২৯ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮ , ১:৩৮ অপরাহ্ণ

UMo

নারায়ণগঞ্জে বাড়ছে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৫১ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার


ছবি প্রতিকী

ছবি প্রতিকী

নারায়ণগঞ্জের বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় একের পর এক রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। বিগত কয়েক বছরে অর্থলোভী চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসা ও বেসরকারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় অসংখ্য রোগীর মৃত্যু হলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়নি বললেই চলে। বরং প্রভাবশালীদের তদ্বিরে পার পেয়ে যাচ্ছে কসাই খ্যাত ওইসকল চিকিৎসকরা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ওইসকল অর্থলোভীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও সেই মামলা নিস্পত্তি হতে পার হয় বছরের পর বছর। ফলে বার বার অঘটন ঘটিয়ে পার পেয়ে যায় ওইসকল চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা কিংবা ভুল চিকিৎসায় কাউকে বরণ করতে হচ্ছে পঙ্গুত্ব আবার কাউকে প্রিয়জন হারিয়ে নিঃসঙ্গ হতে হচ্ছে। আবার চিকিৎসার নামে গলাকাটা টাকা হাতিয়ে নিয়ে রোগীর স্বজনদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে কতিপয় ডাক্তার ও বেসরকারী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর হার অনেকটা বেড়ে গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষ অনেকটা আতঙ্কে রয়েছে।

২৩ অক্টোবর দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় নতুন সেবা নামের ওই ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় ছোয়া মনি নামের এক শিশু মৃত্যুর অভিযোগে ওই ক্লিনিকটি ঘেরাও করেছিল মৃত শিশুর স্বজন ও এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাসে আন্দোলনকারীরা শান্ত হয়। এর আগে সোমবার ২৩ বিকেলে শিশুটি ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে বলে পরিবারের অভিযোগ। জানা যায়, সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ভবনাথপুর গ্রামের কামরুল ইসলাম ও সাবেক ইউপি সদস্য রুনা ইসলাম দম্পতির ছোট মেয়ে ছোয়া মনির জ্বর হলে ২২ অক্টোবর সোমবার বিকেলে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থিত নতুন সেবা নামের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। ওই সময়ে ডা. সাজ্জাদ হোসেন সুমন ওই শিশুর চিকিৎসা করান। ওই ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেন। এ অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার দুপুরে নিহতের আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে ওই ক্লিনিক ঘেরাও করে। খবর পেয়ে পুলিশ  ঘটনাস্থলে গিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাসে শান্ত হয় এলাকাবাসী।

৯ অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ডস্থ প্রো এ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তাহমিনা খান (৩৪) নামে ৭ মাসের অন্ত:স্বত্বা মায়ের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। রোগী মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ক্ষুদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভাঙচুর করলে হাসপাতাল ছেড়ে ডাক্তার ও কর্মকর্তারা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

ভুল চিকিৎসায় নিহত তাহমিনা খানের দেবর ইমাম কাজী জানান, তার ভাবী তাহমিনা খান দুপুর ১২টার দিকে অসুস্থ্যবোধ করলে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইবোর্ডস্থ প্রো এ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসেন। এ সময় ওই রোগীর সঙ্গে তার মা ও বড় ভাই ইব্রাহিম কাজী ও তাদের ম্যানেজার আবু তাহের মিয়া ছিলেন। পরে ডিউটি ডাক্তার নাজমুল ও ডাক্তার খান রিয়াজ মাহমুদ রোগীকে দেখতে চান। এসময় রোগী মহিলা ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাতে চান। পরে হাসপাতালের ইনডোর বিভাগ থেকে মহিলা ডাক্তার নিশাতকে নিয়ে আসলে ডাক্তার নিশাত তাহমিনা খানকে দেখে তার দেহে দুইটি ইনজেকশন পুশ করে। ইনজেকশন পুশ করার মাত্র ১০ মিনিট পরই রোগীর অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতি হতে থাকে। এক পর্যায়ে জরুরী বিভাগ থেকে রোগীকে আইসিইউ বিভাগে পাঠানো হয়। আইসিইউ বিভাগে নেয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তার মৃত্যু হয়েছে বলে রোগীর স্বজনদের জানায়।

এলাকাবাসী জানায়, ইতিপূর্বে এ হাসপাতালে টাকার জন্য এক মৃত রোগীকে আটকে রাখে। তাছাড়া এক প্রসূতির সিজার অপারেশন করার সময় নবজাতকের গাল কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে এ হাসপাতালের ডাক্তারের বিরুদ্ধে।

এদিকে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ডস্থ প্রো এ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই অন্ত:সত্বা মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় কোন মামলা হয়নি বলে জানা গেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতার মধ্যস্ততায় বিষয়টি মামলার দিকে আর গড়ায়নি। ওই রাতেই বিষয়টি মিমাংসা করে ফেলা হয়।

এদিকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলায় নিউ পপুলার জেনারেল নামে বেসরকারী হাসপাতালে মা ও তার গর্ভের ৫ মাসের সন্তান মৃত্যুর ঘটনায় ডাক্তার, নার্সসহ ৩জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। কর্তব্য কর্মে অবহেলা জনিত কারনে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ এনে ৩০ সেপ্টেম্বর রোববার সকালে মামলাটি দায়ের করেন নিহত শিল্পী বেগমের স্বামী আলমগীর হোসেন। নিহত শিল্পি বেগম (৩২) ও তার স্বামী আলমগীর হোসেন ফতুল্লার পূর্ব দেলপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

মামলায় আসামী করা হয়েছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের গাইনী বিভাগে কর্মরত ডাক্তার জেসিকা রিজভী তামান্না, ডাক্তার রাহাত আলী ও নার্স সুরমা বেগম। এদের মধ্যে সুরমা বেগমকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। অন্ত:সত্বা মায়ের মৃত্যুর পরে বিক্ষুদ্ধদের শান্ত রাখতে পুলিশ হাসপাতালের চার মালিক ডা. মজিবুর রহমান, মাসুম আহমেদ, আহম্মদ আলী খান, কামরুন্নাহার, মেডিকেল অফিসার ডা. জামিল আহমেদ ও নার্স সুরমা বেগম আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সুরমা বেগমকে গ্রেফতার দেখিয়ে চার মালিক ও এক ডাক্তারকে ছেড়ে দেয়।

নিহতের স্বামী আলমগীর হোসেন জানান, “তার স্ত্রী শিল্পি বেগম ৫ মাসের অন্তঃসত্বা ছিল। হঠাৎ অসুস্থবোধ করলে নিউ পপুলার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে ডা. জেসিকা রিজভী তামান্না পরীক্ষা করে জানান ‘গর্ভে বাচ্চা নরমাল আছে তবে পানি ভাঙছে। কয়েকদিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হবে। পরে তার পরামর্শে বৃহস্পতিবার বিকেলে আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করি। শুক্রবার দুপুর থেকেই হাসপাতালের লোকজন বলছে অপারেশন করতে হবে। তখন আমি জানতে চাই ‘গর্ভের সন্তান নরমাল থাকলে অপারেশন কেন।’ তারা বললো দ্রুত রক্ত নিয়ে আসেন। আমি রক্ত আনতে যাই। এরমধ্যে আমার স্ত্রীকে কোনো অনুমতি ছাড়াই অপারেশন করে সন্তান বের করে।” আলমগীর অভিযোগ করেন, ডাক্তারের বলে দেয়া মতো রক্ত নিয়ে এসে দেখি শিশুটির গলাকাটা এবং স্ত্রী নিথর দেহ পড়ে আছে। তখন জানতে চাইলে নার্স ও ডাক্তাররা জানায় ‘আপনার স্ত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে।’ তখন তারাই এ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেয়। এতে আমার সন্দেহ হয়। এরপর তাদের লোকজনই জানায় সে মারা গেছে। আমি এর বিচার চাই।

৬ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের ডনচেম্বারের মেডিস্টার জেনারেল হসপিটালের ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় আলোর মুখ দেখতে পারেনি নবজাতক।

মো: সুমন জানান, আমাদের সংসারে অনেকদিন ধরেই কোনো নতুন অতিথি আসছিল না। অবশেষে আল্লাহর রহমতে আমার স্ত্রী সুমি (২৮) গর্ভবতী হয়। ফলে বহুদিন পরে সন্তানের বাবা হওয়ার খবরে খুবই আনন্দে ছিলাম। মেডিস্টার জেনারেল হসপিটালের ডাক্তার জাকিয়া পারভীন লিপি নিয়মিত তত্ত্বাবধানে ছিল আমার স্ত্রী সুমি। শুক্রবার সকাল থেকেই স্ত্রী সুমি সন্তানের তেমন সাড়া পাচ্ছিলেন না। তাই দুপুরের দিকে আমাদের নিয়মিত ডাক্তার জাকিয়া পারভীন লিপির কাছে আসি। কিন্তু সে হাসপাতালে ছিল না। আমরা অনেক্ষণ অপেক্ষার পরেও হাসপাতালের অন্যান্য ডাক্তাররাও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অবশেষে জাকিয়া পারভীন লিপির ফোনের মাধ্যমে দুই নার্সকে ইনজেকশন দেয়ার নির্দেশ দেয়। ওই ইনজেকশন দেয়ার পরপরই বাচ্চা একেবারেই সাড়া দেয়া বন্ধ করে দেয়। তারপরেও হাসপাতালের নার্সরা বলছিল বাচ্চা ঠিক আছে, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের সন্দেহ হওয়ায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করায়। আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে বাচ্চার সবকিছুই নো রেসপন্স আসে। পরে রাতে হাসপাতালে ডেলিভারী হওয়ার পরে নবজাতকটিকে মৃত অবস্থায় বের করে আনা হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘শুধুমাত্র হাসপাতালের ডাক্তারদের ভুল ইনজেকশন আর অবহেলার কারণেই আমার সন্তান আলোর মুখ দেখতে পারেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ডাক্তারদের বিরুদ্ধে সদর থানায় একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে।’

গত ৮ মার্চ দুপুরে শহরের মেডিস্টার জেনারেল হাসপাতালে ঝুমা আকার (২৪) নামের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের ঘটনা ঘটায় স্বজনরা। তাদের অভিযোগ ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজন গাইনি ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করে। বিক্ষুব্দ রোগীর স্বজনরা ওইসময় হাসপাতালটিতে ব্যপক ভাঙচুর চালায়। রোগীর দেবর শাহেদ জানান, ‘ বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টায় সন্তান প্রসবের জন্য রোগীকে অস্ত্রোপচারের পর জরায়ুর সমস্যার কারণে তাকে পর পর তিনবার অস্ত্রোপচার কার হয়। ওই সময় রোগী ঝুমার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পরে ৪ ব্যাগ রক্ত আনিয়ে তার চিকিৎসা করার ভান করে। আমরা বার বার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলেছি যদি আপনারা না পারেন রোগীকে ছেড়ে দেন আমরা ঢাকা নিয়ে যাব। কিন্তু তার তারপরও হাসপাতালে রেখে ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে মেরে ফেলে। ঘটনাস্থলে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পরিদর্শন (অপারেশন ) মো. জয়নাল জানান, ‘পরিবারের অভিযোগ ঝুমাকে হত্যা করা হয়েছে। ওই অভিযোগের ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেয়া হচ্ছে।

এদিকে ঘটনার পর ডাক্তার অমল কুমার সহ ৫ জনকে আটক করা হলেও সন্ধ্যায় প্রভাবশালীদের তদ্বিরে ও মোটা অংকের লেনদেনে শেষ পর্যন্ত রোগীর স্বজনরা বিনা ময়নাতদন্তেই লাশ দাফন করতে বাধ্য হয়। তারা আপোষনামা দেয়ায় ওইদিন রাতেই থানা থেকে মুক্ত হয়ে যায় ডাক্তার অমল কুমারসহ আটককৃত ৫ জন।

এর আগে মেডিপ্লাস নামের আরেকটি হাসপাতালে গত বছর ভুল চিকিৎসার কারণে আরো কয়েকটি রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আর এসব কারণে রোগীর স্বজনেরা বিভিন্ন সময় বলে আসছে, এই হাসপাতাল হচ্ছে রোগী মারার হাসপাতাল। এই হাসপাতালে রোগী আসে জীবিত কিন্তু বের হয় মৃত হয়ে শুধুমাত্র তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে। গত বছরের ১ নভেম্বর শহরের কালিরবাজারে মেডিপ্লাস হাসপাতালেভুল চিকিৎসায় এক মহিলার মৃত্যুর অভিযোগে নিহতদের স্বজনরা প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পুলিশ নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। নিহতের নাম পারভীন আক্তার (৪৭)। নিহত পরিবার জানায়, মেডিপ্লাস হাসপাতালে পারভীন আক্তারের জরায়ু অপারেশন করেন ডাক্তার শান্তা ইসলাম। এসময় ভুল চিকিৎসায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পরে মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোপন রেখে পারভীনকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য শহরের খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠায়। খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা পারভীনকে মৃত ঘোষণা করেন। খানপুর হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক জান্নাতুল নাইম জানান, পারভীনকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। জানতে পেরেছি পারভীনের জরায়ুর অপারেশন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। মরদেহ তার পরিবারের লোকজন বাড়িতে নিয়ে গেছেন।

এর আগে এই একই মেডিপ্লাস মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই হাসপাতালের স্ত্রী ও গাইনী চিকিৎসক উম্মে সালমা চৌধুরী শান্তার অবেহলায় এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছে মৃতের আত্মীয়। স্বজনেরা জানায়, ‘অন্তঃস্বত্তা গৃহবধূ লিমা আক্তারকে (২৮) নগরীর কালিরবাজারে অবস্থিত মেডিপ্লাসে ডা. সালমা চৌধুরী শান্তার তত্ত্বাবধায়নে ২৯ মে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকের অবহেলার কারণে ৩০ মে দুপুর ১ টার দিকে সে মারা যায়। এ ঘটনায় রোগীর আত্মীয় স্বজনরা হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। খবর পেয়ে সদর মডেল থানা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে ক্লিনিকটির চিকিৎসক, নার্স ও ম্যানেজার।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর এলাকার আমেনা জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর জননী লিপি আক্তারের সিজার অপারেশনের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে ফেললে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। এতে পেটে সেলাইয়ের স্থানে ইনেফেকশন হয়ে গেলে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নিয়ে নারাজ হয়। এতে রোগীর স্বজনোর হাসপাতালে বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগীর স্বজনরা জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর আমেনা হাসপাতালে লিপি আক্তারের সিজার হয়। এরপর থেকে তার সিজারের স্থানে ইনফেকশন হয়ে রোগীর সেলাই খুলে যায়। এতে রোগীর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসক বারবার নানা কথা বলে আমাদেরকে বিদায় করে দেয়। সেলাই খোলা অবস্থায় ৫ দিন হাসপাতালে পড়ে থেকে ব্যাথায় যন্ত্রণা পোহাতে থাকে। পরে অবস্থা খারাপ দেখে ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে পেট থেকে গজ বের হয়ে আসে। এখন তার অবস্থা খুবই খারপ। সে বাঁচবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।

এছাড়া শহরের অন্যতম ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে পরিচিতি পপুলার ডায়াগনস্টির সেন্টারে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষার নামে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে করে হাসাপাতালের আসা রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন সময় এই প্রতিষ্ঠানকে কসাইখানা হিসেবে আখ্যায়িত করছে। তবে ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিটি স্ক্যান বিভাগে ইনজেকশন পুশ করার পর শাহাবুদ্দিন নামের একজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অশোভন আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এতে স্বজনেরা জানায়, ‘সাড়ে ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি। এরপর ৫তলায় উঠে দেখি বাবাকে পরীক্ষা ছাড়াই ইনজেকশন করা হয়। এর এক পর্যায়ে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হলে পরবর্তীতে তিনি মারা যান।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা বেসরকারী হাসপাতাল ক্লিনিকগুলো রোগী মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অত্যাধিক অর্থ উপার্জনের লোভ। যে কারণে রোগীর অবস্থা গুরুত্বর হলেও তারা অনেক সময়েই হাসপাতাল থেকে রোগীদের ছাড়তে চান না। কোন রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও নারায়ণগঞ্জের বেশীরভাগ বেসরকারী হাসপাতালে নেই আইসিইউ। এছাড়া অনেক হাসপাতালেই নেই সার্বক্ষণিক ডিউটি ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স। অপারেশন থিয়েটারও আধুনিক নয় বেশীরভাগ বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকের। বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ছুটতে হয় বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলোতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসা সেবা বলা হলেও এটা কোন সেবা নয়। এটা আসলে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর সেই ব্যবসায় টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে জনগনের পকেট থেকে।  আর সেই ব্যবাসার বলি হতে হচ্ছে ভুল চিকিৎসার কারণে অসংখ্য মানুষকে। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাপটে অন্যায় করেও খালাস পেয়ে যাচ্ছে এসব কষাই চিকিৎসকরা। আর প্রতিষ্ঠানগুলো রমরমা গলাকাটা ব্যবসা করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে জেলা সিভিল সার্জন ডা. এহসানুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

স্বাস্থ্য -এর সর্বশেষ