ভুল চিকিৎসায় ‘মহামারিতে’ আতঙ্কিত নারায়ণগঞ্জ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২১ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০১৯ রবিবার

ভুল চিকিৎসায় ‘মহামারিতে’ আতঙ্কিত নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় একের পর এক ঝরছে প্রাণ। চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় রোগীদের জীবন কেড়ে নিলেও এর কোন সুরাহা হচ্ছেনা। মোটা অংকের টাকা ও প্রভাবশালীদের দিয়ে ম্যানেজ করে এসব ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। একারণে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর হার ক্রমশ বেড়ে চলেছে।

জরিপে দেখা গেছে, প্রত্যেক সপ্তাহে গড়ে ২ থেকে ১টি ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আর প্রত্যেক মাসে গড়ে প্রায় ৩-৪টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এসব ঘটনার কোনটিরই ন্যায় বিচার পাচ্ছেনা রোগীর স্বজনরা। কারণ চিকিৎসকরা বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে থাকে বলে এসব অপকর্ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।

সদর উপজেলার ফতুল্লায় ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ২০ অক্টোবর দুপুরে ফতুল্লার মোস্তাফিজ সেন্টারে অবস্থিত ফতুল্লা জেনারেল হাসপাতালে ওই ঘটনা ঘটে। ওই শিশুর বাবা মাসুম মিয়া বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।

মা পিংকি আক্তার জানান, বুধবার বিকেল ৪টায় জেনারেল হাসপাতালে তার মেয়ে পিংকিংকে ভর্তি করানো হয়। একই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। এ ঘটনার পর থেকে নবজাতক শিশুর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শনিবার রাতে অবস্থার অবনতি ঘটলে ক্লিনিকটির চিকিৎসকেরা জোর করে অন্যত্র চিকিৎসা নিতে রোগীকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাত গভীর হওয়ায় সম্ভব হয়নি। রোববার ভোরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে নেয়ার পথে নবজাতকের মৃত্যু হয়।

১৯ অক্টোবর ভুল চিকিৎসায় জরায়ুর অপারেশন করতে গিয়ে রোগীর মলদ্বার কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে শহরের কালিরবাজার এলাকাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কের পাশে অবস্থিত মেডিপ্লাস জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট গাইনীকোলজিস্ট ও সার্জন ডা. কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে। ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে হাসপাতালের বেডে রোগী কাতরালেও অপারেশনের পর ডাক্তার রোগীর কোনো খোঁজ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন রোগী ডালিয়া বেগমের (৪০) স্বজনেরা।

রোগীর মা নূরজাত বেগম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, কিছুদিন আগে জরায়ুর সমস্যা নিয়ে ডা. কামরুন নাহারের কাছে আসি। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তিনি বলেন যে রোগীর জরায়ুতে সমস্যা আছে অপারেশন করাতে হবে। ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে অপারেশন করতে রাজি হন তিনি। শনিবার সকাল ৯ টায় আমাদেরকে হাসপাতালে আসতে বললে আমরা যথাসময়ে চলে আসি। পরে দেড়টার দিকে অপারেশন শুরু হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা চলে গেলেও অপারেশন শেষ হয় না। রোগীর কি অবস্থা সেই বিষয়েও কিছু বলেন না। বার বার প্রেসক্রিপশন দিয়ে বিভিন্ন ওষুধ আনতে বলেন। কয়েকবার ওষুধ আনার পর ফার্মেসির লোকেরা বলে যে আপনারাতো জরায়ুর অপারেশন করতে এসেছেন এই ওষুধতো পায়ুপথের জন্য। এগুলো দিয়ে কি করবেন? তখন আমাদের সন্দেহ হলে আমরা চিৎকার শুরু করি। এরপর তাঁরা ভুল চিকিৎসার কথা স্বীকার করেন। পরে অপর এক ডাক্তারকে এনে অপারেশন করান।

১৭ অক্টোবর সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় পুরাতন সেবা জেনারেল হাসপাতাল নামে এ ক্লিনিকে চিকিৎসকের অবহেলায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের দমদমা গ্রামের রুহুল আমিনের স্ত্রী মালেকা আক্তার পিত্তথলিতে পাথর অপসারণের জন্য বৃহস্পতিবার সকালে মোগরাপাড়া চৌরাস্তার রহমত ম্যানসনের সেবা জেনারেল হাসপাতাল নামের ক্লিনিকে ভর্তি হন। সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র সার্জারি কনসাল্ট্যান্ট রিয়াজ মোর্শেদের তত্ত্বাবধানে ভর্তি হওয়ার পর বিকেল তিনটার দিকে ওই রোগীর অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। রোগীর স্বজনরা রোগীর অবস্থা জানতে চাইলে অপসারিত পিত্তথলী পাথর এনে দেখিয়ে রোগী ভাল আছেন বলে জানান।

এক পর্যায়ে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ওই ডাক্তার রোগীকে আইসিওতে রাখতে হবে বলে জানান স্বজনদের। ডাক্তারের কথা শুনে আতংকিত হয়ে ওই রোগীর ফুফু সাবিকা পারভীন জোরপূর্বক অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে রোগীর মুখ দিয়ে ফনা বের হচ্ছে দেখতে পান। পরে রোগীকে ইকরাম নামের এক ডাক্তারের মাধ্যমে সিদ্ধিরগঞ্জ প্রি অ্যাকটিভ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করলে সঙ্গে থাকা সেবা জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার ইকরাম ওই রোগীকে রেখে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর রোগীর স্বজনরা রাতে উত্তেজিত হয়ে হাসপাতালে গিয়ে ভাংচুরের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

৩০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় কেয়ার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিলি বেগম (২৮) নামে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। ডাক্তারে ভুল চিকিৎসা ও ক্লিনিকের অবহেলায় ওই গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে অভিযোগে স্বজনরা ক্লিনিকটি ভাঙচুর ও কর্মকর্তাদের মারধর করা হয়েছে।

শাহ আলম বলেন, রোববার রাতে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা হলে মিলিকে ডাক্তার জাহের আলীর পরামর্শ অনুযায়ী রাত পৌনে ১১টায় কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করি। রাতে ওষুধ দেওয়ার পরও ব্যাথা কমছিল না যখন সকালে আমরা ঢাকায় নেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলি। কিন্তু তারা আমাদের কোন কথা না শুনে বলে এখনই কমে যাবে ৩ থেকে ৪ বার বিভিন্ন ওষুধ আনতে পাঠায়। ব্যাথা না কমায় ৩টার দিকে আবারও ডাক্তার ডাকতে গেলে হাসপাতালের লোকজন আবারও ওষুধ আনতে পাঠায়। ওষুধ নিয়ে আসার আগেই আমার স্ত্রীকে হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ফেলে। আর বলে দ্রুত হাসপাতালের বিল পরিশোধ করেন আপনার স্ত্রীর অবস্থা খারাপ ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। বিল পরিশোধ করার পর হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলে আমার স্ত্রী মারা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের মত একটি ছোট জেলায় প্রত্যেক মাসে এভাবেই ভুল চিকিৎসায় রোগীরা মারা যাচ্ছে। সঠিক মনিটরিং ও ন্যায় বিচারের অভাবে দিনে দিনে এর প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। আর চিকিৎসকরাও ক্রমশ ছাড় পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর মধ্যে ভুল চিকিৎসার ঘটনা হাতে গুণা কয়েকটি প্রকাশ্যে আসলেও অনেক ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার আগেই মোট অংকের টাকা ও প্রবভাশালীদের দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলে।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও