তাঁতীদের খোঁজ নেয় না কেউ’

হাফসা আক্তার, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৭ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২০ মঙ্গলবার

তাঁতীদের খোঁজ নেয় না কেউ’

‘বাংলাদেশের ভৌগলিক নিদর্শন পণ্য জামদানী শাড়ি যারা তৈরি করেন, সে তাঁতীদের দিকে কেউ নজর দেয় না। কেউ জানতেও চায়না সেই তাঁতী কেমন আছে। এই করোনা পরিস্থিতি যাচ্ছে, কেউ তাঁতীদের বিশেষ কোনো খবর নেয়নি। অন্য সাধারণ মানুষের মতোই সামান্য কিছু ত্রাণ পেযেছে তারা।’ বলছিলেন বিসিক জামদানী শিল্পনগরী প্লট মালিক কল্যান সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদিন।

২৭ জুলাই সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া জামদানী পল্লিতে সরেজমিনে দেখা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে পল্লির প্রায় প্রতিটি ঘরেই পানি ঢুকে পরার চিহ্ন রয়েছে। পানি কিছুটা নেমে গেলেও ড্রেনের ময়লা পানি জমে থেকে রাস্তা একবারেই হাঁটার অনুপযোগী। সে পানিতে ২ মিনিট হেঁটে উঠার পরেই ভিশন অস্বস্তি হতে শুরু করে পায়ে।

কয়েকটি বাড়ি থেকে পানি কমে গেলেও তাঁতিদের বসার জন্য মাটিতে যে খাঁজ কাটা হয়, সে খাঁজের পানি এখনো পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

এতে নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার টাকার জামদানী ও জামদানী তৈরির জিনিসপত্র। অনেকেই নিজেদের জামদানী তাঁত উঁচু জায়গায় স্থানান্তর করেছেন। আর যারা পারেনি তাদের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেকদিন মুজুরিও পাচ্ছে না তারা।

তাঁতীদের বরাতে জানা যায়, করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা ‘মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’ এর মতো তাদের জীবনে আক্রমন করেছে। ভারি বর্ষণের কারণে গত ১৫ থেকে ২০ দিন জলাবদ্ধতার শিকার ছিল পুরো জামদানি পল্লী।

আপাতত কিছুটা পানি নেমে গেলেও তা নিয়োমিত কাজ শুরু করার জন্য যথেষ্ট নয়। এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে শাড়ির মূল্য কমে যাওয়ায় ও পাওনা ঠিক মতো আদায় না হওয়ায় তাঁত মালিকেরাও তাঁতীদের মজুরি দিতে পারছেন না। ফলে করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেও যথেষ্ট মজুরি পাননি তাঁতিরা।

আইয়ুব খান নামের এক তাঁতী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমরা দের দুইমাস নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফালাইয়া নিজের সন্তানের মতো কইরা একেকটা শাড়ি বানাই। আর মহাজনেরা সেই শাড়ি লইয়া পায়ের তলে রাখে। তখন বুকটা ফাইটা গেলেও কিছু কইতে পারিনা। অথচ এই সময় দেখেন আমরা না খাইয়া মরুম। করোনার লেইগা কেউ শাড়ি কিনতে আহে নাই। আর আইলেও যেই দামে বেঁচতে হয় তাতে তাঁতীদের মুজুরিও ঠিক মতো দেওন যায়নাই। তাই আমার তাঁতীরা কয়েকজন আজ কাজ করতে আহে নাই।’

ফিহানা জামদানী হাউজের মালিক ফারুক নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমার নিজের ১০ টা তাঁত আছে। কিন্তু থাকলে কি হইবো? করোনার লেইগা কেউ এতদিন শাড়ি কিনতে আহে নাই, আর শাড়ির দামও কমছে। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় শাড়ির পাওনা টাকা আটকাইয়া রইছে করোনার লেইগা। টাকা না আসলেও এই তাঁতিদের মুজুরি তো দিতে হইবো। সে টাকা কই পাবো, তাও মাথায় আসে না।’

৩ পুরুষ ধরে জামদানী শাড়ি তৈরি করা তাঁতি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে পুরা তাঁত নষ্ট হইয়া যাইতাছিল। কেউ খোঁজ নেয় নাই। ৩ পুরুষ ধইরা এই পেশায় আছি, আমাগো কোনো উন্নতি নাই। মাইনসে মনে করে জামদানী তাঁতি, মালিকরা রাজার হালে থাকে। কিন্তু আমরা ঋণে থাকি।’

নূরজাহান তাঁতী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘৭-৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি। আমার স্বামী রিকশা চালায়। করোনার জন্য তার আয় একবারে কইমা গেছে। আর আমার কাজ তো এই পানের লেইগা ১৫-২০ দিন বন্ধ। তো এক প্রকার না খাইয়াই আচি কইতে পারেন। তাঁতীদের লেইগা আলাদা কোনো ব্যবস্থা নাই দেশে।’

বিসিক জামদানী শিল্পনগরী প্লট মালিক কল্যান সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘করোনা যে আসবে সে বিষয়ে তো আমরা জানতাম না। ফলে সে দুর্যোগ না চাইলেও মেনে নিয়েছি। তবে এই এলাকার রাস্তাগুলো উঁচু করা হলে প্লট মালিকরাও নিজেদের বাড়ি উঁচু করার ব্যবস্তা করতে পারে। পানির এ বাজে অবস্থার বিষয়ে আমরা বহুবার বড় কর্মকর্তা ও ডিসির সঙ্গে আলোচনা করেছি। কিন্তু ওই আলোচনা পর্যন্তই সব শেষ। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা ডুবে যায়। এই নোংরা পানি থেকে নানা ভাবে অসুস্থ্য হয় তাঁতিরা।’

রূপগঞ্জ জামদানী শিল্প বিসিক নগরী কর্মকর্তা শাহজাহান আলী বলেন, ‘২০১৯-২০ অর্থবছরে জামদানি শিল্প বিসিক নগরীতে পানির পাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে জামদানির পল্লীর রাস্তাঘাট নির্মাণ ও ড্রেনের ব্যবস্থা করা হবে।’

উল্লেখ্য, জামদানি পল্লী বিসিকে ৩৭৪টি প্লট রয়েছে বলে জানা যায়। এ প্লটগুলো তাঁতিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এখানে তাঁতিরা ঘরবাড়ি নির্মাণ ও তাঁতকল স্থাপন করে বসবাস করেন। প্রায় পাঁচ হাজার তাঁতি থাকেন এই পল্লিতে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও