৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, বৃহস্পতিবার ২২ নভেম্বর ২০১৮ , ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

rabbhaban

রক্ত কত গরম অনুভব করেছি : শামীম ওসমান


স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৬:২৮ পিএম, ১৯ জুন ২০১৮ মঙ্গলবার


রক্ত কত গরম অনুভব করেছি : শামীম ওসমান

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় আহত হয়েছিলেন ওই সময়কার ও বর্তমান এমপি শামীম ওসমান সহ অর্ধশতজন। প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরই অনুগামী আর ঘনিষ্ঠজনেরাও। নিহত ২০পরিবারের কান্না এখনো থামেনি। মাঝে বিএনপি ও জামায়াতের সরকার বাদে টানা ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। তবুও হচ্ছে না বিচার।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতে, বোমা হামলার মূল টার্গেট ছিল বর্তমান নারায়ণগঞ্জ- ৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। দেশে প্রথমবারের মত জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান ও নারায়ণগঞ্জের মাটিতে জামাতে ইসলামের সাবেক আমীর গোলাম আযমকে প্রবেশ নিষিদ্ধ করাই ছিল শামীম ওসমানের অপরাধ।

বোমা হামলা সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শামীম ওসমান মুঠোফোনে বলেন, রক্ত কত গরম তা অনুভব করেছিলাম। বোমাটি যখন বিস্ফোরণ হল তখন মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি। আমার আশেপাশে কারো ছেড়া হাত, পা বা কারো মাথা। সিলিং ঝুলে আছে ছিন্ন ভিন্ন মানবদেহ। আর চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। পরক্ষণেই জ্ঞান হারাই। আমি প্রথম জঙ্গীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম শেখ হাসিনাকে বাঁচান। আমার ওপর হামলার পরেই কিন্তু ২১আগস্ট নেত্রীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয়। সমস্যাটা হলো আমি আগে বলি পরে সবাই বুঝতে পারে।

বোমা হামলার মামলা ও বিচার প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, আমি হতাশ। এ কারণে যে এ হামলার মূল ছিল চাষাঢ়া এলাকার উবায়দুল নামে এক ব্যক্তি। এই উবায়দুল সেই দিন ঘটনাস্থলে এসে আমার টেবিল চাপড়িয়ে বলেছিলেন, আমি কেন তার কাগজে স্বাক্ষর করব না। তার সাথেই এসেছিলেন হরকাতুল জিহাদের দুই জঙ্গী সহোদর মোত্তাকিম ও মোরসালিস। এই উবায়ুদলের কথা আমি মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে বারবার বলার পরে তাকে সরে যেতে সহায়তা করা হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ভারত থেকে দেশে এত বন্দী বিনিময় হয়। কিন্তু এত বড় নৃশংস বোমা হামলার জড়িত দুই জঙ্গী মোত্তাকিন ও মোরসালিনকে কেন দেশে আনা হয় না।

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জঙ্গীদের বিরুদ্ধে আমি প্রথম কথা বলেছিলাম। সেই সময় সবাইকে সাবধান হওয়া দরকার ছিল। আমার ওপর হামলার পরেই ২১আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমার নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে। আমার দু:খ একটাই যারা আমাকে হত্যা করতে গিয়ে ২০ জন মানুষকে হত্যা করল। তারাতো শুধু আমাকে একটি গুলি করেই হত্যা করতে পারত। খুব কষ্ট হয়। যখন কারো বিধবা স্ত্রী ও এতিম সন্তান আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। আজ আমার জন্য তাদের এই অবস্থা। তবে দোষীদের বিচারের দীঘসূত্রিতায় অনেক হতাশ হয়েছি। যারা এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত তারাও হতাশ।

সেইদিনের ঘটনা সম্পর্কে দুই পা হারানো মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি চন্দন শীল বলেন, প্রতি সপ্তাহের শনি ও সোমবার সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সেইদিন আমার আশার কথা ছিল না। আমি জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম বলে আসতে চাইনি। পরে নেতাকর্মীরা আমাকে ফোন দিয়ে বলে আসতেই হবে। তাই সন্ধ্যায় কার্যালয়ে এসে দেখি শামীম ওসমানের সঙ্গে একজন বৃদ্ধ লোক খুব জোড় গলায় কথা বলছেন। তাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য একটি দরখাস্তে স্বাক্ষর দিতে হবে শামীম ওসমানের। পরে সেখান থেকে শামীম ওসমানকে সরিয়ে দিতেই বৃদ্ধাও কোন কিছু না বলে চলে যায়। সেই মুহূর্তে পায়ের একটু সামনে প্রচন্ড বিস্ফোরণ। চোখের সামনে আগুনের গোলা। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। দুই পা বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল ক্লাবের সামনে। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। নিথর দেহের পাশে আহতদের গোঙানির শব্দ যেন মৃতপুরী। আরো কয়েকজন সহ আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর পরে আর কিছু বলতে পারি না। পরে আমাকে ও রতন দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শামীম ওসমান ও আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জার্মানিতে পাঠান। টাকার অভাবে জার্মানিতে পুরোপুরি চিকিৎসা করাতে পারিনি। যতটুকু হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের বদৌলতে। জার্মানি থেকে ফিরে ভারতে চিকিৎসারত অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়েছি। এমনও দিন গেছে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেয়েছি। বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা ছিল সেটাও বন্ধ করে দেয় তৎকালীন বিএনপি-জামায়ত জোট সরকার এছাড়াও বিভিন্নভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে।`

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০জন নিহত হওয়ার ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল আবু মোরসালিন ও মহিবুল মোত্তাকিম নামের সহোদর ভাই। হরকাতুল জিহাদের এ দুইজন জঙ্গী ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া বোমা হামলার ঘটনার আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।

চাষাঢ়া বোমা হামলার পর ২০১৩ সালের ২ মে আদালতে দেওয়া চার্জশীটে এ দুইজন সহ ৬জনকে অভিযুক্ত করা হয়। চার্জশীট জমার দিন প্রেস ব্রিফিংয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির নারায়ণগঞ্জ শাখার এএসপি এহসানউদ্দীন বলেছিলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন তাকে বলেছেন যে ২০০১ সালের ১৬ জুন বিকেলে চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে এসেছিলেন ওবায়দুল নামের এক ব্যক্তি। তার বাড়ি শহরের চাষাঢ়ায় চকলেট ফ্যাক্টরী মোড় এলাকাতে। তিনি সহ আরও ২জন মোট ৩জন এসেছিলেন আওয়ামী লীগ অফিসে। রাত ৭টার দিকে তিনি সহ ২ জন শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত কক্ষে গিয়ে কথা বলেন। তারা এসেছিলেন আমেরিকার ভিসার জন্য সুপারিশ করতে। ৩জন এলেও মূলে ছিলেন উবায়দুল। তিনিই মূলত আমেরিকা যাওয়ার জন্য বেশ কিছু কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন। শামীম ওসমানের সঙ্গে তিনি কথা বলে ওই কাগজপত্রে সুপারিশ চান। কিন্তু শামীম ওসমান তা দিতে প্রথমে অনীহা প্রকাশ করেন। ওই সময়ে উবায়দুল হঠাৎ করেই শামীম ওসমানের সামনের টেবিল চাপড়ে উঠে বলেন, ‘আমার জন্য কেন সুপারিশ করবে না, দিবে না কেন, আমরা তোমার মহল্লার লোক। আমাদের জন্য না করলে কার জন্য করবে?’

শামীম ওসমান তাঁকে বলেন, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস সাংসদদের সুপারিশে ভিসা দেয় না। তার পরও উবায়দুল হক সুপারিশের জন্য পিড়াপিড়ি করতে থাকেন।

উবায়দুলের সঙ্গে আসা ২ জনের একজনের হাতে ছিল কালো ব্রিফকেস। দুই যুবক ফটোকপি করা একটি আবদেনপত্রে শামীম ওসমানের সুপারিশসহ সই চান। এর মধ্যে ওবায়দুল হক দ্রুত বেরিয়ে যান। সে সময়ে শামীম ওসমানের প্রভাব ছিল দোর্দান্ড। কিন্তু ওই মুহূর্তে শামীম ওসমানের টেবিল চাপড়ে ওবায়দুল এর মত একজন ব্যক্তির সে আচরণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠেন রুমে থাকা অন্যরা। তারা অনেকটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন উবায়দুল এর দিকে।

ওবায়দুল অনেকটা উত্তেজিত থাকলেও অন্য ২ জন ছিলেন বেশ নীরব। তারা বসে শুধু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। টেবিল চাপড়ানো ওবায়দুল পরে গ্রেপ্তার কলেও সে জামিনে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে পুরাতন ঢাকা এলাকাতে বসবাস করেন। উবায়দুলের সঙ্গে আসা দুইজনই মোরসালিন ও মুত্তাকিম ছিলেন।

২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী ভারতের রাজধারী দিল্লীর একটি রেল ষ্টেশন হতে হরকাতুল জিহাদের দুই জঙ্গি সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মুত্তাকিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বাড়ি বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। তারাও বোমা হামলার ঘটনা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে দিল্লী কারাগারে বন্দী রয়েছে।

চার্জশীট দায়েরের সময়ে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে থাকা সিআইডি নারায়ণগঞ্জ অফিসের ওই সময়ের সহকারী পুলিশ সুপার এহসান উদ্দীন চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন তথা ১৬জুন রাতে মোরসালিন ও মুত্তাকিম একটি ব্রিফকেস হাতে নিয়ে চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে প্রবেশ করে। তখন তারা শামীম ওসমানকে দিয়ে কয়েকটি কাগজ স্বাক্ষরের চেষ্টা করে। ওই সময়ে চাষাঢ়া এলাকার ওবায়দুল্লাহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শামীম ওসমান ওই কাগজে স্বাক্ষর করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় তখন শামীম ওসমানের টেবিল চাপড়ে দিয়েছিলেন তিনজন। তাদের সঙ্গে আনা ব্রিফকেসটিতেই বোমা রাখা ছিল। তবে এটা টাইম বোমা নাকি রিপোর্ট কন্ট্রোল বোমা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বোমা হামলায় এছাড়াও মুফতি আবদুল হান্নান, ওবায়দুল্লাহ জড়িত ছিল।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে ২০০১ সালে ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় ২০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। ১৭ বছরেও বিচার হয়নি এসব বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের। এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি এসব পরিবারগুলো। নিহতদের পরিবারগুলো দাবি করছে নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ১৬ জুন বোমা হামলা দিবস হিসেবে অন্তত নারায়ণগঞ্জে সরকারীভাবে পালন ও নিহতদের স্মরণে স্মৃতি ফাউন্ডেশন করা।

সেদিন নিহত হয়েছিল শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারী তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক মহিলা। নিহত মহিলার পরিচয় পেতে তেমন কোন চেষ্টা করেনি প্রশাসন। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সাক্ষাৎকার -এর সর্বশেষ