রক্ত ঝরাতেও আপসোস নাই, মুন্নার ১৫ লাখ টাকার হিসাব চাই : কবির

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:২৬ এএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার

রক্ত ঝরাতেও আপসোস নাই, মুন্নার ১৫ লাখ টাকার হিসাব চাই : কবির

নারায়ণগঞ্জ শহরের নলুয়াপাড়া জামে মসজিদের অর্থ ইস্যুতে ১৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসাইন ও সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না সহ তাদের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি, গ্রেপ্তার ও দুই গ্রুপের আপোষের পর মুক্তির ঘটনার একদিন পরেই সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। কবির হোসাইন ১৯ ফেব্রুয়ারী নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে আগের ঘটনার বিষয়ে কষ্ট পেয়েছেন দাবী করে যে ইস্যুতে ঘটনা তারও সুরহা চেয়েছেন।

কবির হোসাইন বলেছেন, আমার সাথে সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্নার সাথে ব্যক্তিগত কোন দ্বন্ধ নাই। আমার সঙ্গে বিপুল ভোটে পরাজয়ের কারণে হয়তো ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু সোমবার রাতের ঘটনাটি ভিন্ন। মূল ঘটনা আমার ওয়ার্ডের দক্ষিণ নলুয়া মসজিদ কমিটির টাকা নিয়ে। বিগত দিনে এমপি সেলিম ওসমান আমার ওয়ার্ডে প্রচুর টাকা দান করেছেন। এর পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যে মসজিদেও সেলিম ওসমানের অনুদান সহ আরো কিছু খাতে প্রায় ১৫ লাখ ৬৮ হাজার ৫’শ ৪৭ টাকা জমা ছিল। পুরো টাকাটা ছিল মুন্নার কাছে। ওই টাকার হিসেব চাওয়ার কারণেই মূলত হামলা হয়েছে। আমি আমার রক্তের বিচার চাই না, মসজিদের এ টাকাটা উদ্ধার হলেই আমি আল্লাহ্’র কাছে বিচার পেয়ে যাবো। এ কাজে প্রয়োজনে আরও রক্ত দিবো, কোন অসুবিধা নাই।

সংঘর্ষের কারণ ও নলুয়া জামে মসজিদের আয় ব্যয়ের হিসাব নিয়ে জানতে চাইলে সাবেক কাউন্সিলর ও মসজিদ কমিটির বর্তমান সভাপতি মোঃ কামরুল হাসান মুন্না জানান, আমি এর আগে বিলুপ্ত পৌরসভা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে ২ টার্মে ১৩ বছর কাউন্সিলর ছিলাম। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমি ৫ হাজারের ন্যায় ভোটে পেয়েও পরাজিত হই জয়ী হন কাউন্সিলর কবির। জনগণ যেহেতু তাকে বেছে নিয়েছিল তাই আমার কোন আপত্তি ছিলনা। কিন্তু নির্বাচনের ১ মাস পরে সে (কাউন্সিলর কবির) ও তার ভাই নেওয়াজউল্লাহ আমার চাচাতো ভাই রিয়নকে মারধর করে। ওই ঘটনায় থানায় একটি মামলাও হয়েছিল যাতে নেওয়াজউল্লাহ চার্জশীট ভুক্ত আসামী। কিন্তু কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সে বিভিন্ন কৌশলে যারা সমাজে বিভিন্ন সুবিধা অসুবিধা নিয়ে কথা বলতো তাদেরকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে আসছে। আমি যখন কাউন্সিলর ছিলাম তখন এলাকার ভেতরে কোন ট্রাকস্ট্যান্ড, অটোরিকশা স্ট্যান্ড কিংবা বাজার ছিলনা। তখন একটা নিরাপত্তা বলয় ছিল। কিন্তু বর্তমানে কি অবস্থা সেটা আপনারা সাংবাদিকরাও ভাল জানেন। সিটি নির্বাচনের পরে আমার চাচাতো ভাই রিয়নকে মারধরের ঘটনার পরে আমার মুরব্বী মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা আমাকে ও কাউন্সিলর কবির হোসেনকে নিয়ে বসেছিলেন। তখন তারা আমাদের থেকে ওয়াদা নিয়েছিলেন আমরা যাতে কোন বিরোধে না জড়াই। গত দুই বছরে আমাদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র ছাড়াও আমাদের বাড়ির সামনেই মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড বসানোর পরেও আমরা নিরব ছিলাম। শীতলক্ষ্যা পুল ও শহীদ বাপ্পী স্মরণীতে যারা ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়ে চাঁদা তোলে তাদের মধ্যে স্বপন তার চাচাতো ভাই এবং জন হচ্ছে শ্যালক। আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারি আমার কোন লোক যদি কেউ দেখাতে পারবেনা। গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে আমি কিছুদিন পূর্বে বলেছিলাম চাঁদাবাজদের আমরা প্রতিহত করলে কাউন্সিলর কবির কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না এমন আশ্বাস দিলে আমরা মাঠে নামবো। কিন্তু তিনি ওই বিষয়ে কোন উত্তর দেননি। আমি পরাজিত হলেও ৫ হাজার জনগণতো আমাকে ভোট দিয়েছিল। তাই তাদের সুবিধা অসুবিধাও আমাকে শুনতে হয়। অনেক সময় আমি পারি অনেক সময় পারিনা। কিন্তু জনগণের সেবা দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১০ দিন পূর্বেও সে আমার বাড়ির সামনে এসে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে গিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন সামনে বিধায় সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে আমি চুপ ছিলাম। ঝগড়া বিবাদে জড়াই নাই। উনি (কাউন্সিলর কবির) আওয়ামীলীগের রাজনীতি করেও নির্বাচনমুখী ছিলেন না।

মসজিদ কমিটির বিরোধ ও আয় ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে তিনি বলেন, দীর্ঘ ৬ বছর ধরে আমি নলুয়া জামে মসজিদের সভাপতি পদে রয়েছি। আমাদের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ডিসেম্বর মাসে। মসজিদ কমিটি কোন সাংবিধানিক সংগঠন নয় যেটার ঠিক সময়মতো নির্বাচন হতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিটি সাধারণত স্থানীয়দের দ্বারাই গঠন করা হয়ে থাকে। গত ৮ ফেব্রুয়ারী উনি (কাউন্সিলর কবির) মসজিদে এসে মুসুল্লীদের উপস্থিতিতে বললেন উনি কমিটি করে দিতে চান। উনি দু’জনের নামও প্রস্তাব করলেন। তখন আমি দাড়িয়ে মাইক হাতে নিয়ে মুসুল্লীদের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলাম তারা কি চান। তারা কাউন্সিলর কবিরের প্রস্তাবে রাজী কিনা। তখন মুসুল্লীরা কেউই কাউন্সিলর কবিরের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নাই। মুসুল্লীরা বলেছে আমাদের কমিটি আমরাই করবো। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারী আমাদের মসজিদ পরিচালনা কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। যার এজেন্ডা ছিল নির্বাচন ও আয় ব্যয়ের হিসাব। তখন কমিটির মিটিংয়ে সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে, ফরিদ মিয়া ও মোহাম্মদ আলী ফালুকে মসজিদটির নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দায়িত্ব দেন। তখন আমরা বলেছি নতুন কমিটির কাছে আমরা হিসাব বুঝিয়ে দিব। তিনি আরো বলেন, মসজিদের একাউন্টে টাকা নেই যেটা ঢালাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা। মসজিদের কিছু টাকা নগদ কোষাধ্যক্ষের কাছে থাকে যেটা নানা প্রয়োজনে খরচ করতে হয়। বাকী টাকা থাকে ব্যাংক একাউন্টে। আমরা শীঘ্রই ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ সেটা প্রকাশ করবো।

তিনি আরো বলেন, কাউন্সিলর কবির এর আগে তামাকপট্টি ও মুসলিমনগর এলাকায় গিয়ে নিজের মনমতো মসজিদ কমিটি করেছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের আইনে কিংবা বাংলাদেশের আইনের কোথাও আমি শুনি নাই কোন কাউন্সিলর মসজিদ কিংবা মন্দির কমিটিতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। ৬ মাস আগে তিনি তামাকপট্টিতে তার নিজের লোক দ্বারা অনেকটা জোরপূর্বক কমিটি করেছেন। ১ মাস আগে মুসলিমনগরে তার ভাই নেওয়াজউল্লাহকে দ্বারা কমিটি করেছেন। তিনি তার বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে আমাদের মসজিদে এসে হিসাব চাইছেন অথচ তিনি যেই মসজিদের নিয়মিত মুসুল্লী সেই মসজিদের ৩০ লাখ টাকার হিসাব নেই। জনগণ সেই মসজিদের আয় ব্যয়ের হিসাব জানতে চায়।

মুন্না আরো বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারী রাতে আমি নলুয়া জামে মসজিদের মিটিং শেষ করে সদর মডেল থানায় পরিবহন সংক্রান্ত একটি মিটিং এ যোগ দেই। সদর মডেল থানার ওসির সঙ্গে মিটিং শেষ করে আমি বাড়িতে ফিরে ঘুমিয়েও গিয়েছিলাম। রাত ১টার দিকে হঠাৎ হৈচৈ এর শব্দ শুনে বাড়ি থেকে বের হয়ে শুনি কাউন্সিলর কবির ও তার লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে আমার চাচাতো ভাই রিয়নের বাড়িতে হামলা করেছে। তখন এলাকার লোকজন তাদেরকে প্রতিহত করতে গেলে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। আমি অস্বীকার করবেনা যে সংঘর্ষ হয়নি কিন্তু আমার প্রশ্ন রাত ১টার সময় কাউন্সিলর কবির ও তার লোকজন কেন দেড় কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ির সামনে কেন এসেছিলেন। কাউন্সিলর কবির বলেছেন মসজিদের আয় ব্যয়ের হিসাব নিয়ে সংঘাত অথচ মসজিদ কমিটির মিটিং শেষ হয়েছিল কয়েক ঘন্টা আগেই। মূলত অন্যান্য মসজিদের ন্যায় নলুয়া মসজিদে নিজের মনগড়া কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েই হামলা চালিয়েছিলেন কাউন্সিলর কবির হোসেন।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ শহরের নলুয়া এলাকায় একটি মসজিদের কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষের পর ১৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসাইন ও সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না সহ ২২জনকে গ্রেফতার করলেও দুই পক্ষ সমঝোতায় আপোষ করেছেন। আদালতে দুই পক্ষ আপোষনামা দাখিল করলে প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা বন্ডে আদালত জামিন প্রদান করেন।

১৮ ফেব্রুয়ারী সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাউসার আহমেদ এর আদালত এ আদেশ দেন। এ আদালতে গ্রেপ্তার ২২জনকে ৭ দিন করে রিমান্ড আবেদন করে পাঠিয়েছিল পুলিশ। এর আগে ভোরে শহরের নলুয়া এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।

রাতেই সদর মডেল থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। সদর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় কামরুল হাসান মুন্নার বিরুদ্ধে কবির হোসাইন বাদী হয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। এতে অভিযোগ করা হয় মুন্না ধারালো ছুরি দিয়ে কয়েকজনকে কুপিয়ে জখম করে। এ মামলায় কামরুল হাসান মুন্না, রকিবুল হাসান লিয়ন, হুমায়ন কবির ও শ্যামল শীলকে আসামী করা হয়। পুলিশ মামলায় নাম উল্লেখ করা চারজনকেই গ্রেপ্তার করে।

অপরদিকে কাউন্সিলর মুন্না বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এ মামলায় কাউন্সিলর কবির হোসেন, বিপু, কালা ফারুক, আমিন, ওবায়দুল্লাহ, সাহবুদ্দিন, সুজন মিয়া সহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়। কবিরের বিরুদ্ধেও ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সেও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে অভিযোগ করা হয় মামলায়। এ মামলাতেও পুলিশ ১৮জনকে গ্রেফতার করে।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সেক্রেটারী খোকন সাহা জানান, আদালতে দুটি মামলার বাদী আপোষ করে হলফনামা দিয়েছেন। আপোষের কারণে আদালত ২২জনকেই জামিন প্রদান করেছেন।


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও