নারায়ণগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় ঝরছে প্রাণ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০২ পিএম, ১ অক্টোবর ২০১৯ মঙ্গলবার

নারায়ণগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় ঝরছে প্রাণ

সৃষ্টিকর্তার পর জীবন বাঁচানো ও সুস্থ্য করে তোলার ব্যাপারে মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল হচ্ছে চিকিৎসক। যেকারণে প্রিয়জনদের সুস্থ্য করে তুলতে স্বজনরা আর্থিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে চিকিৎসকদের উপর ভরসা রাখে। আর চিকিৎসকরাও এই মহান পেশায় রোগীদের সুস্থ্য করে তুলতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যায়। তবে এর মধ্যে চিকিৎসকদের খামখেয়ালিপনা, অতিরিক্ত টাকা উপার্জনের লোভে তড়িঘড়ি করে নামে মাত্র চিকিৎসা সেবা দেয়া, দায়িত্বহীনতা সহ নানা কারণে ভুল চিকিৎসার চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেই ভুল চিকিৎসায় নারায়ণগঞ্জে অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। আর স্বজনরা আহাজারিতে বুক ভাসাচ্ছে।

জানাগেছে, চিকিৎসা পেশাটি বর্তমানে বেশ লাভবান একটি পেশা। চিকিৎসা পেশায় সম্মানের পাশাপাশি আর্থিক দিক দিয়েও রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ রয়েছে। তবে সেজন্য কাজের পরিধি একটু বৃদ্ধি করতে হয়। আর একজন চিকিৎসকের কর্মদক্ষতার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করলে ভুল ত্রুটি হওয়ার সম্ভবনাও বেড়ে যায়। এতে করে প্রায়শই ভুল চিকিৎসার রোগীর প্রাণ ঝরছে।

সবশেষ নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় ‘কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল’ নামে একটি বেসরকারী ক্লিনিকে মিলি বেগম (২৮) নামে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ ডাক্তারে ভুল চিকিৎসা ও ক্লিনিকের অবহেলায় মিলি বেগমের মৃত্যু ঘটে। ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার বিকেলের ওই ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ স্বজনেরা হাসপাতালে ভাঙচুর ও কর্মকর্তাদের মারধর করে।

মিলি বেগম ফতুল্লা থানাধীন শিবুমার্কেট পশ্চিম লামাপাড়া এলাকার মো. শাহ আলমের স্ত্রী। শাহ আলম বলেন, রোববার রাতে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা হলে মিলিকে ডাক্তার জাহের আলীর পরামর্শ অনুযায়ী রাত পৌনে ১১টায় কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করি। রাতে ওষুধ দেওয়ার পরও ব্যাথা কমছিল না যখন সকালে আমরা ঢাকায় নেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলি। কিন্তু তারা আমাদের কোন কথা না শুনে বলে এখনই কমে যাবে ৩ থেকে ৪ বার বিভিন্ন ওষুধ আনতে পাঠায়। ব্যাথা না কমায় ৩টার দিকে ওষুধ নিয়ে আসার আগেই আমার স্ত্রীকে হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ফেলে। ওই সময়ে জানানো হয় দ্রুত হাসপাতালের বিল পরিশোধ করেন আপনার স্ত্রীর অবস্থা খারাপ ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। বিল পরিশোধ করার পর হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলে আমার স্ত্রী মারা গেছে। তিনি বলেন, ওই ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা ও টাকার জন্য হাসপাতালের লোকজন আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছে।

হাসপাতালের সহকারি জেনারেল ম্যানেজার আবু বক্কর বলেন, ডা. জাহের আলীর পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে স্যালাইন সহ অন্যান্য ওষুধ দেওয়া হয়। ধারণা করা যাচ্ছে ব্রেন স্ট্রোক করার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।

৯ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁয়ের ভুল চিকিৎসায় আমান্তিকা নামের রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় এক ক্লিনিক ভাংচুর করেছে রোগীর বিক্ষুব্ধ স্বজনরা। দুপুরে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় সোনারগাঁও জেনারেল হাসপাতাল নামের একটি ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে।

এসময় বিক্ষুদ্ধ স্বজনরা ক্লিনিকের পরীক্ষাগার, মেশিনপত্র, গ্লাস, দরজা জানালা সহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর করে। ঘটনার পর ওই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে সোনারগাঁ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুদ্ধ স্বজনদের বিচারের আশ^াসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে।

জানা যায়, উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের বড় সাদিপুর গ্রামের পিন্টু মিয়ার স্ত্রী আমান্তিকা গর্ভবতী হলে সিজার নিয়মিত চিকিৎসার জন্য শুক্রবার বিকেলে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকার সোনারগাঁ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. নূরজাহান বেগম ওইদিন রোগীকে সিজার করার পরামর্শ দেন। তিনি নিজেই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তার সিজার করান। এসময় আমান্তিকার একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।

তাড়াহুড়ো করে সিজারের পর ওই রোগীর পেটে গজ কাপড় রেখেই ডা. নূরজাহান কাটা স্থান সেলাই করে দেন। সিজারের পর রোগীর অবরত বমি ও পেটে অস্বস্থি তৈরি হয়ে পেট ফুলে যায়। পুনরায় ওই ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসলে সে নারায়ণগঞ্জ কেয়ার হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। ডাক্তার নূরজাহান কেয়ার হাসপাতালে গিয়ে পুনরায় ওই রোগীর সিজার করিয়ে জরায়ু কেটে ফেলেন। রোগীর অবস্থার অবনতি হলে কেয়ার হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকার গেন্ডারিয়া আজগর আলী হাসপাতালে প্রেরণ করা হলে সোমবার ভোরে সে মারা যায়।

নিহতের বাবা সোহেল মিয়া জানান, শুক্রবার আমার মেয়েকে সোনারগাঁ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসার পর ডাক্তার সিজার করার পরামর্শ দেন। জরুরি সিজার না করলে মা ও পেটের সন্তান মারা যাবে বলে জানিয়েছেন। ডাক্তারের কথা অনুযায়ী আমরা সিজারের সিদ্ধান্ত নেই। ওইদিন ডাক্তার নূরজাহান আরো ৪টি সিজার করেছেন। পাশাপাশি রোগীর দীর্ঘ লাইন। ডাক্তার তাড়াহুড়া করে সিজারের পর পেটে গজ কাপড় রেখে সেলাই করায় আমার মেয়ের মৃত্যু হয়। আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীকে গ্রেফতার করে বিচার দাবী করি।

সোনারগাঁ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল ভাংচুর হয়েছে। বিক্ষুদ্ধ স্বজনদের পুলিশ বিচারের আশ^াস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

২৯ জুন বন্দরে ভুল চিকিৎসা ও ক্লিনিকের অব্যবস্থাপনার কারণে নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শনিবার সন্ধ্যায় বন্দর বাজারস্থ সূর্যমুখী ক্লিনিকে এ ঘটনাটি ঘটে। এ ব্যাপারে নবজাতক শিশুটির ফুপু ফাতেমা বেগম বলেন, ‘বন্দর উপজেলার কুশিয়ারা এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে আমার ভাই রুবেল মিয়ার স্ত্রী তাসলিমা বেগম গর্ভবতীর সময়ে বন্দর সূর্যমুখি ক্লিনিকের ডা. জিয়াসমিন সুলতানার তত্ত্ববধানে থাকে। পরে গত শনিবার সন্ধ্যায় তাসলিমা বেগমের প্রসব বেদনা শুরু হলে তাকে দ্রুত সিজার করার জন্য অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। সেখানে ডা. জিয়াসমিন সুলতানার ভুল চিকিৎসার কারণে অক্সিজেনের অভাবে শিশুটি নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে মারা যায়।’

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ডা. জিয়াসমিন সুলতানা সাংবাদিকদের জানান, আমি তাদেরকে আগেই বলেছি বাচ্চার অবস্থা ভালো না। গৃহবধূর স্বামী কাছ থেকে বন্ড রেখেই আমরা সিজার করেছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসা সেবাকে বর্তমানে সবাই ব্যবসা হিসেবে দেখছে। যেকারণে এই মহান পেশায় ভুল চিকিৎসায় অহরহ প্রাণ ঝরছে। অনদিকে মনিটরিয়ের অভাবে চিকিৎসকরাও এসব অপকর্ম করে পার পেয়ে যাচ্ছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিক সহ সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এসব সমস্য অচিরেই নিরসন করা সম্ভব।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও