করোনায় মৃত নারীদের লাশ দাফনে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা রোজিনার

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৩ পিএম, ২২ জুলাই ২০২০ বুধবার

করোনায় মৃত নারীদের লাশ দাফনে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা রোজিনার

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসে হটস্পট হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। কিন্তু একজন দুজন করে প্রতি সপ্তাহেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আর এ মৃত ব্যক্তিদের দাফন কিংবা সৎকার নিয়ে দুর্ভোগে পরতে হচ্ছে স্বজনদের। কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে চললেও মৃতব্যক্তিদের দাফনে এখনও মানুষ এগিয়ে আসছে না। স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলো মৃতদেহ দাফন ও সৎকার করে থাকলেও নারীদের মরদেহ গোসল করানো নিয়ে প্রতিনিয়ত বিপাকে পরতে হয় তাদের।

সেসময় করোনাকে ভয় না পেয়ে এগিয়ে এসেছেন ৪৫ বছরের রোজিনা আক্তার। যার আগে কখনো লাশ গোসলের অভিজ্ঞতা না থাকলেও ইতিমধ্যে শিখে নিয়েছেন নিয়মরীতি। এখনও পর্যন্ত ২৭জন নারীর মরদেহ গোসল করিয়েছেন তিনি। এছাড়া তারই নেতৃত্বে গঠিত মরদেহ দাফন কমিটি করেছেন আরো ৫৯টি।

রোজিনা আক্তার হলেন সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডে ২ বারের নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্য। এনায়েতনগর ইউনিয়নের নারী সদস্য হলেও মরদেহ গোসল করানোর জন্য ইউনিয়নের বাইরেও গিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে গোসল করানোর পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাস্ক, লিফলেট ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন। এছাড়াও মরদেহ দাফনে রোজিনা আক্তারের নেতৃত্বে গঠন করা হয় ‘মাসদাইর যুব কল্যাণ সংঘ (এমজেকেএস)-টিম রোজিনা কোভিড-১৯’।

রোজিনা আক্তার পশ্চিম মাসদাইর এলাকার মরহুম আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী। তার দুই ছেলের মধ্যে রেজোয়ান আহমেদ রাজু বড় আর রায়হান আহম্মেদ ছোট।

রোজিনা আক্তার বলেন, ‘প্রথম যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় আর কাউন্সিলর খোরশেদ ভাই (যিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশের দাফন ও সৎকারে আলোচিত) কাজ করছিলেন তখন ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেই, ‘যদি কোনো মা-বোন মারা যায় তাহলে গোসলের কাজটি আমি সম্পূর্ণ করব।’ কারণ মারা গেলে কেউ এগিয়ে আসছে না। নারীদের গোসল করাতে সমস্যায় পরতে হচ্ছে।

মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, আমি মরে গেলে কি গোসল ছাড়া দাফন করবে? তাই এ কাজ করতে স্ট্যাটাস দেই। তারপর ২৫ এপ্রিল থেকে নারী গোসল করানো শুরু। সেদিন শহরের আমলাপাড়া এলাকায় হোসনে আরা বেগম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মাসদাইর কবরস্থানের মনি আক্তার যিনি নারীদের গোসল করান তাকে ৩ ঘন্টা ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন কাউন্সিলর খোরশেদ ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলেন হোসনে আরা বেগমের লাশ গোসল করানোর জন্য। পরে আমি যাই। কিন্তু কিভাবে গোসল করাতে হয় সেটা জানতাম না। পরে মণি আক্তারকে খোঁজে বের করে আনা হয়। তখন মণি আক্তারের সহযোগিতায় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রথম গোসল করানো হয়। আর তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত ২৭জন নারীর মরদেহ গোসল করিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে একটি মেয়ের গোসল ও দাফনের জন্য গিয়েছিলাম। মেয়েটা করোনায় আক্রান্ত হয়ে সন্ধায় মারা যায় কিন্তু বাবা মা গোসল কিংবা দাফন-কাফনের জন্য কোনো লোক পাচ্ছিলেন না। কাউন্সিলর খোরশেদ ভাই অসুস্থ ছিলেন। তখন তিনি আমাকে ফোন দিয়ে বলেন যে তাঁর টিম যাবে সাথে আমাকে যেতে হবে। তখন আনুমানিক রাত ১২টা। গাজিপুরে যেতে যেতে পর দিন বেলা ১১টায় পৌঁছাই। খুব কষ্ট লেগেছে দেখে যে লাশটি নিয়ে মা-বাবা খাটের উপর বসে আছে। কতটা সময় পার হয়ে গেছে কিন্তু কেউ আসেনি। মূলত মেয়েটির মা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিল। অসুস্থ মায়ের সেবা করতে গিয়ে মেয়েটি আক্রান্ত হয়। মা সুস্থ হলেও, মেয়ে অসুস্থ হয়ে দুই বছরের একটি বাচ্চা রেখে মেয়েটি মারা গেছে। এটি সব চেয়ে কষ্টদায়ক।

এছাড়া গোসল করানোর জন্য সেখানকার তিনজন মহিলাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ওই মহিলারা বিভিন্ন বাহানা দিয়ে তিনজনই পালিয়ে গেছে। কেউ আমাকে সহযোগিতা করে নাই। খুব কষ্টে একা একাই গোসল করিয়েছি। এটা আমি এখনও ভুলতে পারি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘নাম পরিচয় বলতে চাই না। এমনও হয়েছে এক নারী মারা গেছেন তার লাশ গোসল করানোর জন্য বাইরে বের হতে দেয়নি প্রতিবেশিরা, তারা বলেন বাথরুমে গোসল করান। শেষে বারান্দায় গোসল করিয়েছি। আবার পরিবার বলছে, গোসল করিয়েছেন জায়গা পরিস্কার করে দিয়ে যান। এমনও বলেছে ‘আপনাদের পাওনা দিয়েছে’। এগুলো শুনে খুব কষ্ট পেয়েছি।’

রোজিনা আক্তার বলেন, ‘এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। মারা গেলে আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে আসে কিন্তু লাশ ধরতে চায় না। তাই স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও ডেকে পাঠায় যাওয়ার জন্য। এ কাজে যখন নেমেছি তাই যাই। তবে এখন মনে হয় আমি মারা গেলে গোসল হবে। তাই যতদিন পর্যন্ত করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হবে আমার কার্যক্রম চালিয়ে যাবো।’

তিনি বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত আমি করোনায় আক্রান্ত হয়নি। একবার পরীক্ষা করিয়েছি তখন নেগেটিভ আসে। তারপর আর নমুনা দেইনি। কারণ কোন উপসর্গও নেই। আর আমি পরিবার থেকে আলাদা থাকছি। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলছি।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ বলেন, ‘নারীর মরদেহ দাফনে আমরা সব থেকে বেশি সমস্যায় পরেছি গোসল করানোর জন্য। করোনার ভয়ে গোসল করানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসছিল না। তখন রোজিনা আক্তার আসায় আমাদের সব কিছু সহজ হয়ে যায়। এখনও পর্যন্ত আমরা যখনই তাকে জানিয়েছি মরদেহ গোসল করাতে হবে সেটা রাত কিংবা দিন সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছে। তিনি একজন করোনার অকুতোভয় নারী।’

এনায়েতনগর ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জ এলাকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় নাসিমা বেগম (৪০)। আর তারও গোসল করান রোজিনা আক্তার।

নাসিমা বেগমের ননদ এনায়েতনগর ইউনিয়নের সাবেক নারী সদস্য সখিনা বেগম বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে লাশ দিবে না বলে দেয়। এ রোজিনা আপার জন্যই আমার ভাবির লাশটা পেয়েছি। কিন্তু করোনার ভয়ে আমরাই কাছে যাইনি। কিন্তু তিনি ভাবিকে গোসল করিয়েছেন। রোজিনা আপার মতো মানুষ হয় না। আমরা ওনার কাছে কৃতজ্ঞ।’

রোজিনা আক্তারের বড় ছেলে রেজোয়ান আহমেদ রাজু বলেন, ‘মা দুই বারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাই জনগনের সেবা দিতে হবে। এ করোনার পরিস্থিতিতেই তাকে সব থেকে বেশি প্রয়োজন। তাই বাধা দেইনি। তবে সব সময় সাবধানে থাকার জন্য বলেছি। আর এখন বিভিন্ন জায়গায় মানুষ মায়ের প্রশংসা করে তখন আমার গর্ব হয়। আমিই সেই মায়ের সন্তান।’

তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের বাইরে যখন ঢাকা ও গাজীপুর মরদেহ গোসলের জন্য যখন মা গিয়েছে তখন আমি সঙ্গে গিয়েছি। এছাড়াও সার্বক্ষনিক খেয়াল রাখছি যাতে তিনি কোন ভাবে আক্রান্ত না হয়। তবে আল্লাহর রহমতে ও মানুষের দোয়ায় তিনি কিংবা পরিবারের কেউ এখনও পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়নি।’

এনায়েত নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘মরদেহ গোসল ও দাফনে তিনি ও তার টিম এগিয়ে গেছে এতে তিনি উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন। আমরা চাই জনপ্রতিনিধিদের এমন হওয়া উচিত। ওনার কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা করোনা বিষয়ক ফোকাল পারসন ও সদর উপজেলার স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ওনি (রোজিনা আক্তার) মহৎ কাজ করছেন। আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রয়েছে। আমরা নমুনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে রোগী ভর্তি, চিকিৎসা সহ সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। এছাড়াও তাদের স্বাস্থ্যবিধি বলা হয়েছে যাতে তিনি সহ তার টিমের কেউ করোনায় আক্রান্ত না হয়। তবে এখনও পর্যন্ত তারা সুস্থ আছেন।’

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত ৩০ হাজার ১৫৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। যার মধ্যে কোভিড-১৯ পজেটিভ শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৭৭২জন। সুস্থ হয়েছেন ৫ হাজার ১৪৩ এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১২৪ জন।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও