৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৪:১৩ পূর্বাহ্ণ

UMo

জনবল সংকটে ৩০০ শয্যা হাসপাতাল, রোগী চিকিৎসকের চরম ভোগান্তি


সোহেল রানা, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১০:১১ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০১৮ রবিবার


জনবল সংকটে ৩০০ শয্যা হাসপাতাল, রোগী চিকিৎসকের চরম ভোগান্তি

নারায়ণগঞ্জের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্যতম চিকিৎসা কেন্দ্র হচ্ছে খানপুরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। প্রতিদিন হাসপাতালে প্রবেশ করলেই দেখা যায় অসংখ্য রোগীর ভীড়। কারণ মাত্র ১০ টাকার টিকিটে এখানে পাওয়া যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা। সেই সাথে রয়েছে বিনা মূল্যের ওষুধ সহ স্বল্প মূল্যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সুবিধা। কিন্তু একটি টিকিট কিনতেই রোগীদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেই সাথে রয়েছে টিকিট কাউন্টারের সামনে ভ্যাপসা গরম। আবার টিকিট কিনেও ভোগান্তি শেষ হচ্ছে না তাদের। ডাক্তারের চেম্বারের সামনেও দাঁড়াতে হচ্ছে লম্বা সিরিয়ালে।

হাসপাতালটিতে রয়েছে জনবল সংকট। যে কারণে রোগীদের পোহাতে হচ্ছে এমন দুর্ভোগ। রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলেও প্রচন্ড ভিড়ে আর ভ্যাপসা গরমে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তারা। এত কষ্ট করে টিকিট নিলেও কখনো কখনো ডাক্তারের চেম্বারের সামনে লম্বা সিরিয়ালের কারণে চিকিৎসা নিতে পারছেন না অনেক রোগী। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে বাইরের ক্লিনিকগুলোতে বাড়তি টাকা দিয়ে নিচ্ছেন প্রাইভেট চিকিৎসকের চিকিৎসা।

হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ১৩শ থেকে ১৪শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু সেই তুলনায় নেই পর্যাপ্ত জনবল। এত লোকের কাছে টিকিট বিক্রির জন্য কাউন্টারে রয়েছে মাত্র ৩জন। যে কারণে টিকিট বিক্রি করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফলে টিকিট কাউন্টারের সামনে বাধছে লম্বা সিরিয়াল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকে করছে টিকেট কালোবাজারি।

বিশেষ মাধ্যমে জানা যায়, কাউন্টারে কর্মরত তিন জন কর্মকর্তাই প্রতি দিন এক ঘণ্টা লেট করে আসেন। হাসপাতালের কাউন্টারে সকাল ৮টায় উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও প্রতিদিন তারা আসেন ৯টা বাজে বা তারো পরে। কাউন্টারের সামনে রোগীদের দীর্ঘ লাইন বাধার অন্যতম কারণ হচ্ছে সময়মত টিকিট কাউন্টার না খোলা।

এ সময় আরো জানা যায়, কাউন্টারের কর্মকর্তাদের যোগসাজসেই চলে টিকিট কালোবাজারি। দালালদের সাথে আগে থেকে করা চুক্তি অনুযায়ী টাকার বিনিময়ে দালালরা যখনি কাউন্টারে যায় সবার আগে তাদের টিকিট দেওয়া হয়। এতে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌছে গেছে।

প্রথম পর্যায়ে হাসপাতালটি ২০০ শয্যা বিশিষ্ট ছিল। ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটিকে ৩০০ শয্যা বশিষ্ট হাসপাতালে উন্নিত করা হয়। এখন হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালটি এখনো চলছে প্রথম পর্যায়ের ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জনবল নিয়ে। ফলে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে যেমন প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন হাসপাতালে আসা রোগীরা তেমনি রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে জাপান সরকারের সহায়তায় নির্মাণ করা হয় খানপুর হাসপাতাল। তখন হাসপাতালটি ছিল ২০০ শয্যা বিশষ্ট এবং এর জনবল ছিল ৩৯৪ জন। পরবর্তিতে হাসপাতালটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি ৩০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এখন হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলছে। সেই সাথে হুহু করে বেড়েছে শহরের জনসংখ্যা ও চিকিৎসা প্রত্যাশী। কিন্তু হাসপাতালের বেড সংখ্যা বাড়লেও এখনো বাড়ানো হয়নি জনবল।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধমে জানা যায়, হাসপাতালটির মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৩৯৪ জনের মধ্যে রয়েছে ৩২০ জন। ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীসহ পদ শূন্য রয়েছে ৭৫টি। হাসপাতালটিতে এখন ৫০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। নার্স রয়েছে ১৫২ জন। হাসপাতালটিতে পদ শূন্য রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), সিনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু), সিনিয়র কনসালটেন্ট (এনেসথেশিয়া), সিনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি), সিনিয়র কনসালটেন্ট (চর্ম বিভাগ)। এছাড়া তৃতীয় শ্রেনির কর্মকর্তা রয়েছে ৬০ জনের মধ্যে ৫১ জন। চতুর্থ শ্রেনির কর্মচারী রয়েছে ১৩৯ জনের মধ্যে ১০২ জন। জনবলের এই পরিসংখ্যান ২০০ শয্যা হাসপাতাল থাকা অবস্থায়। এখন এটি ৫০০ শয্যায় উন্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু লোকবল ২০০ শয্যার পরিসংখ্যান অনুযায়ি যা প্রয়োজন তার থেকেও কম।

এছাড়া রয়েছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের লোকবল সংকট। মাত্র ২ জন মেডিকেল অফিসারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। যা নারায়ণগঞ্জের বর্তমান জনসংখ্যার তুলনায় খুব কম।

তথ্যমতে, হাসপাতালের একেকজন ডাক্তার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৫ঘন্টায় গড়ে ২৬-২৮ জন রোগী দেখেন। প্রতি ঘন্টায় যা দাঁড়ায় প্রায় ৬ জন। অর্থাৎ প্রতিটি রোগী দেখার জন্য ডাক্তার সময় পায় মাত্র ১০ মিনিট। ডাক্তারের চা, নাস্তা খাওয়া কিংবা টয়লেটে যাওয়ার সময় হিসাব করলে এ সময় আরো কম। এমন অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পরতে হচ্ছে রোগী, ডাক্তার উভয়কেই।

পায়ে ব্যাথা নিয়ে কাতরাতে থাকা ভুক্তভোগী ষাটোর্ধ রোগী শাহজাহান বলেন, ‘‘পায়ে ঘা হইছে। গরিব মানুষ তা ঘা নিয়াই কাজে যাইতাম। এখন ঘা আরো বড় হইছে। টাকা পয়সা নাই তাই চিকিৎসা নিতে এইখানে আইছি। কিন্তু দেড় ঘন্টা লাইনে দাড়ায়া থাইকাও টিকিট পাই নাই। পায়ের ব্যাথায় আর থাকতে না পাইরা দালালের কাছে ৫০ টাকা দিয়া টিকিট কিনছি। এখন আবার ডাক্তারের চেম্বারের সামনে আইসা সিরিয়ালে দাড়াইলাম। আল্লাহ ভালো জানে এইখানে আবার কতক্ষন দাড়ায়া থাকতে হয়।’’

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের সহকারী সোহেল রানা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ২০০ শয্যার লোকবল যা থাকার কথা তার থেকেও কম লোকবল দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ দুই জায়গাতেই এক অবস্থা। প্রথম অবস্থায় যে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তাদের অনেক মারা গেছে। আবার অনেকে অবসর গ্রহণ করেছে। আমরা চাইলেই সরকারি হাসপাতালে কাউকে নিয়োগ দিতে পারি না। এর অনেক নিয়ম কানুন আছে। যে কারণে ফাঁকা জায়গা পূরণ হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত লোকবল কমছে। কিন্তু আমাদের হাতে কিছুই করার নেই। বহির্বিভাগে আরো ৪জন মেডিকেল অফিসারের জন্য আবেদন করেছি। লোকবলের অভাবে অবশ্যই রোগীরা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সাথে হাসপাতালের ডাক্তার নার্স ও কর্মচারীরাও সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু আমরা কাউকে কিছু বলতে পারছি না। সবাই এসে আমাদের দোষ দেয়। কিন্তু আমাদের ক্ষমতাটাও তো দেখতে হবে।

এসময় তিনি আরো বলেন, ডাক্তাররা সকাল ৮ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। ১০ মিনিট বিশ্রামের সময় পান না। তারাও তো মানুষ, তাদেরও তো ক্লান্তি আসে। এরকম পরিশ্রম করেও যদি কালি শুনতে হয়, তাহলে আর বি করার থাকে। ৫০০ শয্যার জন্য যে লোকবল লাগবে তার সংখ্যাও আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোতালেব মিয়া নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, লোকবল সংকট তো রয়েছেই। এর জন্য শুধু রোগী নয়, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীদের ভোগান্তি হচ্ছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি এই লোকবল নিয়ে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের জন্য।

এসময় তিনি আরো বলেন, এছাড়া আগে যারা নিয়োগ প্রাপ্ত ছিল তাদের অনেকে মারা গেছেন এবং অনেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। এই যায়গাগুলো আর পূরণ না হওয়ায় লোকবল সংকট তৈরী হচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। তারা বলছেন নিয়োগ দিবেন।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্বাস্থ্য -এর সর্বশেষ