নারীদেরকেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে

হাফসা আক্তার, স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০১:৩৫ পিএম, ৮ মার্চ ২০২০ রবিবার

নারীদেরকেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে নারীরা যখন প্রতিনিয়ত নিজের অধিকার দাবী করে চলেছেন বা অপেক্ষা করছে অধিকার উদ্ধারকারী কোনো ‘সুপার হিরো’র জন্য, সেখানে নিজ অধিকার ছিনিয়ে নিতে দু’ চাকায় ভর করে রাস্তায় নেমেছে ‘ফারজানা হোসেন মৌসুমী’। তিনি সকল নারীদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, অধিকার শুধু চাইলেই হয় না বরং তা লড়াইয়ের মাধ্যমে আদায় করে নিতে হয়।

‘ফারজানা মৌসুমী’ একদল নারীকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলায় গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের নারী সাইকেল আরোহীদের একমাত্র দল ‘নভেরা’। যেসব নারীরা নিয়মিত সাইকেল চালাতে, সাইকেল চালানো শিখতে আগ্রহী এবং যারা ইতোমধ্যে নিয়মিত সাইকেল চালায় তাদের নিয়ে এ দলটি গঠন করেন তিনি। দলটি শুধুমাত্র নারীদের সাইকেল চালানো নিয়েই কাজ করে না। বরং নিজেদের নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সমাজের সকলের কাছে পরিবেশের বার্তা পৌছে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ আয়োজনে উঠে এসেছে উদ্যোমী এ নারী `ফারজানা হোসেন মৌসুমী`র অধিকার আদায়ের গল্প।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নভেরা কার্যক্রম সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : যেসব নারীরা সাইক্লিং করে তাদের নিয়ে এ দলটি গঠন করা হয়েছে। আমরা প্রত্যেক মাসের নির্দিষ্ট একটা সময়ে কিছু মেয়েকে সাইকেল চালানো শিখাই। আমাদের দলে বর্তমানে প্রায় ২০ জন প্রশিক্ষক রয়েছেন। তারা নিজেদের সংসার, পড়াশোনা এবং চাকরি থেকে মাসে ৩ দিনের সময় বের করে নভেরার নতুন সদস্যদের বিনাপারিশ্রমিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। ইতোমধ্যে আমরা বেশ কিছু সাইক্লিং প্রশিক্ষণ কর্মশালা সফলভাবে করেছি। ২শ` থেকে ৩শ` নারীকে ‘নভেরা’ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। মাসে অন্তত দুই দিন নিজ নিজ সাইকেলে পরিবেশ রক্ষার বার্তা লেখা প্লেকার্ড নিয়ে `নভেরা`র সদস্যরা শহরে বিভিন্ন এলাকায় রাইড দিয়ে থাকেন। এরই সাথে বিভিন্ন এলাকায় গাছ লাগায় `নভেরা`। এরই মাধ্যমে আমরা মানুষের কাছাকাছি গিয়ে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতার বার্তা পৌছে দেই।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : এ দলটি গঠনের কথা আপনি কেন ভেবেছিলেন?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : আমাদের সমাজে মেয়েদের সাইক্লিং নিয়ে ভীষণ নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। এই ট্যাবুটিকে পাশ কাটিয়ে সমাজকে জয় করে মেয়েরা মাথা উঁচু করে সাবলীলভাবে সাইক্লিং করবে। তাদের শারীরিক জড়তা কমবে, মানসিক শক্তি ও সামর্থ্য বাড়বে। সমাজে মেয়েদের সাইক্লিং এর বিষয়টা সহজ হয়ে উঠবে, মূলত এই উদ্দেশ্যই দলটি গঠন করা। পাশাপাশি সাইকেল একটি পরিবেশবান্ধব বাহন। ফলে পরিবহন হিসেবে সাইকেল ব্যবহার করা, পরিবেশ রক্ষার বার্তা সকলের কাছে পৌছে দেয়া যায়। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন ভাবে নারীদের সাইক্লিং করতে দেখা গেলেও নারায়ণগঞ্জে নারীদের তেমন সাইক্লিং করতে দেখা যায় না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নভেরা গঠনের শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : আমি নিজে সাইক্লিং শুরু করি ২০১৪ সালে। তখন দেখতাম ছেলেরা দল বেঁধে রাস্তায় সাইক্লিং করছে। সেটা দেখে আমি ভাবলাম যে, মেয়েদের জন্য এমন একটি দল কেন নয়? পরবর্তীতে ২০১৭ সালে আমি নিজে কয়েকজনকে শিখাই। তাদের মধ্যে ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক সুমনা আপু এবং এক ছোট বোন সুপ্তি। শুরু থেকে তারাই আমাকে সহায়তা করে দলটি তৈরি করতে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : `নভেরা` নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার গল্প আমাদের বলবেন কি?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : আমরা ১০ বছর বয়সী নারী শিশু থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের সাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। তখন থেকে নারায়ণগঞ্জের সকল শ্রেণীর নারীরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছেন গৃহিনী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীরা। আমাদের সাথে এমন কিছু নারীরাও সাইকেল চালানো শিখতে আসেন যারা নিজেদের সন্তানদের সাইকেল চালাতে দেখে সাইকেল চালানো শিখতে উদ্বুদ্ধ হন। অনেকে নিজের সন্তানকে যাতে নিজে সাইকেল চালানো শিখাতে পারে সে কারণে সাইকেল চালানো শিখতে এসেছেন। এ বিষয় গুলো ব্যক্তিগতভাবে আমায় অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আমরা জানতে পারি দলটি গঠন করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সে বিষয়ে কিছু বলুন।
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : আমাদের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল, আমরা কোথায় শিখাবো? অন্যদিকে প্রশিক্ষণের জন্য সাইকেল জোগার করাও একটা জটিল বিষয় ছিল। কেননা আমার সাইকেলটা প্রশিক্ষণের জন্য কিছুটা বড়। এদিকে, মেয়েদের কেও সাইকেল ধার দিতে বা ভাড়া দিতে রাজি হতো না। সকলে ভাবতো মেয়েরা সাইকেলের খেয়াল রাখতে পারবে না, সাইকেল ভেঙ্গে ফেলবে। পরবর্তীতে আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে একটা ছোট সাইকেল কিনি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তা হলো, যে মেয়েরা শিখবে  তাদের পরিস্থিতির সাথে নিজেকে প্রস্তুত করা। যারা আমাদের সাথে সাইক্লিং শিখতে আসতো ওরা শেখার সময় মুখে মুখোশ পরে নিত, যাতে পরিচিত কেও দেখে না ফেলে। মানুষ এখনো মেয়েদের সাইক্লিং করতে দেখলে টিটকিরি দিত এবং দেয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন কিভাবে?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : সামাজিক যেই গড়পড়তা মূল্যবোধ বা ধ্যানধারণা গুলো মানুষ এতকাল ধরে লালন করে আসছে। সেসব যে খুব দ্রæতই বদলিয়ে যাবে,এরকমটা মনে করার তো কোনো কারণ নেই। তাই প্রতিক‚লতা থাকবেই, সেই বিষয়টিকে মাথায় রেখে ঠিকঠাক ভাবে  নিজেদের কাজগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করি কেবল। চলার পথে ধুলোবালি-রোদ-বৃষ্টি এই সমস্ত তো থাকেই, তবুও দিন শেষে আমরা সকলে আমাদের গন্তব্যের দিকেই কিন্তু এগুতে থাকি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : `নভেরা` নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : আমরা ইতোমধ্যে কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে কাজ করছি। আমরা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাইক্লিং প্রশিক্ষণ দিব। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে শহরের মেয়েরা স্বল্প দূরত্বের জন্য নিয়মিত সাইকেলে যাতায়াত করে। এতে করে গণপরিবহনে নারীদের যে হয়রানির শিকার হতে হয়, তা কম হবে। এবং নিয়মিত সাইক্লিং নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়ে আপনার অভিমত কি?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : বছর ঘুরে নারী দিবস এসে আমাদের আরো একবার মনে করিয়ে দিয়ে যায় যে, নিজেদের (নারীদের) অধিকার কিংবা সম্মানের সাথে স্বাধীন ভাবে জীবন যাপনের প্রশ্নে আমরা এখনো কতটা পিছিয়ে আছি। অধিকার আদায় কেবল নয়,বরং নিজেদের দায়িত্ব এবং নিজেদের করনীয় কাজগুলো সম্পর্কে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে। আমাদের প্রত্যেককে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আর্থিকভাবে সাবলম্বী হতে হবে। নিজে অন্যের ওপর সামাজিক বা অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল থেকে, নিজের অধিকার আদায় করতে চাওয়াটা বেশ বোকামী বলে মনে হয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী দিবস উপলক্ষে `নভেরা`র পরিকল্পনা কি?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : সেদিন নারীদের অধিকার এবং তা আদায়ে নারীদের কণনীয় সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে একটি র‌্যালির আয়োজন করার পরিকল্পনা করছি। `নভেরা` পুরনো এবং নতুন সদস্যরা সংঘবদ্ধভাবে এ র‌্যালিতে যোগদান করবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বিশেষ এ দিনটি উপলক্ষে নারীদের জন্য আপনি কি বার্তা দিবেন?
ফারজানা হোসেন মৌসুমী : আমি শুধু বলতে চাই, নারীদের জন্য বাধা আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে সেই বাধা মোকাবিলা করে আমাদের নিজেদেরকেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে। অধিকার চাইলে কেও দিবে না।

এছাড়াও `নভেরা` নিয়ে একটি তার বিশেষ পরিকল্পনার বলেন ফারজানা মৌসুমী। তিনি বলেন, `আমি এমন একটি দিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন নভেরার একশতর বেশি সদস্য একসাথে রাস্তায় সাইকেল চালাবে। তার সামনে অন্তত ১০ জন মেয়ে শাড়ি পরে সাইকেল চালাবে। যা আমাদের সমাজে এই বার্তা পৌছে দিবে যে, আমরা (নারী) নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছি এবং নিজেদের অধিকার আদায় করতে শিখছি।`


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও