খানপুরের লোপাটকারীরা ছিল ওপেন সিক্রেট

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০১ পিএম, ২ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার

খানপুরের লোপাটকারীরা ছিল ওপেন সিক্রেট

নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে অবস্থিত ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে (বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য কোভিড ডেডিকেটেট হাসপাতাল) ঠিকাদার চক্রের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘ ৩ দশক ধরেই রয়েছে। অত্র হাসপাতালে ঠিকাদার চক্রের নানাবিধ টেন্ডারে চুরি ও লোপাটের ঘটনা ছিল অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। ঠিকাদারীর মাধ্যমে তারা সকলেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গিয়েছিল। গত ৩ দশক ধরেই ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চলছিল তাদের রামরাজত্ব। সব সরকারের আমলেই তারা ছিল ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত। যে কারণে ৩০০ শয্যা হাসপাতালে খানপুরের এই চোর ও লোপাটকারী চক্র ছিল ধরা ছোয়ার বাইরে। তারা এতটাই প্রভাবশালী বনে গিয়েছিল যে তারা হাসপাতালের সুপার কিংবা ব্যবস্থাপনা কমিটিকেও তোয়াক্কা করতো না। সর্বশেষ হাসপাতালটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানের বক্তব্যেও এ বিষয়গুলো পরিস্ফুট হয়েছে। যদিও চোর ও লোপাটকারী চক্রের নাম এখনো প্রকাশ না করে অপেক্ষায় থাকতে বলেছেন সেলিম ওসমান। তবে তার বক্তব্যেও ওপেন সিক্রেটের মতো নগরবাসীরও বুঝতে বাকি নেই ওই ঠিকাদার চক্র কারা।

জানা গেছে, ঠিকাদারদের চক্রটি প্রায় ৩ দশক ধরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল যে দুষ্টচক্রে হাসপাতালের সুপারের সহকারী সিদ্দিকুর রহমানও সম্পৃক্ত ছিল। শুধু ঠিকাদারীই নয় করোনার প্রার্দুভাব ছড়ানোর পূর্বে গোটা হাসপাতালর চিকিৎসা সেবার সিস্টেমেরও নিয়ন্ত্রন করতো এই দুষ্টচক্রটি। তাদের মালিকানাধীন একাধিক বেসরকারী হাসপাতাল ও একাধিক ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে রোগীদের অপারেশন ও পরীক্ষা করানোর জন্য পাঠাতে চিকিৎসকদের বাধ্য করতো ওই ঠিকাদার চক্রটি। যা ছিল অনেকটাই ওপেন সিক্রেটের মতোই। ঠিকাদার চক্রের মধ্যে একজন এমপি সেলিম ওসমানের নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবসায়িক সংগঠনের সহসভাপতি পদে আসীন ছিলেন বর্তমানে পরিচালক পদে রয়েছেন। ওই ঠিকাদার চক্রের অপর সদস্য একটি ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। একজন একটি স্কুলের পরিচালনা কমিটির সদস্য যে স্কুলের উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন সেলিম ওসমান। বিগত দিনে এমপি সেলিম ওসমানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওই ঠিকাদার চক্রের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে।

২১ জুন বিকেল ৪টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল এর জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির মাসিক সভা শেষে সেলিম ওসমান সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের এই হাসপাতালের নামে অনেক বদনাম রয়ে গেছে। সেটি নিয়েই আমরা আজকে সভায় দীর্ঘ আলোচনা করে দেখেছি দীর্ঘ দিন ধরে এই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পিএ তার কোন বদলী নেই। সে দীর্ঘদিন রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে তার কোন বদলী নেই। সেই টেন্ডার পরিচালনা করে সেই টেন্ডার দেয়। বিভিন্ন এন্টার প্রাইজের নাম দিয়ে খানপুর এলাকার একই ব্যক্তি এই টেন্ডার নিয়ে থাকে। সময় কাল ক্ষেপন করে একটি ইংরেজি পত্রিকায় টেন্ডারের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। যা সাধারণ মানুষ জানতে পারেনা টেন্ডারেও অংশ নিতে পারেনা। হাসপাতালে অনেক সমস্যা ছিল। রোগীদের বেডে পাখা ছিল না। বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা ছিলনা। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যক্তিগত ভাবে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সহযোগীতা নিয়ে সেই সকল সমস্যা গুলোর সমাধান করেছি। নিরাপত্তার স্বার্থে সিটি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করে দিয়েছিলাম। যে সকল জায়গা দিয়ে হাসপাতালের জিনিসপত্র পাচার হয় দেখা গেল কয়েক মাসের মধ্যে সেই সমস্ত জায়গাগুলোর সিসি ক্যামেরা নষ্ট করা হয়। ওই ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে আমি এবং আমার কমিটি মোবাইল ফোনে হাসপাতালের অবস্থা দেখতে পারতাম। কিন্তু একটা দুষ্টু চক্র এ কাজে লিপ্ত রয়েছে। তারা কিছুতেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না। আমাদের মনে হয় আমাদের হাসপাতালের একটা অডিট করা প্রয়োজন। হাসপাতালের বর্তমান সুপার ডাক্তার গৌতম সহ উনার আগে যারা ছিলেন তাদের সবারই একই কথা এমন সিস্টেম আগে থেকেই চলে আসছিলো। যার খেসারত আমরা এখন দিচ্ছি। যারা পাপী তারা দেশের এই দুর্যোগের সময়ও ক্ষ্যান্ত হচ্ছেন না।

তিনি আরো বলেন, এপ্রিল মাসে সরকার থেকে একটি বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। যে সরকার থেকে করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার নার্সদের থাকা খাওয়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। সরকার থেকে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি তানভির আহম্মেদ টিটুর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে ডাক্তারদের জন্য এবং আমি ব্যক্তিগত অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী স্কুলে ডাক্তার নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের জন্য অস্থায়ী আবাসন সহ তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে যে ব্যবস্থা নিয়েছি সেটির জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে আমরা ওই ৩০ লাখ টাকার বিপরীতে আমাদের হাসপাতালে আনুসাঙ্গিত বিয়ষ গুলোর চাহিদাপত্র দিবো। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাক্তারদেরকে সম্মুখ যোদ্ধা বলা হচ্ছে। আর সম্মুখ যোদ্ধাদের পেছন থেকে যাদের সহযোগীতা করার কথা তারা যদি এমন কাজ করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। আমি এবং জেলা প্রশাসক আগামীতে আবারো আলোচনা করবো। আমরা একটা অডিটের ব্যবস্থা করবো। যদি আমরা না পারি তাহলে আমরা অবশ্যই দুদকের সহযোগীতা নিবো। কেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পিএ এর এমন রাজত্ব চলছে।

তিনি আরো বলেন, অন্যান্য হাসপাতালে গুলোতে দেখা যায় রোগীর জায়গা দিতে পারেনা। অথচ আমি গত ৫ বছরে দেখলাম না খানপুর হাসপাতালে সিট গুলোতে রোগী সম্পন্ন হয়েছে। আমার কাছে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পিএ এর শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠান এবং কিছু কিছু ক্লিনিকে উনার নামে বেনামে মালিকানা আছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যেকোন উপায়ে আমাদের এগুলো তদন্ত করে বের করতে হবে এবং যাতে করে তার কোন কার্যক্রম না চলে সেজন্য মন্ত্রনালয়ে আমি চিঠি দিবো। নয়তো যারা আজকে সম্মুখ যুদ্ধ করছে তারা বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়বেন। প্রয়োজনে আমরা অন্য লোক আনবো। আর এসব কাজের সাথে যদি এলাকার কেউ জড়িত হয়ে থাকেন তাহলে তারা ওই এলাকায় থাকতে পারবেন বলে আমার মনে হয়না। আর নয়তো তাদের কাছ থেকে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরন আদায় করা হবে।

এদিকে ২ জুলাই দুপুরে শহরের খানপুর এলাকায় হাসপাতালটিতে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধনকালে ৩০০ শয্যা হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান বলেছেন, ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সব সময় দুর্ভাগা। এর কারণ হচ্ছে কিছু অসৎ প্রকৃতির লোক আমাদের আশে পাশে চলে। আমি দেখায় দিবো কে কে চোর। খানপুরের হাসপাতাল থেকে খানপুরের মানুষ হাসপাতালের মালিক হয়েছেন, ৫ তলা বাড়ি করেছেন লিফট সহ। এসব করতে পারে না। তাহলে তাকে দুদকের মাধ্যমে প্রশ্ন করা হবে। যে ব্যবসায় খেলাপি, ব্যাংক খেলাপি তার এতো টাকা কোথায় থেকে আসে। ওই সিদ্দিক সাহেবেরও এতো টাকা কোথায় থেকে আসলো। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাহেব অডিট করতে হবে। এটা চুরি না এটা পুকুর চুরি হয়েছে। খানপুরে দেখে খানপুরের মানুষ এ হাসপাতালের মালিক না।

পরে তিনি নিজ থেকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘চুরি যারা করেছে তাদের প্রত্যেকের নাম তদন্তের পর প্রকাশ করা হবে।’


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও