লাশের সঙ্গে আপোষের টাকা যায় বিএমএ নেতাদের পকেটে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:২৬ পিএম, ১২ মার্চ ২০১৮ সোমবার



লাশের সঙ্গে আপোষের টাকা যায় বিএমএ নেতাদের পকেটে

নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে একের পর এক রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সব দায় যেন রোগী ও স্বজনদের। কারণ বিগত কয়েক বছরে অর্থলোভী চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসা ও বেসরকারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় অসংখ্য রোগীর মৃত্যু হলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়নি বললেই চলে। বরং প্রভাবশালীদের তদ্বিরে পার পেয়ে যাচ্ছে কসাই খ্যাত ওইসকল চিকিৎসকরা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ওই সকল অর্থলোভীদের পক্ষে চিকিৎসকদের জেলা ভিত্তিক বিএমএ’র নেতাদের ছুটে যেতে দেখা যায় তদ্বির নিয়ে। এতে মধ্যস্থতায় মোটা অংকের টাকা খসলেও তার টিকিটিও পায় না ভুক্তভোগীরা। বরং টাকার একটি বড় অংশ চলে যায় প্রশাসন, বিএমএ, ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সরকার দল সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরামের কয়েকজন নেতার পকেটে। বিপরীতে জেলাতে সিভিল সার্জন থাকলেও তিনিও থাকছেন নীরবতায়।

আবার দেখা গেছে ওইসকল অর্থলোভীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও সেই মামলা নিস্পত্তি হতে পার হয় বছরের পর বছর। ফলে বার বার অঘটন ঘটিয়ে পার পেয়ে যায় ওইসকল চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত ৮ মার্চ দুপুরে শহরের মেডিস্টার জেনারেল হাসপাতালে ঝুমা আকার (২৪) নামের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের ঘটনা ঘটায় স্বজনরা। তাদের অভিযোগ ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজন গাইনি ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করে। বিক্ষুব্দ রোগীর স্বজনরা ওইসময় হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ঘটনার পরেই এলিট শ্রেণির ক্লাব হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে সমঝোতায় বসে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন তথা বিএমএ এর শীর্ষ নেতারা। সেখানে প্রশাসনের কয়েকজন কর্তাব্যক্তিও ছিলেন। প্রায় ১৫ লাখ টাকার একটি রফাদফা ঘটে সেখানে। পরে রাতেই বিএমএএর প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে দেখা গেছে রাতেই সদর মডেল থানায় গিয়ে আটককৃতদের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে পুলিশের সঙ্গেও বেশ দাপট দেখান এসব বিএমএ নেতারা। সঙ্গে ছিলেন স্বাচিপেরও (স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরাম) কয়েকজন নেতাকে।

ডাক্তারদের একটি সূত্র জানান, সে রাতে ক্লাব বসে রফাদফার পর টাকার একটি অংশ চলে যায় বিএমএ নেতাদের পকেটে। আর কিছু টাকা পায় প্রশাসনের একটি অংশ। সিভিল সার্জন অফিসকে ম্যানেজের কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হয় টাকার একটি ভাগ। শেষে সব মিলে মৃতের পরিবারকে চাপ দেয় ও মামলা না করার কথা বলে।

ওই ডাক্তার আরো জানান, শুধু ঝুমা আক্তার না এর আগেও আরো অনেক ঘটনায় এভাবে টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটে। কোন ক্লিনিকে ঘটনা ঘটলেই তৎপর হয়ে উঠে বিএমএ নেতারা। আর সে কারণেই এ সংগঠনটি কুক্ষিগত করে রেখেছে কয়েকজন ডাক্তার।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা কিংবা ভুল চিকিৎসায় কাউকে বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব আবার কাউকে প্রিয়জন হারিয়ে নিঃসঙ্গ হতে হচ্ছে। আবার চিকিৎসার নামে গলাকাটা টাকা হাতিয়ে নিয়ে রোগীর স্বজনদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে কতিপয় ডাক্তার ও বেসরকারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর হার অনেকটা বেড়ে গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষ অনেকটা আতঙ্কে রয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করা হলেও সন্ধ্যায় প্রভাবশালীদের তদ্বিরে ও মোটা অংকের লেনদেনে শেষ পর্যন্ত রোগীর স্বজনরা বিনা ময়নাতদন্তেই লাশ দাফন করতে বাধ্য হয়। তারা আপোষনামা দেয়ায় ওইদিন রাতেই থানা থেকে মুক্ত হয়ে যায় ডাক্তার অমল কুমারসহ আটককৃত ৫ জন।

এর আগে মেডিপ্লাস নামের আরেকটি হাসপাতালে গত বছর ভুল চিকিৎসার কারণে আরো কয়েকটি রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আর এসব কারণে রোগীর স্বজনেরা বিভিন্ন সময় বলে আসছে, এই হাসপাতাল হচ্ছে রোগী মারার হাসপাতাল। এই হাসপাতালে রোগী আসে জীবিত কিন্তু বের হয় মৃত হয়ে শুধুমাত্র তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে। গত বছরের ১ নভেম্বর শহরের কালিরবাজারে মেডিপ্লাস হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় এক মহিলার মৃত্যুর অভিযোগে নিহতদের স্বজনরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পুলিশ নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। নিহতের নাম পারভীন আক্তার (৪৭)। নিহত পরিবার জানায়, মেডিপ্লাস হাসপাতালে পারভীন আক্তারের জরায়ু অপারেশন করেন ডাক্তার শান্তা ইসলাম। এসময় ভুল চিকিৎসায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পরে মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোপন রেখে পারভীনকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য শহরের খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠায়। খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা পারভীনকে মৃত ঘোষণা করেন। খানপুর হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক জান্নাতুল নাইম জানান, পারভীনকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। জানতে পেরেছি পারভীনের জরায়ুর অপারেশন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। মরদেহ তার পরিবারের লোকজন বাড়িতে নিয়ে গেছেন।

এর আগে এই একই মেডিপ্লাস মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই হাসপাতালের স্ত্রী ও গাইনী চিকিৎসক উম্মে সালমা চৌধুরী শান্তার অবেহলায় এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছে মৃতের আত্মীয়। স্বজনেরা জানায়, ‘অন্তঃস্বত্তা গৃহবধূ লিমা আক্তারকে (২৮) নগরীর কালিরবাজারে অবস্থিত মেডিপ্লাসে ডা. সালমা চৌধুরী শান্তার তত্ত্বাবধায়নে ২৯ মে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকের অবহেলার কারণে ৩০ মে দুপুর ১ টার দিকে সে মারা যায়। এ ঘটনায় রোগীর আত্মীয় স্বজনরা হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। খবর পেয়ে সদর মডেল থানা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে ক্লিনিকটির চিকিৎসক, নার্স ও ম্যানেজার।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর এলাকার আমেনা জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর জননী লিপি আক্তারের সিজার অপারেশনের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে ফেললে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। এতে পেটে সেলাইয়ের স্থানে ইনেফেকশন হয়ে গেলে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নিয়ে নারাজ হয়। এতে রোগীর স্বজনোর হাসপাতালে বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগীর স্বজনরা জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর আমেনা হাসপাতালে লিপি আক্তারের সিজার হয়। এরপর থেকে তার সিজারের স্থানে ইনফেকশন হয়ে রোগীর সেলাই খুলে যায়। এতে রোগীর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসক বারবার নানা কথা বলে আমাদেরকে বিদায় করে দেয়। সেলাই খোলা অবস্থায় ৫ দিন হাসপাতালে পড়ে থেকে ব্যাথায় যন্ত্রণা পোহাতে থাকে। পরে অবস্থা খারাপ দেখে ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে পেট থেকে গজ বের হয়ে আসে। এখন তার অবস্থা খুবই খারপ। সে বাঁচবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।

এছাড়া শহরের অন্যতম ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে পরিচিতি পপুলার ডায়াগনস্টির সেন্টারে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষার নামে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে করে হাসাপাতালের আসা রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন সময় এই প্রতিষ্ঠানকে কসাইখানা হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তবে ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিটি স্ক্যান বিভাগে ইনজেকশন পুশ করার পর শাহাবুদ্দিন নামের একজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অশোভন আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এতে স্বজনেরা জানায়, ‘সাড়ে ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি। এরপর ৫তলায় উঠে দেখি বাবাকে পরীক্ষা ছাড়াই ইনজেকশন করা হয়। এর এক পর্যায়ে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হলে পরবর্তীতে তিনি মারা যান।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা বেসরকারী হাসপাতাল ক্লিনিকগুলো রোগী মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অত্যাধিক অর্থ উপার্জনের লোভ। যে কারণে রোগীর অবস্থা গুরুত্বর হলেও তারা অনেক সময়েই হাসপাতাল থেকে রোগীদের ছাড়তে চান না। কোন রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও নারায়ণগঞ্জের বেশীরভাগ বেসরকারী হাসপাতালে নেই আইসিইউ। এছাড়া অনেক হাসপাতালেই নেই সার্বক্ষণিক ডিউটি ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স। অপারেশন থিয়েটারও আধুনিক নয় বেশীরভাগ বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকের। বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ছুটতে হয় বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলোতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসা সেবা বলা হলেও এটা কোন সেবা নয়। এটা আসলে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর সেই ব্যবসায় টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে জনগনের পকেট থেকে।  আর সেই ব্যবাসার বলি হতে হচ্ছে ভুল চিকিৎসার কারণে অসংখ্য মানুষকে। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাপটে অন্যায় করেও খালাস পেয়ে যাচ্ছে এসব কষাই চিকিৎসকরা। আর প্রতিষ্ঠানগুলো রমরমা গলাকাটা ব্যবসা করে যাচ্ছে।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও