১ শ্রাবণ ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৭ জুলাই ২০১৮ , ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

রোগী মৃত্যুর ২০ লাখ টাকা কার পকেটে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪৯ পিএম, ১৫ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০২:৪৯ পিএম, ১৫ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার


রোগী মৃত্যুর ২০ লাখ টাকা কার পকেটে

নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি বেসরকারী হাসপাতালে নারী রোগীর মৃত্যুর পর আপোষরফায় ২০ লাখ লেনদেনের পর ওই টাকা কার পকেটে ঢুকেছে তা নিয়ে এখন চলছে আলোচনা। ডাক্তারদের একটি অংশ জানান, মূলত গাইনি ডাক্তার অমল রায়ের কাছ থেকে ওই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও সে টাকার সুষ্ঠু বন্টন হয়নি। পরিবারকে যেমন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি তেমনি অমল রায়কে মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার নাম করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর কতিপয় শীর্ষ নেতা ওই টাকা হাতিয়ে নেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের সলিমুল্লাহ সড়কে ঝুমা আক্তার নামের প্রসূতির মৃত্যুর পরেই বিএমএ এর দুইজন শীর্ষ নেতা সহ ওই ক্লিনিকের পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন মিলে সভা করে। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত আসে অমল রায়ের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। ওই হাসপাতালের কাছে অমল রায়ের পাওনা ছিল ১৩ লাখ টাকা। বিভিন্ন সময়ে পাওনা টাকা প্রদান নিয়ে গড়িমসি শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ৮ মার্চ রোগী মৃত্যুর পর অমল রায়কে পুলিশ ধরে নেওয়ার পরে বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। তখন বিএমএ এর একজন শীর্ষ নেতা বিষয়টি আপোষের জন্য ২০ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয়। নতুবা হত্যা মামলায় অমল রায়কে গ্রেফতার ও মামলা ঠুকে দেওয়া হবে জানানো হয়। পরে রাতেই সদর থানায় আটক বিএমএ এর একজন শীর্ষ নেতা অমল রায়ের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতায় বসেন। বিএমএর শীর্ষ নেতা তখন মুঠোফোনে থানায় পাঠানো অপর নেতার মাধ্যমে অমল রায়কে ২০ লাখ টাকার প্রস্তাব দেন। শর্ত ছিল মেডিস্টার হাসপাতাল থেকে যে পাওনা ১৩ লাখ সেটা বাদ দিয়ে নতুন করে আরো ৭ লাখ দিতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএমএ নেতাদের কপাল খুলে কোন ক্লিনিক বা হাসপাতালে কারো মৃত্যু কিংবা কোন ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি হলে। গত ৮ মার্চ মেডিস্টার ক্লিনিকে ঝুমা আক্তার নামের এক রোগীর মৃত্যুর পরেও সে কাজটিই হয়েছে। সেদিন রাতেই সদর মডেল থানায় গিয়ে বিএমএ এর একজন নেতাকে দেখা গেছে ঘুরাফেরা করতে। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে পুলিশের একজন কর্মকর্তার রুমে বসে থাকা গাইনি ডাক্তার অমল রায় সহ আটক ৫জনের সঙ্গে কথা বলেন বিএমএ এর ওই প্রভাবশালী নেতা। পরে যখন গণমাধ্যমের একজন কর্মী বিষয়টি দেখে ফেলে তখন পুলিশের কয়েকজন সদস্য দ্রুত সেখানে গিয়ে বিএমএ নেতাকে বেরিয়ে আসতে বলেন। কিন্তু ততক্ষণে ওই কক্ষে আর কেউ ছিল না পুলিশের।

‘আমি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএমএ এর নেতা। যেহেতু অমল বাবুকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি সেহেতু তার সঙ্গে আমি দেখা করতেই পারি। যে কোন কথা বলতে পারি।’ সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে এভাবেই পুলিশের সঙ্গে দাপটে আচরণ করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নারায়ণগঞ্জ জেলার একজন প্রভাবশালী নেতা। থানায় পুলিশের সঙ্গে ওই আচরণের একটি ভিডিও ক্লিপ এসেছে এ প্রতিবেদকের কাছে।

সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের অনেকেই জানান, সে আচরণ যেটা রেকর্ড হয়েছে তাতেই ওই ডাক্তারকে বেশ আগ্রাসী দেখা গেছে পুলিশের সঙ্গে আচরণ করতে। কিন্তু এর আগে ও পরে সে আচরণ ও দাপুটে মনোভাব ছিল আরো বেপরোয়া। একজন ওই ভিডিও ধারণের অন্তত ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই পুলিশের একজন কর্মকর্তার রুমেই ছিলেন বিএমএ ওই নেতা। তার সঙ্গে আরো ছিলেন কয়েকজন ডাক্তার।

ডাক্তারদের একজন জানান, নারায়ণগঞ্জে যারা বিএমএকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেখানে সভাপতি ডা. শাহনেওয়াজ কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন বছরের পর বছর ধরে। সেক্রেটারী পদে কদাচিৎ পরিবর্তন আসলেও সভাপতি পদে আদৌ আসছেন না। বিএমএ এর ওয়েব সাইট অনুযায়ী বর্তমানে সেক্রেটারী ডা. দেবাশীষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্লিনিক মালিক জানান, বিএমএ এর নেতাদের কাজই হলো এখন কোন ক্লিনিক ও বেসরকারী হাসপাতালে কেউ মারা গেলে সেটা রফাদফা করা। মাঝে অভিযুক্ত ওই ক্লিনিক ও হাসপাতাল মালিক কিংবা ডাক্তারের কাছ থেকে মোটা অংকের একটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

বিএমএএর একজন প্রভাবশালী নেতা জানান, নারায়ণগঞ্জে বিএমএ মূলত কুক্ষিগত আছে। এখানে কমিটিতে রদবদল খুব একটা হচ্ছে না। বরং কোন রোগীর মৃত্যু হলেই বিএমএ এর নেতারা সরব হয়ে উঠেন। বসেন আপোষ মিমাংসাতে।

গত ৮ মার্চ দুপুরে শহরের মেডিস্টার জেনারেল হাসপাতালে ঝুমা আকার (২৪) নামের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের ঘটনা ঘটায় স্বজনরা। তাদের অভিযোগ ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজন গাইনি ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করে। বিক্ষুব্দ রোগীর স্বজনরা ওইসময় হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ঘটনার পরেই এলিট শ্রেণির ক্লাব হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে সমঝোতায় বসে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন তথা বিএমএ এর শীর্ষ নেতারা। সেখানে প্রশাসনের কয়েকজন কর্তাব্যক্তিও ছিলেন। প্রায় ১৫ লাখ টাকার একটি রফাদফা ঘটে সেখানে। পরে রাতেই বিএমএএর প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে দেখা গেছে রাতেই সদর মডেল থানায় গিয়ে আটককৃতদের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে পুলিশের সঙ্গেও বেশ দাপট দেখান এসব বিএমএ নেতারা। সঙ্গে ছিলেন স্বাচিপেরও (স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরাম) কয়েকজন নেতাকে।

ডাক্তারদের একটি সূত্র জানান, সে রাতে ক্লাব বসে রফাদফার পর টাকার একটি অংশ চলে যায় বিএমএ নেতাদের পকেটে। আর কিছু টাকা পায় প্রশাসনের একটি অংশ। সিভিল সার্জন অফিসকে ম্যানেজের কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হয় টাকার একটি ভাগ। শেষে সব মিলে মৃতের পরিবারকে চাপ দেয় ও মামলা না করার কথা বলে।

ওই ডাক্তার আরো জানান, শুধু ঝুমা আক্তার না এর আগেও আরো অনেক ঘটনায় এভাবে টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটে। কোন ক্লিনিকে ঘটনা ঘটলেই তৎপর হয়ে উঠে বিএমএ নেতারা। আর সে কারণেই এ সংগঠনটি কুক্ষিগত করে রেখেছে কয়েকজন ডাক্তার।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্বাস্থ্য -এর সর্বশেষ