বেসরকারী হাসপাতালে রোগী মৃত্যু, ডাক্তারদের অবহেলায় ঘটছে লংকাকাণ্ড

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৮ পিএম, ৯ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার



বেসরকারী হাসপাতালে রোগী মৃত্যু, ডাক্তারদের অবহেলায় ঘটছে লংকাকাণ্ড

নারায়ণগঞ্জের হাসাপাতালগুলোতে ভুল চিকিৎসায় লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা কিংবা ভুল চিকিৎসায় কাউকে বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব আবার কাউকে প্রিয়জন হারিয়ে নিঃসঙ্গ হতে হচ্ছে। আবার চিকিৎসার নামে গলাকাটা টাকা হাতিয়ে নিয়ে রোগীর স্বজনদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে কতিপয় ডাক্তার। কিন্তুসম্প্রতি শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর হার অনেকটা বেড়ে গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষ অনেকটা আতঙ্কে রয়েছে। বৃহস্পতিবার ৮ মার্চ দুপুরে শহরের মেডিস্টার জেনারেল হাসপাতালে ঝুমা আকার (২৪) নামের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের ঘটনা ঘটায় স্বজনরা। তাদের অভিযোগ ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজন গাইনি ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করেছে।

রোগীর দেবর শাহেদ জানান, ‘ বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টায় সন্তান প্রসবের জন্য রোগীকে অস্ত্রোপচারের পর জরায়ুর সমস্যার কারণে তাকে পর পর তিনবার অস্ত্রোপচার কার হয়। ওই সময় রোগী ঝুমার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পরে ৪ ব্যাগ রক্ত আনিয়ে তার চিকিৎসা করার ভান করে। আমরা বার বার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলেছি যদি আপনারা না পারেন রোগীকে ছেড়ে দেন আমরা ঢাকা নিয়ে যাব। কিন্তু তার তারপরও হাসপাতালে রেখে ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে মেরে ফেলে।

ঘটনাস্থলে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পরিদর্শন (অপারেশন ) মো. জয়নাল জানান, ‘পরিবারের অভিযোগ ঝুমাকে হত্যা করা হয়েছে। ওই অভিযোগের ডাক্টার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেয়া হচ্ছে।

এখানেই শেষ নয়, এর আগে মেডিপ্লাস নামের আরেকটি হাসপাতালে গত বছর ভুল চিকিৎসার কারণে আরো কয়েকটি রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আর এসব কারণে রোগীর স্বজনেরা বিভিন্ন সময় বলে আসছে, এই হাসপাতাল হচ্ছে রোগী মারার হাসপাতাল। এই হাসপাতালে রোগী আসে জীবিত কিন্তু বের হয় মৃত হয়ে শুধুমাত্র তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে।

গত বছরের ১ নভেম্বর শহরের কালিরবাজারে মেডিপ্লাস হাসপাতালেভুল চিকিৎসায় এক মহিলার মৃত্যুর অভিযোগে নিহতদের স্বজনরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পুলিশ নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। নিহতের নাম পারভীন আক্তার (৪৭)।

নিহত পরিবার জানায়, মেডিপ্লাস হাসপাতালে পারভীন আক্তারের জরায়ু অপারেশন করেন ডাক্তার শান্তা ইসলাম। এসময় ভুল চিকিৎসায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পরে মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোপন রেখে পারভীনকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য শহরের খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠায়। খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা পারভীনকে মৃত ঘোষণা করেন।

খানপুর হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক জান্নাতুল নাইম জানান, পারভীনকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। জানতে পেরেছি পারভীনের জরায়ুর অপারেশন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। মরদেহ তার পরিবারের লোকজন বাড়িতে নিয়ে গেছেন।

এর আগে এই একই মেডিপ্লাস মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই হাসপাতালের স্ত্রী ও গাইনী চিকিৎসক উম্মে সালমা চৌধুরী শান্তার অবেহলায় এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছে মৃতের আত্মীয়।

স্বজনেরা জানায়, ‘অন্তঃস্বত্তা গৃহবধূ লিমা আক্তারকে (২৮) নগরীর কালিরবাজারে অবস্থিত মেডিপ্লাসে ডা. সালমা চৌধুরী শান্তার তত্ত্বাবধায়নে ২৯ মে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকের অবহেলার কারণে ৩০ মে দুপুর ১ টার দিকে সে মারা যায়।

এ ঘটনায় রোগীর আত্মীয় স্বজনরা হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। খবর পেয়ে সদর মডেল থানা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে ক্লিনিকটির চিকিৎসক, নার্স ও ম্যানেজার।

গত ২৭ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর এলাকার আমেনা জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর জননী লিপি আক্তারের সিজার অপারেশনের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে ফেললে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। এতে পেটে সেলাইয়ের স্থানে ইনেফেকশন হয়ে গেলে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নিয়ে নারাজ হয়। এতে রোগীর স্বজনোর হাসপাতালে বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রোগীর স্বজনরা জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর আমেনা হাসপাতালে লিপি আক্তারের সিজার হয়। এরপর থেকে তার সিজারের স্থানে ইনফেকশন হয়ে রোগীর সেলাই খুলে যায়। এতে রোগীর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসক বারবার নানা কথা বলে আমাদেরকে বিদায় করে দেয়। সেলাই খোলা অবস্থায় ৫ দিন হাসপাতালে পড়ে থেকে ব্যাথায় যন্ত্রণা পোহাতে থাকে। পরে অবস্থা খারাপ দেখে ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে পেট থেকে গজ বের হয়ে আসে। এখন তার অবস্থা খুবই খারপ। সে বাঁচবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।

এছাড়া শহরের অন্যতম ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে পরিচিতি পপুলার ডায়াগনস্টির সেন্টারে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষার নামে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে করে হাসাপাতালের আসা রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন সময় এই প্রতিষ্ঠানকে কসাইখানা হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তবে ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিটি স্ক্যান বিভাগে ইনজেকশন পুশ করার পর শাহাবুদ্দিন নামের একজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অশোভন আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এতে স্বজনেরা জানায়, ‘সাড়ে ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি। এরপর ৫তলায় উঠে দেখি বাবাকে পরীক্ষা ছাড়াই ইনজেকশন করা হয়। এর এক পর্যায়ে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হলে পরবর্তীতে তিনি মারা যান।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসা সেবা বলা হলেও এটা কোন সেবা নয়। এটা আসলে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর সেই ব্যবসায় টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে জনগনের পকেট থেকে।  আর সেই ব্যবাসার বলি হতে হচ্ছে ভুল চিকিৎসার কারণে অসংখ্য মানুষকে। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাপটে অন্যায় করেও খালাস পেয়ে যাচ্ছে এসব কষাই চিকিৎসকরা। আর প্রতিষ্ঠানগুলো রমরমা গলাকাটা ব্যবসা করে যাচ্ছে।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও