নারীর সিদ্ধান্ত নারীর নিজের হওয়া উচিত

হাফসা আক্তার, স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:৩৪ এএম, ৮ মার্চ ২০২০ রবিবার

নারীর সিদ্ধান্ত নারীর নিজের হওয়া উচিত

পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলায় তিনটি উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে বেশ দাপটের সহকারে সামলাচ্ছেন তিনজন নারী। তাঁদের কেউ কেউ এর আগেও নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। নারী হলেও ইউএনও’র মত গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসন সামলাতে গিয়ে  ভয়-ভীতি আর প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তাঁরা একের পর এক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। নারী হয়েও শক্ত ঝান্ডায় একের পর এক অভিযান চালিয়ে সমাজে শুদ্ধতা আনার চেষ্টা করছেন। ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে তাঁদেরকে নিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ প্রতিনিধি হাফসা আক্তারের বিশেষ প্রতিবেদন।

‘নারীরা দুর্বল নয় উল্লেখ করে বার বার আমরাই প্রমাণ করছি যে নারীরা দুর্বল। সৃষ্টির শুরু থেকেই নারী এবং পুরুষ সমান ভাবে সমাজে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে নারীদের এই করুন অবস্থার জন্য সমাজ দায়ী। কারণ বর্তমান সমাজ নারীদের শিখিয়েছে, নিজের সিন্ধান্ত নিজে না নিয়ে তা পুরুষ সঙ্গির উপর ছেড়ে দিতে। যেদিন নারীরা আবারও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখবে, সেদিন পুনরায় বিশ্বে নারী-পুরুষের সমতার দেখা মিলবে।’’ এমন মতাদর্শে বিশ্বাসী রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের মতাদর্শ প্রকাশ করেন মমতাজ বেগম।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী ক্ষমতায়নের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
মমতাজ বেগম : জন্মলগ্ন থেকেই সৃষ্টিকর্তা নারীদের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েই পাঠিয়েছেন। তবে আমরা বর্তমানে নারীদের যে করুন পরিস্থিতি দেখছি তা আমাদের সমাজেরই তৈরি। ইসলামের দৃষ্টিতে যদি আমরা দেখি তৎকালিন সময়ে খাদিজা (রা) একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। বলা যায়, অনেক পুরুষের চেয়েও ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতেন তিনি। অথচ পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আমরা এই সময়ে এসেও নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি। যা সত্যিই লজ্জাজনক। তবে আমরা দেখতে পাই বর্তমান সরকার নারীদের উন্নয়নের জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করছেন, যা নারীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করছে। তবুও বলবো; যতদিন না নারীরা স্বশিক্ষিত হয়ে উঠছে, সমাজ এবং পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা গ্রহন করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার ক্ষমতা অর্জন না করছে, ততদিন আমাদের নারী উন্নয়নের গতি ধীর থাকবে। ক্ষমতায়ন বলতে আমরা যদি শুধু উঁচু পর্যায়ে কাজ করাকে বুঝাই তবে তা ঠিক নয়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে পারার ক্ষমতাকেই আমি ক্ষমতায়ন বলে মনে করি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : একদিকে যেমন নারীর উন্নয়ন হচ্ছে, অন্যদিকে নির্যাতনের মাত্রাও বাড়ছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
মমতাজ বেগম : এ ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সচেতনতার অভাব। আমাদের সমাজে এখনো অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। যার ফলে মেয়েটি প্রয়োজনীয় শিক্ষার সুযোগ পায়না। ফলে একটি মেয়ে স্বনির্ভর হতে পারেনা। তাকে অন্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। একজন নারী যখন তার বাবা, স্বামী বা ভাইয়ের উপর নির্ভর করে, তখন পুরুষটির ধারণা থাকে যে মেয়েটির সাথে আমি যেমন ব্যাবহারই করিনা কেন সে অন্য কোথাও যাবে না বা তার যাওয়ার যায়গা নেই। ফলে সে পুরুষটি নিজেকে উক্ত নারীর কর্তা বা মালিক হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে যদি আমাদের বের হতে হয়, তবে আমাদের সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। এবং অবশ্যই নারীকে স্বশিক্ষিত এবং স্বনির্ভর হতে হবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আমাদের সমাজে নারীদের শিশুকাল থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে আপনার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা আছে কিনা?
মমতাজ বেগম : আমার পরিবারে আমাকে কখনোই তেমন কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়নি। আমরা ৪ বোন ১ ভাই একত্রে বড় হয়েছি। আমাদের মধ্যে কখনো কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি হতে দেয়নি আমার পরিবার। মা-বাবা আমাদের ছেলে সন্তান বা মেয়ে সন্তান হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে বড় করেছে। ছোট বেলা থেকেই পরিবারের ছোট ছোট বিষয়ে আমার মতামতের প্রাধান্য দেয়া হতো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারীর উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকা কতটুকু?
মমতাজ বেগম : নারী উন্নয়নে নারীর পাশাপাশি পুরুষের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক দিক দিয়েও যদি চিন্তা করি, তবে দেখা যায়, পরিবারে নারী এবং পুরুষ উভয়ে পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ভূমিকা রাখলে পরিবারই অনেক বেশি সুন্দর হয়। সমাজের ক্ষেত্রেও তাই। আমার মায়ের নেয়া যে কোনো সিদ্ধান্তকে আমার বাবা গুরুত্ব সহকারে দেখতেন এবং সকল পরিস্থিতিতে তাকে সহায়তা করতেন। এমনকি আমার পরিবারেও তাই দেখা যায়। আমার স্বামী এবং আমি, উভয়ই বাইরে কাজ করি। আমরা কেউ কারও সিদ্ধান্তকে কখনো অসম্মান করি না বরং সমর্থন করার চেষ্টা করি। আমি যে যার মতো নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করি, সেখানে বিপরীতে থাকা লোকটির কোনো আপত্তি থাকে না। ফলে সমাজে নারী এবং পুরুষের মধ্যে মানসিক সমতা এলেই নারীর জন্য সুন্দর একটি সমাজ আমরা পাব।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়নে আপনার উপজেলার কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
মমতাজ বেগম : আমাদের সমাজে নারী উন্নয়নের সবচেয়ে বড় যে বাধা তা হলো বাল্যবিবাহ। সে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছি। এছাড়াও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা এবং যেসব নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, তাদের কর্মসংস্থানের তৈরির উদ্দেশ্যে  উপজেলার বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। যেমন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন, ইজিপিপিসহ নারা দপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়ে আপনার অভিমত কি?
মমতাজ বেগম : আন্তর্জাতিক নারী দিবস অত্যন্ত বিশেষ একটি দিন। আসলে সারাবছর নানা ব্যস্ততায় আমাদের সময়গুলো পাড় হয়ে যায়। এই বিশেষ একটি দিন আমাদের বছর একদিন একটু আনন্দের বা একটু স্পেশাল অনুভূতি দেয়। যেমন সারাবছরই আমাদের জীবনযাত্রার মান সমান ভাবেই চলে, কিন্তু জন্মদিনটা আমাদের জন্য বিশেষ। নারী দিবসও আমাদের জন্য ঠিক তেমন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আপনি নারীদের জন্য কি বার্তা দিতে চান?
মমতাজ বেগম : নারীরা কখনোই দুর্বল হিসেবে জন্ম নেয় না। অশিক্ষা এবং অসচেতনতাই আমাদের দুর্বল হিসেবে তৈরি করে। ফলে আমাদের স্বশিক্ষিত এবং স্বনির্ভর হতে হবে। যদি আমরা স্বনির্ভর হই এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে শিখি, তবে কখনোই সমাজের দোহাই দিয়ে কেউ আমাদের পেছনে ধরে রাখতে পারবে না।

 


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও