আইউব খানের ক্ষমতা দখলের বর্ষপূর্তিতে সোনাবিবি সড়ক নামকরণ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৭:৪৪ পিএম, ৯ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার

আইউব খানের ক্ষমতা দখলের বর্ষপূর্তিতে সোনাবিবি সড়ক নামকরণ

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ঐতিহাসিক সোনাবিবি সড়কের নাম বাদ দেওয়া নিয়ে যখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, সিটি করপোরেশন ও এর মেয়রের বিরুদ্ধে মামলা সহ আন্দোলনের ঘোষণা তখন ওই সড়কের নামকরণ নিয়ে জানা গেল বিস্তর ইতিহাস। সোনাবিবি ঐতিহাসিক নারী হলেও তাঁর নামে সড়কের নামকরণের পেছনে রয়েছে পাকিস্তানীদের কারসাজি। পাকিস্তানের আইউব খানের ক্ষমতা দখলের বর্ষপূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতেই সেদিন নারায়ণগঞ্জের ২৬টি সড়কের নামকরণ করা হয়। এর মধ্যে বন্দরের উইলসন সড়কের একটি অংশের নাম বাদ দিয়ে রাখা হয় সোনাবিবি।

স্থানীয়রা বলছেন, সোনাবিবিকে নিয়ে তাদের কোন আপত্তি না থাকলেও পাকিস্তানীরা তাদের একটি ইস্যুতে সড়কটির নামকরণ করেছেন। সে ইতিহাস এখন প্রকাশিত হওয়ায় উল্টো ঘৃণা জন্মাচ্ছে।

এরই মধ্যে সড়কটির নাম পরিবর্তন করে আলী আহাম্মদ চুনকা নামকরণ করা হয়েছে। একটি পক্ষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। সূত্র জানায়, ২০১৫ সালেই রাস্তাটির নাম পরিবর্তন করার বিষয়টি প্রস্তাব করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠান হয়। সম্প্রতি ব্যাপরটি প্রকাশ হওয়ার পর গত ১০/১২ দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। ৩ জুলাই সোনাকান্দা নাসিক ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় প্রাঙ্গনে করোনা প্রতিরোধ ও মাদক নিমূর্ল শীর্ষক আলোচনা সভায় অতিথির বক্তব্যে বন্দর থানা আওয়ামীলীগ যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক শহিদ উল্লাহ হাসান মৃধা বলেন, সোনাকান্দাবাসী কে না জানিয়ে চুপে নাসিক মেয়র এই ঐহিত্যবাহী সোনা বিবি রোড স্থলে আলী আহম্মদ চুনকা সড়ক করা জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এমনটা যদি করা হয় তাহলে এই সোনাকান্দায় আগুন জ্বলবে। এই ঐতিহ্য নাম কারো দেয়া নয়, কারো নাম পরিবর্তন করতে চাইলে তাদের ওখানে করুক।

স্থানীয় কাউন্সিলর গোলাম নবী মুরাদ বলেন, ২০১৫ সালে নাসিক থেকে নতুন রাস্তা নিমার্ণের পর সড়কটি নাম পরিবর্তনে নাসিকের মাসিক সভায় উত্থাপন করা হয়। সেখান থেকে নাম পরিবর্তনের প্রস্তুতি শুরু করা হয়, তখন আমি এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলাম না। এই ঐহিত্যবাহী সোনা বিবি সড়কটি নাম পরিবর্তন করা হবে প্রতিবাদ জানানো হবে। এর সাথে হাইকোর্টে মামলা করবো।

মহানগর জাতীয় পার্টি আহবায়ক ও বন্দর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ সানু বলেন, সোনা বিবি রোড কারো দেয়া নাম নয়। এটা পূর্ব পূরুষ থেকে এখনো আমার সম্মানে সহিত নাম উচ্চারণে রেখেছি। সরকারের টাকা উন্নয়ন হয়েছে, কারো পিতা নাম এখানে বরদাস্ত করা হবে না। সোনা বিবি রোডের প্রতিটি এলাকার যুবক ও মুরব্বীদের নিয়ে প্রতিবাদ জানাবো হবে।

এদিকে লেখক ও গবেষক এস এম শহিদুল্লাহ জানিয়েছেন, সপ্তদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের দ্বারা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত নদীর উভয় পাশের প্রত্যেকটি বাড়ি লুন্ঠিত হয়। উপকূলীয় জেলাগুলো তাদের অত্যাচারে এমন জনশূন্য হয়ে পড়ে যে, ঘরে বাতি দেয়ার মতো তখন কোনো লোক ছিল না। জলদস্যুরা সহায় সম্পতি সহ হিন্দু মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুদের অপহরণ করে বিদেশি বণিকদের কাছে বিক্রি করতো। তাদের এ অপতৎপরতার হাত থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের জনপদকে রক্ষার জন্য মোগল শাসকেরা নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ দুর্গ ও সোনাকান্দা দুর্গকে ব্যবহার করতো। এ দুর্গ দুটি তখন মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গ নির্মাণ সম্পর্কে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ‘বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি’ (২য় খন্ড) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘‘হাজীগঞ্জ দুর্গের সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খান যখন ঢাকার সুবাদার হয়ে আসেন, তার কিছু কাল পরেই খুব সম্ভব এই দুর্গটি তৈরি করা হয়েছিল। মগ দস্যুদের ঠেকাবার জন্য এই দুর্গকে ব্যবহার করা হতো।" (পৃষ্ঠা-১২১)

এবং সোনাকান্দা দুর্গ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, সতের শতকের প্রথম দিকে মগ ও পর্তুগীজ জল দস্যুরা জাহাজে করে বাংলাদেশে আসত এবং তারা ডাকাতি ও লুটতরাজ করত। মাঝে মাঝে তারা ঢাকা শহরে এসেও হানা দিত। তাদেরকে ঠেকাবার জন্য ঢাকা শহরের চারদিকে অনেক দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে সোনাকান্দা দুর্গ একটি। খুব সম্ভব এটি সতের শতকের প্রথম দিকেই তৈরি করা হয়েছিল। (পৃষ্ঠা-১২৯)

সোনাকান্দা দুর্গ সম্পর্কে অধ্যাপক মোঃ রেজাউল করিম ও ডক্টর সৈকত আসগর কর্তৃক সম্পাদিত ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস উৎস ও উপাদান’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘এ (সোনাকান্দা) দুর্গ নিয়ে অনেক মুখরোচক কাহিনী শোনা যায়। একটি কাহিনী মতে ঈসা খান কেদার রায়ের বিধবা কন্যা সোনাবিবিকে জোর করে বিয়ে করে এ দুর্গে রাখার সময় তিনি কেঁদেছিলেন (কান্দা) বলে এ দুর্গের নাম হয় সোনাকান্দা। অন্য আর একটি কাহিনী মতে সোনা বিবি ঈসা খানের অনুপস্থিতিতে মোগল আক্রমণ থেকে একাকী দুর্গ রক্ষা করতে অসমর্থ হয়ে কেঁদেছিলেন বলে এ দুর্গের নাম হয় সোনাকান্দা। এ ধরনের আরও কাহিনী শোনা যায়।

এ সমস্ত কাহিনীর মূলে যে কোন সত্য নেই, তা বলাই বাহুল্য। আরাকানী (মগ) জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মোগল আমলে এ দুর্গ নির্মিত হয়েছিল ঢাকার মোগল সুবাদার কর্তৃক। তবে এ দুর্গ মীর জুমলা কর্তৃক, না তার অনেক আগে নির্মিত হয়েছিল, সে সম্বন্ধে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।’ (পৃষ্ঠা-৩৪০)

‘নারায়ণগঞ্জের স্মৃতি বিস্মৃতি’ গ্রন্থের তথ্যমতে সোনাকান্দা দুর্গ সংলগ্ন এই সোনাবিবির নামেই উইলসন রোডের একটি অংশকে (ইংরেজ পৌর চেয়ারম্যান এইচ টি উইলসন-এর নামে নবীগঞ্জ হতে মদনগঞ্জ পর্যন্ত রোডটির নাম ছিল ‘উইলসন রোড`) ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর ‘সোনাবিবি রোড’ নামে নতুন নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে সোনাবিবি রোডটিকে ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। যা আজও বিদ্যমান আছে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর ছিল আইউব খানের ক্ষমতা দখলের প্রথম বার্ষিকী। আইউব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর সোমবার প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতা থেকে জোর করে সরিয়ে নিজেই পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছিলেন।

তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবরকে ‘বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী’ ঘোষণা দিয়ে নারায়ণগঞ্জ পৌর এলাকার প্রায় ২৬টি রোডের নাম পরিবর্তন করেছিল। এই সোনাবিবি রোডটি হলো তাদের মধ্যে একটি। অর্থাৎ স্বৈরশাসক আইউব খানের ক্ষমতা দখলের স্মৃতি চিহ্ন। যে আইউব খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছয় দফা ঘোষণার জন্য দীর্ঘদিন কারান্তরালে রেখে কষ্ট দিয়েছিল।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও