সেলিনা হাসপাতালে প্রসূতির মৃত্যু, ভয় দেখিয়ে রোগীর সাক্ষর

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৯ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ রবিবার

সেলিনা হাসপাতালে প্রসূতির মৃত্যু, ভয় দেখিয়ে রোগীর সাক্ষর

নারায়ণগঞ্জ শহরের ডনচেম্বারস্থ সেলিনা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহত ওই প্রসূতির নাম খাদিজা (২০)। সে পটুয়াখালীর বলইকাটি এলাকার মৃত আবুল কাশেমের মেয়ে এবং ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী।

স্বজনদের অভিযোগ, ২১ সেপ্টেম্বর শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় সিজারিয়ানে ওই রোগীর ডেলিভারির পর ইনজেকশন পোষ করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। এরপর রোগীর খিচুনী উঠলেও তাকে অন্য কোথাও রেফার করেননি ডাক্তার। রাতের কোন একসময় রোগীর মৃত্যু ঘটলে ভোর রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণের নির্দেশ দেন ওই গাইনী ডাক্তার।

আর গুরুতর এই অভিযোগটি উঠেছে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের গাইনী কনসালটেন্ট ডা. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। এর পূর্বেও একই ঘটনার জন্য সমালোচিত হয়েছেন তিনি। এদিকে রোগী মৃত্যুর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে রোগীর স্বজনদের ভয় দেখিয়ে “না দাবী” পত্রে জোর করে সই করিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলীনূর শরিফের বিরুদ্ধে।

নিহত খাদিজার স্বজনেরা জানান, খাদিজার প্রসব বেদনা উঠলে শনিবার দুপুরে তাকে খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বামী দেলোয়ার। এসময় নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের গাইনী কনসালটেন্ট ডা. জাহাঙ্গীর আলম ভালো চিকিৎসার কথা বলে রোগীর স্বজনদের খানপুর ডনচেম্বারস্থ সেলিনা মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন।

এদিন রাত পৌনে ১১টায় রোগীকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাত সাড়ে ১১টায় অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান ডা. জাহাঙ্গীর আলম। এসময় তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন ৩০০ শয্যার আরেক সহকারী চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুম। সিজারে সন্তান প্রসবের পর রোগীকে একটি ব্যথানাশক ইনজেকশন পোষ করেন ডা. জাহাঙ্গীর। এর কিছুক্ষণ পর রোগীর খিচুনী উঠলে ডাক্তারকে জানায় রোগীর স্বজনেরা।

তবে বিষয়টি গুরুতর নয় দাবী করে রোগীকে হাসপাতালে রাখার পরামর্শ দেন ডা. জাহাঙ্গীর। তবে ভোর রাতে রোগীর কোন সাড়া না মেলায় পুনরায় বিষয়টি কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জানানো হলে তাৎক্ষণিক রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণের নির্দেশ দেন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর রোগীকে মৃত বলে ঘোষনা করে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।

নিহত খাদিজার স্বামী দেলোয়ার জানান, রোগী মৃত্যুর খবরে আমরা হাসপাতালে আসলে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী নূর সহ কয়েকজন জোর করে আমাদের একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে নেন। ভয়ে আমরা সেখান থেকে চলে আসি।

সেলিনা মেমোরিয়াল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলীনূর শরীফ গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, শনিবার রাতে সিজারে সন্তান প্রসবের পর রোগীর অবস্থা ভালোই ছিল। তবে ভোর রাতে রোগী হঠাৎ বুকে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করলে ডাক্তারের নির্দেশে আমরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করলে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। তবে এ বিষয়ে আমাদের হাসপাতালের কারো কোন সংশ্লিষ্টতা নেই এই মর্মে রোগীর স্বজনেরা একটি লিখিত “না দাবী পত্র” দিয়েছেন।

এবিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায় নি।

এদিকে সেলিনা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। একই হাসপাতালে ২০১৫ সালের ১০ মে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতাল থেকে সাজেদা বেগম (৫০) নামের এক রোগীকে জোর করে একটি ক্লিনিকে নেওয়ার পর ভুল চিকিৎসার কারণে মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করা হয় ৩০০ শয্যার গাইনী কনসালটেন্ট ডা. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে সেলিম রেজা বাদী হয়ে গাইনী কনসালটেন্ট ডা. জাহাঙ্গীর আলামসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করলেও জেলা বিএমএ’র এক শীর্ষ নেতার তদবিরে সেই সময়ের মতো রক্ষা পান তিনি।

অভিযোগ রয়েছে ৩০০ শয্যার বর্হিবিভাগ থেকে আসা রোগীদেরকে নানা ভয় ভীতি দেখিয়ে এবং হাসপাতালে চিকিৎসা না থাকা সহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তার নির্দিষ্ট বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রেরণ করে আসছেন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। আবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লিনিকের ম্যানেজারের ডেকে এনে গাইনী সমস্যাজনিত রোগীকে বাগিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা নিরিক্ষা করার ব্যবস্থা থাকার পরেও কমিশন বাণিজ্যের লক্ষ্যে রোগীদের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রেরণ করে থাকেন তিনি। এছাড়াও ডিউটি চলাকালীন অবস্থায় ডাঃ মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে বিভিন্ন ক্লিনিকে দেখা যায়।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও