করোনায় গার্মেন্টের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভয়াবহতায় উদ্বিগ্ন আসলাম সানি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:০৭ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০২০ বৃহস্পতিবার

করোনায় গার্মেন্টের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভয়াবহতায় উদ্বিগ্ন আসলাম সানি

গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর সাবেক সহ সভাপতি এ এইচ আসলাম সানি বলেছেন, প্রতিটি মানুষ আজ করোনা ভাইরাসের ভয়ে ঘরে বসে আছে। বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই না উন্নত দেশগুলোতে আজ মৃত্যুর মিছিল। ব্যবসা বাণিজ্য দোকানপাট সব বন্ধ (খাবার ও ওষুদের দোকান ব্যতিত)। বাংলাদেশ আজ এক মাসের বেশি সময় ধরে সমস্ত কিছু বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে ১৬ কোটি মানুষের ভবিষ্যত নিয়ে সরকারের সঙ্গে সঙ্গে সকল পেশার মানুষ উদ্বিগ্ন। আমি গার্মেন্ট শিল্পের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে যেমনভাবে চিন্তিত, আমার ৩০ বছরের কষ্টের সমস্ত উপার্জন রি ইনভেস্ট করে যখন ১৫ হাজার শ্রমিক এবং এক হাজার শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করেছি। তাদের জন্য ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন।’

২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার নিউজ নারায়ণগঞ্জকে এসব কথা বলেন আসলাম সানি। সাম্প্রতিক করোনা ইস্যুতে এসব বক্তব্য আসে আসলাম সানি হতে।

তিনি নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এই ৩০ বছর যা উপার্জন করেছি তার ৯৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে তিলে তিলে গড়া হাজার কোটি টাকার শিল্প আজ শুধুই অট্টালিকা ছাড়া কিছুই না। শুধু আমিই না আমার মতো প্রথম প্রজন্মের গার্মেন্টস শিল্প একইভাবে বিকশিত হয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত সকলের আত্মত্যাগেই আজ বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় রপ্তানি কারক দেশ। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সব সময় অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়েছে আমাদের। চীন ও ভারতের ব্যবসায়ীদের যেমন কমপ্লায়েন্সের যাতাকলে পড়তে হয় না। তারপরেও এই ৪০ বছরে অনেক প্রতিকূলতায় পার হয়ে গার্মেন্ট শিল্প বিকশিত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে ১৯৯৬ জিএসসি সমস্যা, ১৯৯৮ বন্যা, ২০০১ ডিউটি কোটা ফ্রি, ২০০৮ ও ২০০৯ বিশ্বমন্দা, ২০১১-১৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় যখন এক ট্রাক শিপমেন্ট এক লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তারপরেও আমরা ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছি।’

আসলাম সানি বলেন, ‘২০১৪ সালে অবরোধের সময়ে ৪০ শতাংশের বেশি এয়ার শিপমেন্ট করে আমাদের বায়ারদের অনটাইম নিশ্চিত রেখিছি। এসব প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের শিল্পের মালিকেরা কোনো প্রণোদনা পায়নি বা প্রণোদনা চায় না (নতুন বাজার তৈরীর প্রনোদনা ছাড়া)। সবারই একই উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়ানো। সবাই বড় বড় ফ্যাক্টরি করেছে। ১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করে এক একটি কারখানায়। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর মেডি ইন বাংলাদেশ যখন রক্তমাখা শার্ট ছিল সমস্ত বিশ্বের কাছে, যে ধ্বংসস্তুূপ থেকে কোনো প্রণোদনা ছাড়া তিন বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করে বায়ারদের সন্তুষ্টির জন্য ফায়ার অ্যান্ড ইলেকট্রিক সেফটি বিল্ডিং আজ বিশ্বের কাছে উদহারণ।’

ক্রোনি গ্রুপের এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম সানি আরো বলেন, ‘খুব মজার কথা হলো কোনো বিদেশি বায়ার কিংবা সরকার আমাদের এই বিনিয়োগ সামিল হয়নি। এখানে উল্লেখ করতে চাই শুধু ফায়ার সেফটি ইকুপমেন্ট শুল্ক ৫ শতাংশ রাখতে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। এখন প্রশ্ন এই ৪০ বছরে এতগুলো বিপর্যয় কিভাবে সামাল দিল গার্মেন্ট শিল্পের মালিকরা। আমি কারও নাম উল্লেখ না করে বলতে চাই যাদের হাত ধরে এদেশে গার্মেন্ট শিল্প গড়ে উঠেছিল, তাদের আর ৯০ শতাংশ ব্যক্তিগতভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে কেন মানুষ এই ব্যবসা করে ? কারণ এই ব্যবা থেকে বের হওয়ার আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেই।’

তিনি বলেন, ‘আজ যখন বলছি তখন কতো আর্থিক লসের মাধ্যমে এই শিল্পের উত্তোরন হবে। তা কারও জানা নেই। আমরা শুধু জেনেছি সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এই সাথে শ্রমিক কর্মচারীদের তিন মাসের বেতন, বিদ্যুত গ্যাস, ব্যাংকের সুদ আরো দুই বিলিয়ন পর্যন্ত লস হবে। সব মিলিয়ে ছয় বিলিয়ন ডলার লোকসান হবে। আজ কল্পনাও করতে পারছি না। ৪০ বছরে গড়ে উঠা এই শিল্পের সঙ্গে মালিক কর্মচারী শ্রমিক সবার ভবিষ্যৎ। শুধু গার্মেন্ট শিল্পের বিপর্যই নয়। এর সাথে জড়িত ব্যাংক, বিমা, হোটেল, ট্রান্সপোর্ট সব ব্যবসাই অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।’

আসলাম সানি বলেন, ‘আজ ইউরোপ আমেরিকা সমস্ত স্টোর এবং শমিংমলগুলো বন্ধ। তাদের ২ মাসের বেশী বন্ধ থাকলে পরবর্তী সিজনের চার মাস এই অবস্থা থাকবে। বিক্রি করতে পারবে না। সেই সাথে নতুন কোনো অর্ডার সাপ্লাই চেইনে নাই। একদিকে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্ডার স্টক, নতুন কোনো অর্ডার সাপ্লাই চেইনে নাই। তাইতো ৯৫ শতাংশ বায়ারের ক্যাশ ফ্লো বন্ধ হয়ে যাবে। আমার ধারণ ৪০ শতাংশ বায়ার আর্থিক সংকট কাটাইয়া উঠতে পারবে না এবং তারা তাদের দেউলিয়া ঘোষণা করে বন্ধ করে দিবে। সমস্ত সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হওয়ার জন্য ৫০ শতাংশ যুব সমাজ চাকুরী হারাবে। তারজন্য ইউরোপ আমেরিকার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্ডার কমে যাবে। একই সাথে চাহিদা কমে যাওয়া তৈরী পোষাকের চাহিদা ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

‘‘সে হিসেবে আমাদের ১৫ লাখ শ্রমিক চাকরি হারানো ঝুঁকিতে আছে। শুধু শ্রমিকই নয় বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ৫০ শতাংশ আছে যারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে গার্মেন্ট শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এই শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের কথা কেউ বলে না। তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষিত মার্চেন্ডাইজার, এবং টেক্সটাইল এবং ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার। এই ৫ লাখ শিক্ষিত যুবকদের বেতন ৫’শ ডলার থেকে ৮ হাজার ডলার। এই শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেকার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আজ যখন অনেক মালিক মহামারি পরিস্থিতিতে আইন মেনে লে অফ ঘোষণা করছে। তখন শ্রমিক নামধারী অনেক নেতা যারা কোনো দিন শ্রমিক হিসেবে কোনো কারখানায় কাজ করেননি। তারাই মালিকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রচনা করছে। অনেকে বলছে শ্রমিক ছাঁটাই বেআইনি। একটু ভেবে দেখুন একটি কারখানায় যখন তিন মাসের উৎপাদন অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। যা দুই বছরের বেতনের সমান, তাহলে মালিকের কতটাকা জমানো আছে, সেই মালিক বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে পারবেন। আইন যদি তারা সমভাবে বেআইনি বলে তাহলে মালিক হওয়া কি অপরাধ? তাহলে মালিকরা কি মানুষ না?’

আসলাম সানি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্য দেয়া ভাসণে সত্যিই বলেছেন, অন্ধকারের পরেই আলো। কিন্তু যে অন্ধকারে আজ গোটা পৃথিবী নিমর্জিত। এই উত্তরণে দরকার সব মানুষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। যাতে নতুন করে নতুনভাবে সবাই সবকিছু গড়ে তুলতে পারে।


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও