৬ আশ্বিন ১৪২৫, শনিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

বিএমএ নির্বাচনে অলোকের উস্কানিতে যেভাবে যা ঘটে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:২৮ পিএম, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ শুক্রবার


বিএমএ নির্বাচনে অলোকের উস্কানিতে যেভাবে যা ঘটে

ডাক্তারদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে গন্ডগোল ও বহিরাগতদের নিয়ে হামলার পেছনে নেপথ্যের উষ্কানীদাতা হিসেবে ডা. অলোক কুমার সাহার কিছু কর্মকান্ডকে দায়ী করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে। ভোট গণনা চলাকালীন সময়ে তাঁর কিছু সন্দেহজনক আচরণও নজরে এসেছে নিউজ নারায়ণগঞ্জের এই প্রতিবেদকের দৃষ্টিতে।

৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় রাইফেল ক্লাব মিলনায়তনে ওই ভোট গ্রহণ হয়।

বিকেল ৪ টায় ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সমাপ্ত হবার পর সাময়িক বিরতি শেষে বিকেল ৫ টা থেকে শুরু হয় ভোট গণনা। ওই সময় উভয় প্যানেলের পক্ষ থেকে প্রার্থী ও পোলিং এজেন্টের সমন্বয়ে ৩ জন করে ৬ জনের একটি প্রতিনিধি দল ভোট গণনা কক্ষে প্রবেশের অনুমতি পায়।

অন্যদিকে স্বতন্ত্র সভাপতি প্রার্থী ডা. শাহনেওয়াজ চৌধুরীর পক্ষ থেকে ২ জন ওই কক্ষে অবস্থান করেন। যেখানে সোহেল-নিজাম প্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. অলোক কুমার সাহা ওই কক্ষের ভিতরে ছিলেন।

গণনা প্রক্রিয়া কেমন হবে তার সঠিক নির্দেশনা না থাকায় অনেকটা ক্ষীণ গতিতেই প্রথম থেকে চলছিল ভোট গণনা। এমন অবস্থার মাঝে রাত ৮টা পর্যন্ত পরিষ্কার কোন তথ্যই গণনা কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমান কাউকে জানানো হয়নি জানা গেছে।

এর আগে সাড়ে ৭টায় প্রথম বারের মতো গণনা কক্ষের পাশের জানালায় এসে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয় এখন পর্যন্ত ভিতরে কোন সমস্যা হয়নি বরং ভোট কাউন্টে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। এর কিছু সময় পরেই জানালার পাশে আসেন ডা. অলোক। তখন তিনি নিজের প্যানেলের সমর্থকদের ডাকেন এবং ভিতরে খাবার পাঠাতে বলেন। পাশাপাশি তখন থেকেই সোহেল নিজাম প্যানেলের প্রার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাঝেও পিছিয়ে রয়েছেন তারা (সোহেল ও নিজাম প্যানেল)।

এরপর থেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে ভোট গণনা কক্ষের পাশের জানালায় এসে উভয় প্যানেলের প্রতিনিধিরা ভিতরের গণনাকৃত ফলাফল বাইরে জানাচ্ছিলেন নিশ্চিত করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন যারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে অনীহা জানিয়েছেন।

তবে সোহেল-নিজাম প্যানেলের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ডা. অলোককেই জানালার পাশে দেখা যায়। এভাবে ভোট গণনা চলাকালে রাত ১১টায় ডা. অলোক কুমার সাহা আবারো জানালার সামনে আসেন এবং হৈ চৈ করতে শুরু করেন।

তাঁর হাকডাক শুনে উভয় প্যানেলের সমর্থকেরা সেখানে উপস্থিত হলে হঠাৎ করেই স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী ডা. চৌধুরী ইকবাল বাহারের উপর চড়াও হয় প্রতিদ্বন্দী প্যানেলের সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল। অনেকটা আত্মরক্ষার্থেই পাল্টা হাত চালায় ইকবাল-দেবাশিষ প্যানেলের সমর্থকেরা।

এসময় দ্রুত নির্বাচন কেন্দ্র থেকে প্রস্থানকালীন সময় প্রতিদ্বন্দ্বি প্যানেলের দফতর সম্পাদক প্রার্থী ইউসুফ আলী সরকার ও এএসপি পদমর্যাদা সম্পন্ন একজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনকে নিজ হাতে মারধর করেন ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল। তার সাথে বহিরাগত অনেককেই দেখা গেছে। এদিকে ভোটকেন্দ্র থেকে প্রস্থানের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্যে ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল জানান তারা ভোটকেন্দ্র থেকে কোন রকম প্রাণ নিয়ে পালিয়েছেন এবং নির্বাচন বয়কট করেছেন।

উল্লেখ্য যে, হামলার শিকার ঐ পুলিশ কর্মকর্তা সে সময়ে সাদা পোশাকে ছিলেন এবং তিনি সম্পর্কে ডা. ইকবাল বাহার চৌধুরীর আত্মীয় বলে জানা গেছে।

মূলত সে সময় ভোট গণনা চলাকালে সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রার্থীর একটি ভোট নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে সোহেল-নিজাম প্যানেলের পক্ষ থেকে ডা. অলোক ভোট পুনরায় গণনা করতে হবে বলে দাবি তোলেন। সে সময় নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়, ‘ভোটের ব্যাবধান যদি কম দেখা যায় তবে রিকাউন্ট করা হবে প্রথম দফায় ভোট গণনা শেষ করা হোক। যদি ভোটের ব্যবধান বেশি হয় তাহলে পুনরায় গণনার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।’

কিন্তু বিষয়টি মেনে নেয়নি সোহেল-নিজাম প্যানেলের প্রতিনিধিরা। এ সময় স্বাচিপ সমর্থিত প্যানেলের প্রতিনিধিদের সাথে তর্কে জড়ায় ডা. অলোক। তর্ক বাড়তে থাকলে ডা. অলোক জানালার পাশে এসে বলেন ভিতরে ভোট গণনা নিয়ে চাতুরি হচ্ছে, তিনি বাধা দেওয়ায় তাকে অপমান করা হচ্ছে। তার এমন কথার পর থেকেই শুরু হয় হট্টগোল। এ সময় ডা. অলোক একবার ভোট গণনা কক্ষের দরজা খুলে বাইরে এসেছিলেন বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ।

এদিকে একটি ভোটকে ইস্যু করে ডা. অলোকের হঠাৎ তর্কে জড়িয়ে পড়েন। নির্বাচন কমিশনের গঠনমূলক আশ্বাসের পরেও তা মেনে না নেওয়া এবং কিছু সময় পর পরই বাইরের প্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ করা বা যোগাযোগের চেষ্টাকেই হট্টোগোলের নৈপথ্যের কারণ হিসেবে মনে করছেন সকলে।

এ প্রসঙ্গে ডা. অলোক কুমার সাহার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোনে তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে দুটি প্যানেল অংশ নেয়। মধ্যে ২৩জনের প্যানেলের বিপরীতে সভাপতি ছাড়া প্যানেল করে সহ সভাপতি আতিকুজ্জামান সোহেল ও সেক্রেটারী নিজাম আলীর নেতৃত্বে। সভাপতি হিসেবে স্বতন্ত্র ডা. শাহনেওয়াজ থাকলেও তিনিও অন্তরালে এ প্যানেলের অধিভুক্ত ছিলেন। অপর প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন ইকবাল বাহার ও দেবাশীষ সাহা।

৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে রাইফেল ক্লাবে অনানুষ্ঠানিক ভাবে ওফলাফল প্রকাশ করেন বিএমএ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নির্বাচন কমিশনার ডা. আসাদুজ্জামান যিনি একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও)।

তিনি জানান, নির্বাচনে ইকবাল বাহার ও দেবাশীষ সাহার নেতৃত্বাধীন ২৩ জনের পুরো প্যানেল বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচনে ৩৮৭ ভোটের মধ্যে ৩১৫টি ভোট কাস্ট হয়। এর মধ্যে সভাপতি পদে ইকবাল বাহার পেয়েছেন ১৮৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বি ডা. শাহনেওয়াজ পেয়েছেন ১২৬ ভোট। সেক্রেটারী পদে দেবাশীষ সাহা পেয়েছেন ২১১ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বি নিজাম আলী পেয়েছেন ১০৪ ভোট।

ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলে। কিন্তু রাতে ভোট গণনার সময় ভোটকেন্দ্রস্থল চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবে দুই প্যানেলের লোকজনদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে শুনেছি। এ বিষয়ে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত বিএমএ নারায়ণগঞ্জ শাখার নির্বাচনে দীর্ঘ ২৫ বছর পর ডাক্তাররা ভোট দেয়ার সুযোগ পেলেন। সর্বশেষ ভোট হয়েছিলো ১৯৯৩ সালে। দুই যুগে বহুবার নির্বাচন হলেও ভোট প্রদানের কোন সুযোগ ছিল না। প্রার্থীরা সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্বাস্থ্য -এর সর্বশেষ