কারাগারে খাজা মহিউদ্দিনকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন‘ভেব না,তুমি পাশ করবা

এস এম শহিদুল্লাহ (লেখক ও গবেষক) : || ০৯:৫৯ পিএম, ২৪ জুন ২০২০ বুধবার

কারাগারে খাজা মহিউদ্দিনকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন‘ভেব না,তুমি পাশ করবা

জুন মাসের উল্লেখযোগ্য দিক হলো ছয় দফা দিবস। যে ছয় দফাকে বলা হয়ে থাকে বাঙালির মুক্তির সনদ। যেখানে স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। এ দিবসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার। যখন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নসরুল্লাহ খান ঢাকায় এসে লাহোরে বিরোধী দলীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবকে যোগ দিতে বলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সে সম্মেলনে যেতে চাননি। তিনি সে সম্মেলনে শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে লাহোরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তখন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া শেখ মুজিবকে বলেন, ‘মুজিবর মিয়া, যদি যেতেই হয়, আপনিই যান। আর আপনার মনে যে কথাগুলো আছে, সেগুলো লিখে নিয়ে যান। ওরা শুনুক না শুনুক, এতে কাজ হবে।’ শেখ মুজিব সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি যাবেন।

৪ ফেব্রুয়ারি তাজউদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে শেখ মুজিব লাহোরের উদ্দেশে রওনা হন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ২১ জন রাজনীতিবিদ এ সম্মেলনে যোগ দেন।

৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসায় কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে সম্মেলন শুরু হয়। সাবজেক্ট কমিটির সভায় শেখ মুজিবুর রহমান একটি ‘ছয় দফা’ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উপস্থিত অন্য সবার আপত্তির মুখে শেখ মুজিবের প্রস্তাব সম্মেলনের এজেন্ডায় রাখা হয় না। শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষুব্ধ হয়ে সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছয় দফার কথাগুলো তুলে ধরেন।

১০ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সঙ্গে আলোচনা না করে এই পর্যায়ে তাসখন্দ চুক্তি সম্বন্ধে তিনি কিছু বলবেন না।

১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে লাহোর সম্মেলনে সাবজেক্ট কমিটিতে দেওয়া প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দেওয়া ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত করে আন্দোলনের জন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হলে তিনি তার সঙ্গে থাকবেন।

ছয় দফা নিয়ে একটা চূড়ান্ত ফয়সালার উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ১৮-১৯ মার্চ (১৯৬৬) ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভা ডাকেন। সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের অনুপস্থিতিতে সভায় সভাপতিত্ব করেন সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কাউন্সিল সভায় ছয় দফা অনুমোদন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিও গঠন করা হয়।

আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ২০ মে কার্যকরী কমিটির সভায় ৭ জুন মঙ্গলবার, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের আহবান জানায়। সে আহবানে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বিপুলভাবে সাড়া দেয়। বিশেষ করে ৭ জুন হরতালের দিন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা জড়িয়ে পড়ে। ৭ জুন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও তেজগাঁয় পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহত ও অগণিত মানুষ আহত হন। ছয় দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হন এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা সারোয়ার ও খাজা মহিউদ্দিন। সে সময় মোস্তফা সারোয়ার ছিলেন নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং খাজা মহিউদ্দিন ছিলেন ঢাকা ছাত্র লীগের সভাপতি। তখন নারায়ণগঞ্জ মহকুমা ছিল ঢাকা জেলার অন্তর্গত। এ দুজন নেতা সম্পর্কে জেলে বন্ধী অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু লেখেন যা ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। তার কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।

মোস্তফা সারোয়ার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু যা লিখেছেন - ২ জুন ১৯৬৬ বৃহস্পতিবার।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনলাম রাত্রে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে এসেছে। কয়েদিরা, সিপাহীরা আলোচনা করছে। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বুঝতে বাকি রইল না আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের নিয়ে এসেছে, ৭ জুনের হরতালকে বানচাল করার জন্য।...শুননাম ১২/১৩ জন রাতে এসেছে। নাম কেউ বলতে পারে না বা বলতে পারলেও বলবে না। খবরের কাগজে কারো নাম উঠবে। একই জেলে থেকেও কারও সাথে কারও দ্যাখা হওয়া তো দূরের কথা, খবরও পাওয়ার সাধ্য নাই নতুন লোকের পক্ষে। তবে আমি পুরানো লোক বহুবার এই জেলে অতিথি হয়েছি। এই জেলের সকলেই আমাকে জানে। নিশ্চই বের করে নেব।

ডিআইজি সাহেব জেলের ডেপুটি জেলারসহ সকলকে নিয়ে আসলেন। আমার ঘরেও এলেন, একটু বসলেনও। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন কেমন আছেন?’ বললাম, শরীর অনেকটা ভাল, কোন অসুবিধা নাই। কারণ বলে কোন লাভ নাই যে আমাকে কেন আলাদা করে একাকী রেখেছেন? গোয়েন্দা বিভাগ নাকি আদেশ করেছে। ভবিষ্যতে দরকার হলে কেউই স্বীকার করবে না, সে আমি জানি। যাহোক, এরপর তিনি উঠে গেলেন।

আমি আমার জায়গায় বসে রইলাম। চিন্তা একই, কে কে এল! আবদুল মোমিন এডভোকেট, প্রচার সম্পাদক আওয়ামী লীগ, ওবায়দুর রহমান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক, হাফেজ মুছা, ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি, মোস্তফা সরোয়ার, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি, শাহাবুদ্দীন চৌধুরী, সহ-সভাপতি ঢাকা শহর আওয়ামী লীগ, রাশেদ মোশাররফ, সহ সম্পাদক, ঢাকা শহর আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ কর্মী হারুনুর রশিদ ও জাকির হোসেন। দশ সেলে এদের রাখা হয়েছে। এত খারাপ সেল জেলে আর নাই। এখানে আমাদের প্রথমে রাখা হয়েছিল। আমরা প্রতিবাদ করে ওখান থেকে চলে আসি। বাতাস ঐ সেলে ভুল করেও ঢোকে না। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। ডেপুটি জেলার সাহেবকে বললাম। শুনলাম মোমিন সাহেব ডিআইজি সাহেবকে বলেছেন। মোস্তফা সরোয়ারের ব্যবসার খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। পাটের ব্যবসা, একদিন না থাকলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। খুব আঘাত পেলাম। এই নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হওয়ার জন্য আন্দোলন যে পিছাইয়া যাবে না, সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহ নাই। বুঝলাম সকলকেই আনবে জেলে। ধরতে পারলে কাউকেই ছাড়বে না।..."

খাজা মহিউদ্দিন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু যা লিখেছেন-
২৫ জুন ১৯৬৬ শনিবার সন্ধ্যায় দেখলাম পুরানা বিশ সেলে নারায়ণগঞ্জের খাজা মহীউদ্দিনকে নিয়ে এসেছে। ওর বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা দিয়েছে। ডিভিশন দেয় নাই। ভীষণ মশা, পরশু পরীক্ষা, মশারিও নাই। তাড়াতাড়ি একটা মশারির বন্দোবস্ত করে ওকে পাঠিয়ে দিলাম। আমার কাছাকাছি যখন এসে গেছে একটা কিছু বন্দোবস্ত করা যাবে। বেশি কষ্ট হবে না। খাজা মহিউদ্দিন খুব শক্তিশালী ও সাহসী কর্মী দেখলাম। একটুও ভয় পায় নাই। বুকে বল আছে। যদি দেশের কাজ করে যায় তবে এ ছেলে একদিন নামকরা নেতা হবে, এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই। ত্যাগ করার যখন প্রাণ আছে, আদর্শ যখন ঠিক আছে, বুকে যখন সাহস আছে একদিন তার প্রাপ্য দেশবাসী দেবেই।

২৬ জুন ১৯৬৬ রবিবার
ভোর রাত্র থেকেই মাথা ভার ভার লাগছিল। বিছানা ছাড়তেই মাথার ব্যথা বেড়ে গেল। আমার মাথায় যন্ত্রনা হলে অসহ্য হয়ে উঠে। অনেকক্ষণ বাইরে বসে রইলাম, চা খেলাম, কিছুতেই কমছিল না। ওষুধ আমার কাছে আছে, ‘স্যারিডন’, কিন্তু সহজে খেতে চাই না। আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুলে বেশি লাগে তাই অনেকক্ষণ বাইরে যেয়ে হাটতে লাগলাম। বাতাসে ভালই লাগছিল। ব্যাথা একটু কম লাগছিল। ব্যথা একটু কম কম লাগছিল।

ডিপুটি জেলার সাহেব চলে গেলেন। রবিবার ছুটির দিন। তবুও এঁদের ছুটি নাই, অনেক কাজ। নারায়ণগঞ্জ থেকে চটকল ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল মান্নানকে নিয়ে এসেছে। জামিন দেয় নাই, নারায়ণগঞ্জে মামলায় তাকে আসামি করেছে। ভদ্রলোক কাছেও ছিল না। শুনলাম নারায়ণগঞ্জে মশা কামড়াইয়া তার হাত মুখ ফুলাইছে দিয়াছে। আরও বহু লোককে গ্রেপ্তার করে নারায়ণগঞ্জ জেলে রেখেছে। অনেক ছাত্রও আছে। জামিন পায় নাই। কাপড় দেয় নাই, ডিভিশন দেয় নাই। প্রত্যেকটা লোক অর্ধেক হয়ে গেছে। তিন শতের উপর লোককে আসামি করেছে। যাকেই পেয়েছে গ্রেপ্তার করে জেলে দিতেছে।

খাজা মহীউদ্দিন পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। আর একটা ছেলে-মিলকী তাকে অনুমতি দেওয়া হয় নাই। জেল কর্তৃপক্ষ ঢাকার এসডিওকে জানাইয়াছিল। তিনি বলেছিলেন, ডিসি সাহেবের সাথে পরামর্শ করে জানাবেন। আগামীকাল সকালে পরীক্ষা শুরু হবে। কোনো খবর এসিডও সাহেব দেন নাই। বোধহয় ঢাকার ডিসি সাহেব গভর্নর সাহেবের অতি প্রিয় লোক। অনুমতি দেন নাই। খুব মুখ কালো করে দাড়িয়েছিল ছেলেটা। একটা বৎসর নষ্ট হয়ে গেল। ফিস দিয়েছে, সকাল কিছু প্রস্তুত, কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেয় নাই।

পুরানা ২০ সেলে তাকে বললাম দূর থেকে, ‘ভেব না ভাই। আমাকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাহির করে দিয়েছিল। যারা বাহির করে দিয়েছেন তাঁদের অনেকেই আমার কাছে এসেছিলেন। ক্ষমা করে দিয়েছিলাম-পরে শোধ নিতে পারতাম, নেই নাই। খোদার উপর নির্ভর করো’। খাজা মহীউদ্দিন যে কি খেয়ে পরীক্ষা দিবে তাই ভাবলাম। ডিপুটি জেলার সাহেবকে বললাম, একটু খেয়াল রাখবেন ছেলেটার দিকে। আমার কাছে তো কিছু কিছু জিনিস আছে কিন্তু দেবার তো হুকুম নাই। তবুও ভাবলাম, বেআইনি হলেও আমাকে কিছু দিতে হবে। দেখা হয়েছিল। আমার সেলের কাছ দিয়ে যেতে হয়। আমি এগিয়ে যেয়ে ওকে আদর করে বললাম, ‘ভেব না, তুমি পাশ করবা। মাথা ঠান্ডা করে লেখবা’। [উল্লেখ্য যে, খাজা মহিউদ্দিন জেলবন্দী অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করেছিলেন।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও