতে সেই ঝর্ণার পানি গ্রহণ করে বিভিন্ন পক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তার প্রয়োজনীয় কৃষি, গৃহস্থালি ও তৃষ্ণা মেটানোর কাজে ব্যবহার করে থাকে।

নদী ও বাংলাদেশ একই সুতোয় গাঁথা। এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে নদী ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। নদীকে বলা হয় পানির আধার।

বাংলাদেশের প্রধান ৪টি নদী হলো- ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। আবার এসকল নদীগুলো হতে সৃষ্টি হয়েছে উপনদী, শাখানদী। ব্রহ্মপুত্র নদ হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তিস্তা হলো ব্রহ্মপুত্রের প্রধান উপ-নদী এবং বংশী ও শীতলক্ষ্যা হলো প্রধান শাখা নদী।

কোনো শহরে একটি নদী থাকলেই তাকে সেই শহরের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে ধরা হয়। যদি কোনো শহরের মধ্য দিয়ে একটি নদী বয়ে যায়, তবে সেই শহরকে অনায়াসে ভূস্বর্গ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। যেমন ইতালির বো ও পিয়াভব নদী ভেনিস শহরকে, ইংল্যান্ডের টেমস নদী লন্ডন শহরকে, প্যারিসের সীন নদী প্যারিস শহরকে এনে দিয়েছে ভূস্বর্গ মর্যাদা। নারায়ণগঞ্জ এমনিই একটি নদী সমৃদ্ধ শহর। কিন্তু এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত নগরী। নারায়ণগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী।

নদী পরিবহন সবচেয়ে সস্তা ও সহজ পরিবহন ব্যবস্থা। শীতলক্ষ্যা নদীর কারণে নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে নদীবন্দর। যা দেশের একটি অন্যতম নদীবন্দর হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশের রাজধানী কলিকাতার সাথে সহজ যোগাযোগ হয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীর কারণে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। সে সময় নারায়ণগঞ্জকে ‘ফ্র্রি পোর্ট’ হিসেবে ঘোষণাও করা হয়েছিল।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের চাষাবাদ ব্যবস্থা অনেকটাই নদীর সেচ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। নারায়ণগঞ্জের চাষাবাদ জমিগুলোতে অনেকেই এক সময় শীতলক্ষ্যার পানি সেচ কাজে ব্যবহার করতো।

নদীমাতৃক এ দেশটি স্মরণাতীতকাল থেকে মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধশালী। আর তাইতো বাঙালিকে বলা হয় ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। অধিকাংশ মাছ আমরা নদী থেকে পেয়ে থাকি। এক সময় জেলেরা শীতলক্ষ্যা নদী থেকেও রুই, কাতল, বোয়াল, চিতল, পাঙ্গাস, আইরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ছোট মাছও ধরতো। এখন মাছ ধরাতো দূরের কথা নদীর পানি দূষণ-দূর্গন্ধে এমন হয়েছে যে, নদী পার হতে হয় নাকে রুমাল দিয়ে।

বর্তমানে শিল্প প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ডাইং ফ্যাক্টরির বিষাক্ত বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, পলিথিন, বাজারের ময়লা, হোটেল রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ পয়ঃবর্জ্য নদীতে পড়ছে। পয়ঃবর্জ্যের প্রায় সকল ড্রেনের মুখগুলো সরাসরি এ নদীতে মিশেছে। জমা হচ্ছে নদীর তলদেশে পলিথিনের স্তর। ফলে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি হয়ে পড়েছে দূষণযুক্ত। শীতলক্ষ্যা নদী এখন দূষণে মৃতপ্রায়। পানি দুর্গন্ধময়, দেখতে কালো আলকাতরা মতো। অথচ এক সময় এর পানি মানুষ পান করতো এবং গোসলসহ প্রয়োজনীয় গৃহস্হালির কাজও করতো।

শীতলক্ষ্যা নদীর পানি রক্ষার জন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। ড্রেনের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি যাতে নদীতে না পরে তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে ঢাকা ওয়াসার পাগলা পয়ঃশোধনাগারের মতো একটি কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করে সকল ড্রেনের মুখ সেই পয়ঃশোধনাগারের সাথে সংযুক্ত করে পয়ঃপানি শোধন করে নদীতে ছাড়তে হবে। সম্প্রতি ঢাকায় বুড়িগঙ্গার তীরে ড্রেনের মুখে ক্ষুদ্র আকৃতির যে পয়ঃশোধনাগার নির্মিত হয়েছে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি রক্ষায় সেইরূপ ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে।

নদীর পূর্বপাড়েও অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যান্য বর্জ্য, আবর্জনা এবং পলিথিন নদীতে ফেলা বন্দ করতে হবে, যাতে সব সময় নদীতে দূষণমুক্ত পানির প্রবাহ ঠিক থাকে। বাংলাদেশ বৈচিত্রেভরা। এই দেশে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদী এসব নদী এ দেশকে করেছে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা। তাই ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিক দিক দিয়ে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। তাইতো কবি বলেছেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি... "

কিন্তু আজ শীতলক্ষ্যা নদীর পানিসহ অনেক নদীর পানি মারাত্মক দূষণের শিকার। আবার পানির অভাবে অনেক নদী মৃতপ্রায়। সুতরাং নদী রক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করে বিপন্ন হারিয়ে যাওয়া, মৃতপ্রায় নদীগুলোকে উদ্ধার করতে হবে এবং সকল নদীতে দূষণ মুক্ত পানির প্রবাহ সচল রাখতে হবে। তাহলেই বাঁচবে মানুষ বাঁচবে দেশ। তাই এ বৎসরের বিশ্ব পানি দিবসের হউক অঙ্গীকার- ‘শীতলক্ষ্যা নদীসহ সকল নদীকে বাঁচান।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও