সিদ্ধান্ত পরে আগে আমার সন্তানের সুস্থতা জরুরী, দোয়া চাই : বীনা

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:০৮ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার

সিদ্ধান্ত পরে আগে আমার সন্তানের সুস্থতা জরুরী, দোয়া চাই : বীনা

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনের সদ্য সাবেক কর্মকর্তা তথা ইউএনও হোসনে আরা বেগম বীনা এখনো রাজধানীর একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ১০ ফেব্রুয়ারী রোববারও তিনি হাসপাতালে ছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও হিসেবে বিতর্কহীনভাবে কাজ করা বীনা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারী যখন তাঁকে বদলী ও ওএসডি করা হয় সেদিনই তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সন্তান প্রসব হয়।

ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে নিজের আবেগ, বদলীর কারণ, সন্তানের সবশেষ পরিস্থিতিও বর্ণনা দেন। বিশাল সেই স্ট্যাটাস নিয়ে এখন প্রশাসনে চলছে তোলপাড় কারণ সেখানে এর পুরো ঘটনার পেছনে নাম উল্লেখ না করে একজন বিশেষ কর্মকর্তার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

রোববার বিকেলে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে মুঠোফোনে বীনা বলেন, ‘রোববার আমার বাচ্চার অবস্থা একটু উন্নত হয়েছে। শনিবার একটু বেশী খারাপ ছিল। একটি অপারেশন ও মানসিক চাপে আমি এখনও অসুস্থ। ’

ওএসডির বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে আমার সন্তান সুস্থ হওয়া জরুরী। সে সুস্থ হলে পরবর্তীতে আমি সিদ্ধান্ত নিবো। এখন শুধু আমার সন্তানের জন্য দোয়া চাই।  পেশাগত কিছু সমস্যার কারণে সেই কর্মকর্তার নাম বলা যাচ্ছে না।

এবার নির্বাহী কর্মকর্তা তথা ইউএনও হয়ে আসছেন সেই আলোচিত নাহিদা বারিক। ৪ ফেব্রুয়ারী অতিরিক্ত কমিশনার (সার্বিক) তারিকুল ইসলাম সাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সদরে ইউএনও ছিলেন হোসনে আরা বেগম বীনা।

৮ ফেব্রুয়ারী রাতে বীনা তাঁর ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হল এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো... আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি। আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোন সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয় এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।’’

বীনা লিখেন, ‘‘উল্লেখ্য আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত ফাঁকিবাজী এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোন ব্যতিক্রম আমি করিনি। অথচ আমি সন্তান সম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলীর পায়তারা করেই চলেছিল। আমার সন্তান সম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ও আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি। আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল এপ্রিলের ২০ তারিখ, তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম।’’

‘‘গত ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখ বিকালে রেগুলার চেকাপ করতে আমি হাসব্যান্ড সহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি, চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমার হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।’’

‘‘আমার অপরাধ হলো আমি সন্তান সম্ভবা, আর তার চেয়েও বড় কারণ হল সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি প্রচন্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি, উল্লেখ আমি এজমার রোগি। প্রচন্ড মানসিকচাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তাৎক্ষনিক হসপিটালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়, পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সি প্রিমেচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপন যুদ্ধ করে যাচ্ছে!!!’’

‘‘আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কি অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানিনা!!! তবে জানি একজন সব দেখেন তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোন কর্তা ব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তা কে বলবো তুমি এর বিচার করো!!! আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন, ও সুস্থ হয়ে গেলে কোন কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’’


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও