৭ আশ্বিন ১৪২৫, শনিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৫:৫৮ অপরাহ্ণ

রোগীর মৃত্যুতে ফুলে ফেঁপে বিএমএ নেতারা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১২:১৩ এএম, ১৫ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার


রোগীর মৃত্যুতে ফুলে ফেঁপে বিএমএ নেতারা

‘আমি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএমএ এর নেতা। যেহেতু অমল বাবুকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি সেহেতু তার সঙ্গে আমি দেখা করতেই পারি। যে কোন কথা বলতে পারি।’ সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে এভাবেই পুলিশের সঙ্গে দাপটে আচরণ করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নারায়ণগঞ্জ জেলার একজন প্রভাবশালী নেতা। থানায় পুলিশের সঙ্গে ওই আচরণের একটি ভিডিও ক্লিপ এসেছে এ প্রতিবেদকের কাছে।

সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের অনেকেই জানান, সে আচরণ যেটা রেকর্ড হয়েছে তাতেই ওই ডাক্তারকে বেশ আগ্রাসী দেখা গেছে পুলিশের সঙ্গে আচরণ করতে। কিন্তু এর আগে ও পরে সে আচরণ ও দাপুটে মনোভাব ছিল আরো বেপরোয়া। একজন ওই ভিডিও ধারণের অন্তত ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই পুলিশের একজন কর্মকর্তার রুমেই ছিলেন বিএমএ ওই নেতা। তার সঙ্গে আরো ছিলেন কয়েকজন ডাক্তার।

ডাক্তারদের একজন জানান, নারায়ণগঞ্জে যারা বিএমএকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেখানে সভাপতি ডা. শাহনেওয়াজ কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন বছরের পর বছর ধরে। সেক্রেটারী পদে কদাচিৎ পরিবর্তন আসলেও সভাপতি পদে আদৌ আসছেন না। বিএমএ এর ওয়েব সাইট অনুযায়ী বর্তমানে সেক্রেটারী ডা. দেবাশীষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্লিনিক মালিক জানান, বিএমএ এর নেতাদের কাজই হলো এখন কোন ক্লিনিক ও বেসরকারী হাসপাতালে কেউ মারা গেলে সেটা রফাদফা করা। মাঝে অভিযুক্ত ওই ক্লিনিক ও হাসপাতাল মালিক কিংবা ডাক্তারের কাছ থেকে মোটা অংকের একটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

গত ৮ মার্চ মেডিস্টার ক্লিনিকে ঝুমা আক্তার নামের এক রোগীর মৃত্যুর পরেও সে কাজটিই হয়েছে। সেদিন রাতেই সদর মডেল থানায় গিয়ে বিএমএ এর একজন নেতাকে দেখা গেছে ঘুরাফেরা করতে। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে পুলিশের একজন কর্মকর্তার রুমে বসে থাকা গাইনি ডাক্তার অমল রায় সহ আটক ৫জনের সঙ্গে কথা বলেন বিএমএ এর ওই প্রভাবশালী নেতা। পরে যখন গণমাধ্যমের একজন কর্মী বিষয়টি দেখে ফেলে তখন পুলিশের কয়েকজন সদস্য দ্রুত সেখানে গিয়ে বিএমএ নেতাকে বেরিয়ে আসতে বলেন। কিন্তু ততক্ষণে ওই কক্ষে আর কেউ ছিল না পুলিশের।

বিএমএএর একজন প্রভাবশালী নেতা জানান, নারায়ণগঞ্জে বিএমএ মূলত কুক্ষিগত আছে। এখানে কমিটিতে রদবদল খুব একটা হচ্ছে না। বরং কোন রোগীর মৃত্যু হলেই বিএমএ এর নেতারা সরব হয়ে উঠেন। বসেন আপোষ মিমাংসাতে।

৮ মার্চ ঝুমা আক্তারের মৃত্যুর পর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে বসে আপোষ সভা। বিএমএ এর একজন শীর্ষ নেতা ওই ক্লাবের সদস্য। তাছাড়া যে ক্লিনিকে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সেই মেডিস্টার ক্লিনিকের পরিচালনা পর্ষদের অনেকেই ক্লাবের সদস্য। সে হিসেবে ক্লাবে রফাদফায় বিলি করা হয় ১৫ লাখ টাকারও বেশী। তবে ওই টাকা কার পকেট থেকেই মূলত গেছে সেটাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিএমএ এর এক ডাক্তার নেতা জানান, দুপুরে যখন মেডিস্টারে ঘটনা তখন তাৎক্ষনিক বিএমএ এর শীর্ষ নেতাদের অবহিত করা হলেও কেউ দ্রুত এগিয়ে আসেনি। এটা ডাক্তারদের জন্য বেশ হতাশাজনক। কারণ একজন ডাক্তারকে যেভাবে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল সেটা শোভনীয় না। আর ডাক্তার অমল রায়ের মত অভিজ্ঞ ডাক্তারের হাতে রোগী মৃত্যুর বিষয়টিও বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। কোন ডাক্তার চান না রোগীর মৃত্যু হউক। কিন্তু বিএমএ নেতারা চান যাতে অন্তত বিষয়গুলো পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। তাহলেই তাদের পকেট ভারী হয়। কারণ দ্রুত বিষয়টির নিস্পত্তি হলে সেখানে বিএমএ নেতাদের পকেটে অর্থকড়ি আসে না। সে কারণেই বিএমএ এসব ক্ষেত্রে মাঝের পথটি তথা মধ্যস্থকারী হিসেবে এখন আবিভূত হয়েছে।

গত ৮ মার্চ দুপুরে শহরের মেডিস্টার জেনারেল হাসপাতালে ঝুমা আকার (২৪) নামের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের ঘটনা ঘটায় স্বজনরা। তাদের অভিযোগ ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজন গাইনি ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করে। বিক্ষুব্দ রোগীর স্বজনরা ওইসময় হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ঘটনার পরেই এলিট শ্রেণির ক্লাব হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে সমঝোতায় বসে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন তথা বিএমএ এর শীর্ষ নেতারা। সেখানে প্রশাসনের কয়েকজন কর্তাব্যক্তিও ছিলেন। প্রায় ১৫ লাখ টাকার একটি রফাদফা ঘটে সেখানে। পরে রাতেই বিএমএএর প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে দেখা গেছে রাতেই সদর মডেল থানায় গিয়ে আটককৃতদের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে পুলিশের সঙ্গেও বেশ দাপট দেখান এসব বিএমএ নেতারা। সঙ্গে ছিলেন স্বাচিপেরও (স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরাম) কয়েকজন নেতাকে।

ডাক্তারদের একটি সূত্র জানান, সে রাতে ক্লাব বসে রফাদফার পর টাকার একটি অংশ চলে যায় বিএমএ নেতাদের পকেটে। আর কিছু টাকা পায় প্রশাসনের একটি অংশ। সিভিল সার্জন অফিসকে ম্যানেজের কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হয় টাকার একটি ভাগ। শেষে সব মিলে মৃতের পরিবারকে চাপ দেয় ও মামলা না করার কথা বলে।

ওই ডাক্তার আরো জানান, শুধু ঝুমা আক্তার না এর আগেও আরো অনেক ঘটনায় এভাবে টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটে। কোন ক্লিনিকে ঘটনা ঘটলেই তৎপর হয়ে উঠে বিএমএ নেতারা। আর সে কারণেই এ সংগঠনটি কুক্ষিগত করে রেখেছে কয়েকজন ডাক্তার।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা কিংবা ভুল চিকিৎসায় কাউকে বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব আবার কাউকে প্রিয়জন হারিয়ে নিঃসঙ্গ হতে হচ্ছে। আবার চিকিৎসার নামে গলাকাটা টাকা হাতিয়ে নিয়ে রোগীর স্বজনদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে কতিপয় ডাক্তার ও বেসরকারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর হার অনেকটা বেড়ে গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষ অনেকটা আতঙ্কে রয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করা হলেও সন্ধ্যায় প্রভাবশালীদের তদ্বিরে ও মোটা অংকের লেনদেনে শেষ পর্যন্ত রোগীর স্বজনরা বিনা ময়নাতদন্তেই লাশ দাফন করতে বাধ্য হয়। তারা আপোষনামা দেয়ায় ওইদিন রাতেই থানা থেকে মুক্ত হয়ে যায় ডাক্তার অমল কুমারসহ আটককৃত ৫ জন।

এর আগে মেডিপ্লাস নামের আরেকটি হাসপাতালে গত বছর ভুল চিকিৎসার কারণে আরো কয়েকটি রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আর এসব কারণে রোগীর স্বজনেরা বিভিন্ন সময় বলে আসছে, এই হাসপাতাল হচ্ছে রোগী মারার হাসপাতাল। এই হাসপাতালে রোগী আসে জীবিত কিন্তু বের হয় মৃত হয়ে শুধুমাত্র তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্বাস্থ্য -এর সর্বশেষ