৬ কার্তিক ১৪২৫, রবিবার ২১ অক্টোবর ২০১৮ , ৯:৪২ অপরাহ্ণ

UMo

সাক্ষাৎকার

সংগ্রামী নারী ডেপুটি জেলার তানিয়া


হাফসা আক্তার (স্টাফ করেসপনডেন্ট) || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১২:০৫ এএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার


সংগ্রামী নারী ডেপুটি জেলার তানিয়া

বর্তমান সমাজ এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হিসেবেই পরিচিত। সমাজে নিজের সামান্য একটু জায়গা করে নিতেও নানা ধরনের সংগ্রাম করতে হয় নারীদের। সম্মুখিন হতে হয় ছোট বড় অসংখ্য বাধার। সে বাধায় কখনো নারীরাও ভেঙ্গে পরে কখনো সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে পুরুষ সমাজের সাথে যুদ্ধ করে হয়ে ওঠে অনন্যা। তারা প্রমাণ করে দেয় যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারাও ততটাই ভূমিকা রাখে যতটা রাখে পুরুষ। প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা নারীশক্তির আসল মানে বোঝায় সমাজকে। সমাজে অন্য নারীরাও অনুপ্রানিত হয় এই অনন্যাদের জীবন যুদ্ধ থেকে।

তেমনি এক সংগ্রামী নারী নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলার তানিয়া জামান। ৬ বছর ধরে বাংলাদেশ জেলে ডেপুটি জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে এওয়ার্ড অব এক্সিলেলেন্স পুরষ্কার পান তিনি।

আড়াই বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে কর্মরত আছেন এবং ১ বছর ধরে স্থায়ী ভাবে কর্তব্য পালন করছেন যশোরের মেয়ে তানিয়া। সময়ের নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে কথা বলেছেন নিজের জীবনের সাফল্য নিয়ে। স্টাফ রিপোর্টার হাফসা আক্তারের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে সাধারণ নারী থেকে ১জন সংগ্রামী নারী হওয়ার চলার পথটা কেমন ছিল?

তানিয়া জামান : সমাজে চলার পথটা সকলের জন্যই কঠিন। তবে নারীদের জন্য সে পথে যেন এক প্রকার কাঁটা বিছানো থাকে। আর সে পথ নিতান্তই সহজ ছিল না। ৮ম শ্রেনীতে থাকতে আমার বাবা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পরে। তখন পরিবারে আমি বড় মেয়ে। ভাই বোনরা খুব ছোট ছিল। তখন থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দেখাশোনাটাও আমাকেই করতে হয়েছে। মূলত জীবন সংগ্রামটা সেখান থেকেই শুরু। বলা যায় জীবনটা শুরু হয়েছে সেখান থেকেই।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : জীবন সংগ্রামের আসল লক্ষ্য কেমন ছিল?

তানিয়া জামান : আমি ইংলিশে অনার্স এবং মাস্টার্স করেছি, সাথে ডিগ্রীও করেছি। টাকার অভাবে অনেক সময়ই পড়াশোনা আটকে গেছে। তাও লক্ষ্যটা এমন ছিল যে জীবনে কিছু একটা করতে হবে। একটা চাকরি তো আমায় পেতেই হবে। যাতে পুরো পরিবারের দায়িত্ব টা নিতে পারি। সাথে বাবার চিকিৎসার খরচটাও যাতে আমি বহন করতে পারি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী হিসেবে চলার পথে পরিবারের সহযোগীতা কেমন পেয়েছিলেন?

তানিয়া জামান : বাবার অসুস্থতার কারণে দাদার বাড়িতে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে গিয়েছিল। ফলে মা আমাদের নিয়ে নানার বাড়িতে চলে যান। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বাবার বাড়ির পরিবারের দিক থেকে তেমন কোনো সাহায্য পাইনি। তবে আমার মা আমাকে মানসিক ভাবে খুব সহযোগীতা করেছেন, ভেঙ্গে পরতে দেননি কখনো। আর এদিকে আমার খালাতো বোন ওয়াহিদা আক্তার শীলা সর্বাত্বকভাবে সাহায্য করেছেন। আমার পড়াশোনায় সাহায্য করা থেকে পরিবারের খরচেও তিনি সাহায্য করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন সারাজীবন কিভাবে সৎ থাকতে হয়। সে এখন প্রধানমন্ত্রীর পিএস-২ হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : জীবন সংগ্রামে কখনো বাধার সম্মুখিন হয়েছিলেন?

তানিয়া জামান : প্রতি পদক্ষেপে নারীদের বাধার সম্মুখিন হওয়াটাই যেন স্বাভাবিক বিষয়। আমি টিউশনি করে বাড়ি ফিরতাম খুব দেরি করে। তাছাড়া সে বয়সের কোন মেয়ের বাবা যদি ইনএকটিভ থাকে তাহলে এলাকার লোকজনরা সে মেয়ের উপর এক প্রকার আধিপত্য ফলাতে করতে চায়। আমার নিজের চাচারাও চেয়েছিলেন যে করে হোক আমায় বিয়ে দিয়ে দিতে। এলাকার লোকজন খুব জালাতন করতেন বিয়ের জন্য। কিন্তু সে সময়ে আমার বিয়ে করলে চলতো না। পরিবারের খেয়াল রাখার দায়িত্ব টা আমার ছিল। সে সময়ে আমার মা খুব সাহায্য করেছিলেন আমায়, এ সকল পরিস্থিতি কাটাতে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ: আপনার কাছে সংগ্রামের রূপটা কেমন ছিল?

তানিয়া জামান : সংগ্রাম সব সময়ই বেদনা দায়ক। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। আমি টাকার জন্য কখনো কোনো টিউশনিতে পরতে পারিনি। শিক্ষকদের পিছনে লেগে থাকতাম, কখন তারা একটু সময় পাবেন; কখন একটু পড়াটা বুঝিয়ে দিবেন। দেখা গিয়েছে আমি অনার্স প্রথম বর্ষে থাকতে ডিগ্রির শিক্ষার্থী পড়িয়েছি। সমাজের চাপে পরে বিয়ে করে নিয়েছিলাম। আমার স্বামীও তখন শিক্ষার্থী। দুজনে মিলেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম জীবনের লক্ষ্যে পৌছনোর। লালমাটিয়ায় একটি ক্লিনিকে রিসেপসনিস্ট হিসেবে প্রথম চাকরি পেয়েছিলাম শিক্ষার্থী জীবনে। মিরপুর থেকে মালিবাগ পর্যন্ত হেটে আসতে হতো। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় লোকাল বাসে ঝুলে অফিসে যেতে হতো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ: হাজার সংগ্রামের মধ্যেও স্বúœ ছোয়ার শুরুটা কিভাবে?

তানিয়া জামান: পড়াশোনার পর ইউএনডিপিতে চাকরি পাই। তারপর সেখান থেকে ইউসেপ বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ হয়। মূলত শুরুটা সেখান থেকেই। ইউসেপ এ কাজ করা অবস্থায়ই এই চাকরির জন্য আবেদন করি। জীবনের প্রথমবার কোনো সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেছিলাম। এবং প্রথমবারই চাকরিটা পেয়ে যাই, যা ছিল স্বপ্নের মতো। তখন সবে আমার ছেলে হয়েছে। পওথম পোস্টিং হয় খুলনা বিভাগে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : ডেপুটি জেলার হিসেবে চাকরি জীবনের শুরুটা কেমন ছিল? চাকরির ক্ষেত্রে নারী হিসেবে কোনো বাধার সম্মুখিন হতে হয়েছিল?

তানিয়া জামান : আমি যখন প্রথম চাকরিতে ঢুকি তখন আমার ছেলে খুব ছোট। বাইরের আলগা খাবার খাওয়ার বয়স তখনো তার হয়নি। কিন্তু অফিসের নানা নিয়ম ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশে ছেলেকে কাছে রাখতে পারতাম না। ফলে মানসিক ও শারীরিক ভাবে নানা সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়েছে। পরবর্তীতে সাতক্ষীরায় বদলি হই। ঠিক কে ঠিক আর ভুলকে ভুল বলার অদম্য সাহস ছিল সবসময়ই। সে সাহসের কারণে আরো একবার বদলি হতে হয় সাতক্ষীরা থেকে যশোরে। তারপর সেখান থেকেই এই নারায়ণগঞ্জে আসা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : চাকরি জীবন থেকে বড় পাওয়া গুলো কি?

তানিয়া জামান : সব থেকে বড় পাওয়া এওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স। জাতীয় প্যারেডে কারাগারের কর্মকর্তাদের মধ্যে সারা বাংলাদেশ থেকে একজন মাত্র নারী থাকেন এবং আমি সেই নারী ছিলাম। আমি কমান্ডার ছিলাম। রিসেন্টরি গাজ টিভিতে আজকের অনন্যা নামের প্রোগ্রামে ডেপুটি জেলার হিসেবে অংশগ্রহণ করেছি এবং বিজয়ী হয়েছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : চাকরির পাশাপাশি পরিবারের খেয়াল রাখতে কোনো ভাবে সমস্যা হচ্ছে?

তানিয়া জামান : আমি চাকরি আর পরিবার দুটোই একসাথে সামলাচ্ছি। আমার বাড়ির সকল কাজ আমি নিজেই করি। জেলের সব দায়িত্ব পালন করেও বাড়ি নিজের হাতে সামলাতে সমস্যঅ হচ্ছে না। বরং নারী হিসেবে নিজের বাড়ি নিজে সামলাতে আরো বেশি আনন্দ পাওয়া যায়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নিজের জীবনে কতটা সফল হতে পেরেছেন বলে মনে করেন?

তানিয়া জামান : নিজেকে মোটামুটি সফল ভাবছি। আমার পরিবারের দায়িত্ব নিতে পেরেছি। বোনের পড়াশোনা করিয়েছি, এখন সে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে পুরষ্কৃত হয়েছেন সে। ভাইয়ের পরাশোনা করাচ্ছি। আমার বাবার চিকিৎসা করাচ্ছি আমি। গ্রামের একটি মাদরাসায়ও প্রতিমাসে কিছুটা অনুদান দিচ্ছি। জীবনের লক্ষ্যে পৌছতে পেরেছি বলে মনে করছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : ডেপুটি জেলার নাকি মা; কোন ভূমিকায় নিজেকে বেশি ভালো লাগে?

তানিয়া জামান : নিঃসন্দেহে মায়ের ভূমিকাটাই বেশি ভালো লাগে। ডেপুটি জেলার হিসেবে সৎ ভাবে কাজ করতে খুব সম্মানিত বোধ করি। তবে মা হিসেবে ছেলেকেই নিজের দুনিয়া ভাবতে ভালো লাগে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : এখন জীবনের লক্ষ্য কি?

তানিয়া জামান : নিজের ছেলে ধ্রুবকে স্যালুট দেয়াই এখন লক্ষ্য, স্বপ্নও বলতে পারেন। আমি চাই আমার ছেলে জীবনে এমন কোনো জায়গায় পদার্পন করুক যে যায়গা থেকে ডেপুটি জেলার হিসেবে তাকে স্যালুট করতে পারি। মা হিসেবে এবং একজন ডেপুটি জেলার হিসেবে এটাই এখন মূল লক্ষ্য।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ: আপনার জীবনের আদর্শ কে ছিল?

তানিয়া জামান : আমার আদর্শ বা রোল মডেল ছিলেন মূলত ২জন। আমার মা ও আমার খালাতো বোন শীলা আপু। তারাই চলার পথে আমায় সাহস জুগিয়েছিলেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সাধারণ নারীদের জন্য কিছু বলতে চান?

তানিয়া জামান : পুরুষ আর সমাজ চাইবে তোমাদের পিছনে ফেলতে। কিন্তু তাদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলতে হবে। সমাজে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই তোমার জন্য। অনেকে অনেক কিছু বলবে। তা শুনো কিন্তু কখনো তা মাথায় নিয়ো না। লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না। মগডালের মতো উচু আশা রাখতে হবে। যাতে অন্তত গাছে উঠার সাহসটা রাখতে পারো। নয়তো কখনো গাছে চড়তেই পারবে না। পারবো না বা হবেনা বলে কোনো শব্দ নেই। ভয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আপনাকে ধন্যবাদ।

তানিয়া জামান: আপনাকে ধন্যবাদ।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সাক্ষাৎকার -এর সর্বশেষ