নারীরা সাধারণ না, হাল ছাড়া চলবে না : ইউএনও হোসনে আরা

হাফসা আক্তার (স্টাফ করেসপনডেন্ট) || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪২ পিএম, ২ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার



নারীরা সাধারণ না, হাল ছাড়া চলবে না : ইউএনও হোসনে আরা

বর্তমান সমাজ এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে পরিচিত হলেও এখন সমাজে নারীদের ভূমিকা পুরুষের তুলনায় নিতান্তই কম নয়। পদে পদে নারীরা প্রমাণ করছেন যে তারা সমাজের উন্নয়নে ঠিক ততটাই ভূমিকা রাখছেন যতটা পুরুষ। ‘নারীদের স্থান শুধুমাত্র রান্নাঘরে’ এ কথা ভাবার এখন আর কোনো অবকাশ নেই। আর সেটা প্রমাণ করে নারীরা সফলভাবে পদার্পন করছেন সমাজের উচু ও সম্মানিত অবস্থানে।

তেমনি এক সফল নারী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হোসনে আরা বেগম। সাড়ে ৬ বছরের চাকরি জীবনে কাজের সাথে কখনো আপোষ করেননি এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়ে বর্তমানে সদর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত আছেন ফরিদপুর জেলার মেয়ে হোসনে আরা বেগম। নিজের জীবনের সাফল্য নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নিউজ নারায়ণগঞ্জের সাথে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সাধারণ নারী থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে ওঠার পথটা কেমন ছিল?
হোসনে আরা বেগম : নারীদের পদে পদে প্রমাণ করতে হয় যে তারাও পারে সমাজে ভূমিকা রাখতে। তেমনি শিশু বয়স থেকেই প্রত্যেকটি পদে আমাকেও প্রমাণ করতে হয়েছে যে আমি পারবো। দেখা গিয়েছে পরিবারের সহযোগীতার পেতেও আমায় প্রমান করতে হয়েছে যে এই সহযোগীতার আমি যোগ্য।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : জীবনের লক্ষ কেমন ছিল?
হোসনে আরা বেগম : কখনো সাধারণ নারী হিসেবে থাকবো তা চিন্তা করতে পারিনি। লক্ষ ছিল সাধারণের মধ্যে অসাধারণ হয়ে দেখাবো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী জীবনে একটি বাধা হলো কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া, সেটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?
হোসনে আরা বেগম : কম বয়সে বিয়েটা নারী জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা বলে আমি মনে করি। মেয়েরা একটু বড় হলেই তাদের বিয়ের জন্য সবাই উঠে পড়ে লাগে। তাছাড়া দেখা যায় সবাই বলে যে আমার মেয়েকে আমি ডাক্তারের কাছে বিয়ে দিব বা ইঞ্জিনিয়ারের কাছে দিব। এই জিনিসগুলো খুব বাজে লাগে। আমি আবার একটু প্রতিবাদি স্বভাবের ছিলাম। তাই অনেক সময় আমি তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বলে ফেলতাম যে, ‘তেমন কারো কাছে মেয়ের বিয়ে দেয়ার চেয়ে মেয়েকেই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানান।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : চলার পথে পরিবারের সহযোগীতা কেমন পেয়েছেন?
হোসনে আরা বেগম : চলার পথে আমি আমার পরিবারের সম্পূর্ন সহযোগীতা পেয়েছি। যদিও সে সহযোগীতা আমি নিজের যোগ্যতায় অর্জন করেছি বলা যায়। ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে অনার্স, মাস্টার্স করেছি। যোগ্যতা দেখে পরিবার বুঝতে পেরেছিল যে আমার দ্বারা সম্ভব কিছু করে দেখানো। তাই তারা ছোট বেলা থেকেই সর্বোপরি সাহায্য করেছে আমাকে। এমনকি বিয়ের পর আমার স্বামীও আমায় সহযোগীতা করেছেন পড়াশোনা ও চাকরি জীবনের ক্ষেত্রে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : জীবনের আদর্শ কে ছিলেন?
হোসনে আরা বেগম : আমার বাবা। চলার পথে আমার বাবা-ই আমাকে সবচেয়ে বেশি মানসিক শক্তি যুগিয়েছেন। আমার বাবা একজন সৎ পুলিশ অফিসার ছিলেন। কখনো নিজের চাকরির ক্ষেত্রে আপস করেন নি তিনি। সব সময় লক্ষ ছিল বাবার মত সৎ অফিসার হবো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : চাকরি জীবনের শুরুটা কেমন ছিল?
হোসনে আরা বেগম : ৩০ তম বিসিএস-এ আমি একবার পরিক্ষা দিয়েই পাশ করেছিলাম। ফলে পড়াশোনা শেষ করে আমায় চাকরির জন্য বেশি দিন অপেক্ষা করত হয়নি। জীবনের প্রথম চাকরিটা ছিল একটি ব্যংকে। সেখানে সাড়ে ৮ মাস চাকরি করি। পরবর্তীতে বিসিএস দিয়ে এই চাকরিটি হয়। প্রথম পোস্টিং ছিল নোয়াখালি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : চাকরি জীবন থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া কি বলে মনে করেন?
হোসনে আরা বেগম : চাকরির সূত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে হয়েছে। রুট লেভেলের মানুষের সাথে কাজ করেছি, তাদের জন্য কাজ করেছি, তাদের নিয়ে কাজ করেছি। তাদের জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে, তাদের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে। এটাই আমার একটি বড় পাওয়া বলে আমি মনে করি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা নাকি পারিবারিক ভূমিকা, কোন ভূমিকায় নিজেকে বেশি ভালো লাগে?
হোসনে আরা বেগম : কাজ ছাড়া আমি থাকতে পারিনা। কাজ আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ। আর কাজ শেষে পরিবারে ফিরলে সকল ক্লান্তি চলে যায়, যেন জীবনে পরিপূর্নতা আসে। তাই বলা যায় উভয় ভূমিকাই আমার জীবনে সমান গুরুত্বপূর্ন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বর্তমান সমাজে ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ’-এর দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাচ্ছে বলে মনে করেন?
হোসনে আরা বেগম : আমি মনে করি বর্তমান সমাজে পুরুষরা আর নারীর জন্য বাধা নয়। কারণ পুরুষেরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। তারা এখন আর নারীদের বাধা দেয়না। বরং তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। আমার অফিসেও আমার পুরুষ সহকর্মীরা যারা আমার সাথে কাজ করছেন তারা আমায় অবহেলা করেন না। তারা আমায় যোগ্য সম্মান করেন। আসলে নারীদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি আগে বদলাতে হবে। কারন নারী চাইলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের জন্য এগিয়ে আসছেন না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সাধারণ নারীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?
হোসনে আরা বেগম : আসলে কোনো নারীই সাধারণ নয়। নারীরা মা, আর মা মানে পুরো পৃথিবী। আর একটা পৃথিবী কখনো সাধারণ হতে পারেনা। তবে সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে সেটা দেখিয়ে দিতে হয়। যেসব নারী চলার পথে হেরে যায় তাদের বলবো জীবনে চলার পথে বাধা আসবেই। তবে মানসিক জোরটা হারালে চলবে না। হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না।


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও