১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, সোমবার ২৮ মে ২০১৮ , ৪:০৩ অপরাহ্ণ

রাজনীতি ও কারাগার-১

কারাগারে সাখাওয়াতকে টিপ্পনি ৭ খুনের আসামীদের


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:১৮ পিএম, ১৭ মার্চ ২০১৮ শনিবার | আপডেট: ০৩:১৮ পিএম, ১৭ মার্চ ২০১৮ শনিবার


কারাগারে সাখাওয়াতকে টিপ্পনি ৭ খুনের আসামীদের

গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তার মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করছে দলটি। খালেদা জিয়ার সাজা হবার আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে সিলেট যান। তার সফর ও রায়কে কেন্দ্র করে গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে নারায়ণগঞ্জে ধরপাকড় শুরু করে পুলিশ। এতে দলের প্রায় অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হন।

গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে একেবারেই নীরব অবস্থায় রয়েছেন। আবার কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়েই আবারো খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে যোগ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনে মাঠে থেকে কারাগারকে বরণ করতে তাদের কোন আপত্তি নেই বলেও জানাচ্ছেন তারা। তবে কারাগার থেকে বের হয়ে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে এবং পুনরায় কারাগার এড়াতে মুক্ত থাকছেন দলীয় কর্মসূচীগুলো থেকে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সিলেট যাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে নারায়ণগঞ্জে মিছিল করতে গিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়ির সামনে থেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। পরে তাকে সদর থানার একটি নাশকতা ও বিস্ফোরক মামলায় আসামী হিসেবে দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। প্রায় ১১ দিন কারাগারে থাকার পর ১৫ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জের ‘রাজনীতি ও কারাগার’ শীর্ষক ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বে থাকছে কারাগার ও রাজনীতি নিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের সাথে আলোচনার কিছু চুম্বক অংশ।

প্রশ্ন : আপনি গ্রেফতার হলেন কবে এবং কিভাবে ?
সাখাওয়াত হোসেন খান : ৫ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সিলেট যাত্রাকে কেন্দ্র করে সকাল ১০টায় তাকে অভ্যর্থনা জানাতে সানারপাড়ে সড়কে আমিসহ কয়েকজন আইনজীবী হাজির হই। তাকে অভ্যর্থনা জানানো শেষ হতেই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমাদেরকে ধরে নিয়ে যান। কোন অপরাধ না করার পরও কোন কারণ ছাড়াই আমাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রশ্ন : কোন মামলাতে গ্রেপ্তার হলেন?
সাখাওয়াত হোসেন খান : বিচিত্র একটি দেশে এখন আমরা বাস করি। পুলিশ যে মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখালো, আমি নিজেও অনেক বিস্মিত হয়েছি। যেখানের ঘটনার কথা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে আমি সেখানে কখনো গিয়েছি কিনা আমার মনে নেই। আর সেখানে এরকম কোন ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের কেউ বলতে পারবেনা। অথচ এতবড় একটি ঘটনা সাজিয়ে আমাকে এই মামলায় এজাহারভুক্ত আসামী করা হয়েছে। ঘটনা না ঘটিয়েই আমি মামলার আসামী হলাম। মামলার যে ঘটনা উল্লেখ করা হলো এবং ঘটনার বর্ণনা করা হলো নিজের কাছেই নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি আমি, সে দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তিকে এরকম বিস্ফোরক ধারা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের ধারা যাকে নাশকতা বলা হয়, যেমন সরকারি স্থাপনা সহ বিভিন্ন কিছু ধ্বংস করার জন্য নাকি আমরা পরিকল্পনা করছিলাম। এমন ঘটনায় মিথ্যা মামলা হবে আর এমন মামলায় আমি আসামী হবো, সারাজীবন অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেলাম এখন এমন ঘটনা যা ঘটেনি তার মামলায় আমি আসামী। আমার মত একজন মানুষকে এভাবে মিথ্যা মামলায় ১১ দিন জেল খাটানো হলো।

প্রশ্ন : কারাগার থেকে বের হয়ে নিস্ক্রিয় মনে হচ্ছে আপনাকে, কারণ কি?
সাখাওয়াত হোসেন খান : এটা সঠিক নয়। আমি কারাগার থেকে বের হবার পর সবগুলো কেন্দ্রীয় কর্মসূচী আমি পালন করেছি ও সকল কর্মসূচীতেই আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ৮ ফেব্রুয়ারির রায়কে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে অনেক মামলা হয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আমি যেহেতু জেলে ছিলাম সেখানে নেতাকর্মীদের যে আহাজারি, আকুতি মিনতি আমি দেখেছি। তারা আমাকে বলেছেন আপনিই যেহেতু জেলে এসেছেন আমাদের কি হবে। আমি যখন বের হয়েছি আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল আমাদের নেতাকর্মীদের মুক্ত করে আনা, আমি তাদের জন্য আইনী লড়াইয়ে অনেক সময় দিচ্ছি। এ কারণেই হয়তো কিছুটা কম দেখা গেছে আমাকে।

প্রশ্ন : কারাগারের দিনগুলি কেমন ছিল?
সাখাওয়াত হোসেন খান :  কারাগারের দিনগুলো খুবই মর্মান্তিক ছিল। একে তো মিথ্যা মামলায় জেলে নিলো, জেলে যাবার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম না। কোন অপরাধ করিনি তাই গ্রেফতার হবো এ ধরনের চিন্তা মাথায় ছিলনা। ইতোপূর্বে যেসকল আসামীরা গ্রেফতার হয়েছিলেন তারা সকলেই আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন কিন্তু আমার ক্ষেত্রেই এটার ব্যতয় ঘটলো। হয়তো সরকারের কোন ইঙ্গিতের কারণেই আমাকে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলো এবং ১১ দিন কারাগারে থাকতে হলো। আমি কি এমন অপরাধ করেছি যে আমাকে রিমান্ডে নিতে হবে, তবুও ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলো।

সাখাওয়াত বলেন, ‘আমি কারাগারে যাবার আগেই আমার জন্য ফাঁসির সেল প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই ফাঁসির সেলে আলী আহমেদ মুজাহিদকে ফাঁসির আদেশ দেয়ার পর রাখা হয়েছিল। এই সেলেই আমাকে সহ আমার নেতাকর্মীদের রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। যতদিন কারাগারে ছিলাম এই সেলেই অন্ধকারেই আমাকে থাকতে হয়েছে। আমার সবচেয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হলো যেই সাত হত্যা মামলায় আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, আইনী লড়াই করেছি সেই সাত খুনের কিছু আসামীকে আমার পাশের কক্ষেই রাখা হলো। নূর হোসেনের সাথে ধরা পড়া বন্দরের সেলিম, আলী মোহাম্মদ সহ আরো একজন। আমাকে দেখে তারা এসে বলেছিল, যাক ভাই আপনি আর আমরা একই জায়গার বাসিন্দা হলাম। আমাদের তো জেলে পাঠিয়েছেন, এখন আমাদের প্রতিবেশিই হলেন। সাত হত্যার মত একটি জঘন্য হত্যার আসামীরা আমাকে টিপ্পনি কেটেছে, মজা নিয়েছে। আপনি আমাদের সাজার ব্যবস্থা করলেন আল্লাহ আপনাকেও আমাদের সাথেই আনলো। আমি এ ঘটনায় জেল কর্তৃপক্ষকে জানালে ও প্রতিবাদ করলে তাদেরকে জেল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিলো। অন্যত্র যাবার সময় তারা বললো, ভাই বাইরেও আপনার জ্বালায় সাজা হলো আর ভিতরে এসেও আপনি আমাদের সুখে থাকতে দিলেন না। এরপর যাদের আনা হলো এখানে তারা ছিল ২০০৪ সালের বোমা হামলার আসামী। তখন আমি আবারো জানালাম যে গত তিন মাস আগে ২ নং বিশেষ ট্র্যাইব্যুনালে আমি এই আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে এসেছি যেহেতু আদালত প্রাঙ্গনে ঐ ঘটনা ঘটেছিল। এখন যদি তাদের সাথে আমাকে রাখা হয় তাহলে তো আমার জীবন বিপন্ন হবে। পরে তাদেরকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছিল সেখান থেকে। এক কথায় কারাগারের প্রতিটি দিনই উদ্বিগ্নতায় কেটেছে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছিল সেই সাজার বিষয় নিয়ে। যে কয়দিন জেল খেটেছিলাম মনে হয়েছে অনেক বছর জেল খেটেছি।

প্রশ্ন : রাজনীতি নিয়ে আপাতত ও আগামী পরিকল্পনা কি?
সাখাওয়াত হোসেন খান : পরিকল্পনা হলো দুটি। নারায়ণগঞ্জে স্বচ্ছ একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন, তিনিসহ দলের যেসকল নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছেন সকল রাজবন্দিদের আন্দোলন, আইনী প্রক্রিয়ায় কারাগার থেকে মুক্ত করা। দেশের মানুষের যে গণতান্ত্রিক অধিকার যে হরণ হয়েছে। মানুষ যে এখন ভোট দিতে পারেনা, তাই মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া যেন মানুষ ভোট দিতে পারে এজন্য একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে নির্বাচনের জন্য সরকারকে বাধ্য করার জন্য দলকে শক্তিশালী করা ও আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করা।

প্রশ্ন : রাজপথে কি দেখা পাওয়া যাবে আপনার ও আপনাদের সহকর্মীদের?
সাখাওয়াত হোসেন খান : রাজনীতি করি আদর্শের রাজনীতি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতি করি। ইতোপূর্বে রাজপথে ছিলাম আগামীতে আরো বড় পরিসরে রাজপথে থাকবো এবং এই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যে ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয় সেটা করেই সকল বাধা উপেক্ষা করে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। রাত যত গভীর হবে ভোর তত নিকটে।

প্রশ্ন : নারায়ণগঞ্জে তো খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কোন মিছিলও হয়নি, কারণ কি বলে মনে করছেন?
সাখাওয়াত হোসেন খান : সরকার এবং পুলিশ বাহিনীর বেপরোয়া দমন পীড়ন, অপহরণ গুম খুন এসব কারণেই হয়তো হয়নি। সামনে কঠিন আন্দোলন দানা বাধছে। সামনে কঠিন ঝড়ে সরকারের পতন হবে।

প্রশ্ন : বিরোধী দলের রাজনীতিতে কারাগারে যেতেই হয়, আবারো যদি কারাগারে যেতে হয় সেক্ষেত্রে দলের হয়ে, দলের জন্য, দলের পক্ষে কাজ করবেন তো নাকি নিস্ক্রিয়ই থাকবেন?
সাখাওয়াত হোসেন খান :  জেল জুলুমকে ভয় করিনা। আদর্শের রাজনীতিতে মাঠে থাকবো। নিস্ক্রিয় হবার কোন কারণই নেই বরং সামনে আরো সক্রিয়ভাবেই দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারন মানুষকেও দেখা যাবে রাজপথে।

প্রশ্ন : আগামী দিনে আন্দোলন সংগ্রামে আপনার ভূমিকা কী থাকবে?
সাখাওয়াত হোসেন খান : দল এবং জোট যে ধরনের আন্দোলনের ডাক আগামীতে দেবে সেটাতেই আমি জিয়াউর রহমানের সৈনিক হিসেবে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার, তারেক রহমানের এখন কর্মী হিসেবে আমি মাঠে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবো।

প্রশ্ন : নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ঠিকমত রাজপথে আন্দোলন করতে পারছে না অনেকের অভিমত আপনার কী ?
সাখাওয়াত হোসেন খান : এটা সঠিক নয়, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। বর্তমান অবস্থায় মাঠে থাকার চেষ্টা করছে আমাদের নেতাকর্মীরা। তবে আশা করি সামনে আমাদের সকল ভুল ত্রুটি শেষ করে সামনে আমরা কঠিনভাবে রাজপথে থাকবো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সাক্ষাৎকার -এর সর্বশেষ