৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শুক্রবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ , ২:৫২ পূর্বাহ্ণ

বেঁচে থাকলে চঞ্চলের ইনবক্স ভরে যেত শুভ কামনায়


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:৪৪ পিএম, ৪ ডিসেম্বর ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ০৭:৩৯ পিএম, ৪ ডিসেম্বর ২০১৭ সোমবার


বেঁচে থাকলে চঞ্চলের ইনবক্স ভরে যেত শুভ কামনায়

দিদারুল ইসলাম চঞ্চল বেঁচে থাকলে ৪ ডিসেম্বর সোমবার দিনটি তার জন্য থাকতো অন্য রকম দিন। কারণ এদিন সে ভূমিষ্ট হয়েছিল এ পৃথিবীতে। বেঁচে থাকা সময়ে দিনের প্রহর রাতে শুরু হওয়ার আগেই মোবাইলের ইনবক্স ভরে শুভ কামনায়। সময় যত গড়াতো ততই ক্ষুদে বার্তার সংখ্যাও বাড়তো। দুপুরের পর গোধূলী লগ্ন আর সন্ধ্যার পর নেমে আসা আঁধারে ছোট অনুষ্ঠানে উজ্জল নক্ষত্র হয়ে থাকতো চঞ্চল। কিন্তু সে আজ নেই। তাই পরিবারে নেই জন্মদিনের কোন আমেজ। বরং এদিন অশ্রুসিক্ত নয়নে নোনা জল ফেলে পুরানো সেই স্মৃতি নাড়া দিত পরিবারের লোকজনদের। সর্বদা গায়ে পিটে থাকা ছোট ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেলের কষ্টটা একটু বেশী।

বেঁচে থাকলে ৪ ডিসেম্বর চঞ্চল পা দিত ২৫ বছরে। আজ এই দিনে হয়তো অনেকেই তাকে শুভেচ্ছা জানাত। হয়তো তার মোবাইলের ইনবক্স ভরে যেত তার শুভ কামনায়। নিজের জন্মদিনে চঞ্চলতা একটু বেশিই থাকত তার।

তার ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেল জানান,‘ওকে পাবো না আর কোন দিন আমরা। খুন করে দিল তার স্বপ্নভরা জীবনটাকে। নিরব, নিস্তব্দ এখন ওর ঘরটা আর কোন দিন ফিরে পাবে না প্রাণচাঞ্চল্য। সুমিষ্ট বাশির আওয়াজ শোনা যাবে না এই ঘর থেকে নির্জন রাতে। তার পোশাক গুলো এখন সযত্নে রাখা আলমারিতে। ভাই তো কোনদিন আর ফিরে আসবেনা আমাদের মাঝে। কিন্তু সোমবার ছিল আমার প্রাণ প্রিয় ভাইটির জন্মদিন। জন্মদিন সবার কাছেই আনন্দের কিন্তু ওকে ছাড়া আমাদের কাছে তা শুধুই কষ্টের ও বেদনার।

এর আগের জন্মদিনে পমেল ফেসবুকে আপলোড করেছে আবেগের একটি ম্যাসেজ। এতে পমেল উল্লেখ করেন, ‘ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল ও আমি ছিলাম মানিকজোড়। খাওয়া, ঘুম,স্কুলে যাওয়া, পড়া, খেলাধুলা, বেড়ানো সব একসাথেই হত আমাদের। দুষ্টুমিও হত একসাথে । নাদুসনুদুস চঞ্চল ছিল সবার প্রিয়। সবাই বলত, নামে যেমন চঞ্চল কাজেও তেমন চঞ্চল। একবার খুব ছোটবেলায় দুষ্টুমি করছিলাম। আব্বুর বিদেশ থেকে আনা বিশাল লাগেজের ভিতর আমি ঢুকে ডালা বন্ধ করতেই তা লক হয়ে গেল। বাইরে থেকে চঞ্চল অনেক চেষ্টা করেও লক খুলতে পারছিলনা। ভিতর থেকে তখন তো আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। চঞ্চল বুদ্ধি করে নিচে গিয়ে সবাইকে জানালে তখন সবাই এসে লক খুলে আমাকে বের করে। আরেকটু হলে আমি দম বন্ধ হয়ে মারাই যেতাম। আরেকবার ঘরের মধ্যে আমরা দুজন লুকোচুরি খেলছিলাম। একজন লুকিয়ে থাকবে অন্যজন তাকে খুজে বের করবে। তো চঞ্চল কোথায় যেন লুকালো। আমি আর খুজে পাচ্ছিনা। আমি আর ওর কথা ভুলে গেলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসলে মা চঞ্চলকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেলোন। চিন্তার বিষয়! এদিকে সবাই চঞ্চলকে খুঁজতে লাগল। আমিও। সবাই ভাবছিল বাইরে খেলতে গিয়ে আবার হারিয়ে গেল নাকি। জলদি মাইকিং এর ব্যবস্থা করা হতে লাগল। সকলের বাইরে খুজোখুঁজি। এদিকে হঠাৎ করেই ঘর থেকেই চঞ্চলকে বের হয়ে আসতে দেখলাম। একি আশ্চর্য! কোথায় ছিল? ও জানাল, লুকোচুরি খেলায় ওয়্যারড্রোবের সাইট ড্রয়ারের ভিতর ও লুকিয়ে ছিল। তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিল! এমন কতনা দুষ্টুমি, কতনা ঘটনা, কতনা স্মৃতি ওকে ঘিরে। তার বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবেনা.. চঞ্চল যে আমাদের হৃদয়েরই অংশ। আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে আজ প্রায় আড়াইবছর হল না ফেরার দেশে আমার প্রিয় ভাইটি। কতদিন হল দেখিনা প্রিয়ভাইটির সেই প্রিয়মুখ খানি। কিন্তু চঞ্চল তো এ পৃথিবী থেকে যেতে চায়নি। তাকে বাধ্য করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে এ পৃথিবী ত্যাগ করতে। আর আজ হল আমার সেই প্রিয় ভাইটির জন্মদিন। জন্মদিন মানেই আনন্দ, হুল্লোড়, শুভেচ্ছায় ভেসে যাওয়া কত কি? কিন্তু সবসময়ই তা নয় বরং কিছু জন্মদিন রঙিন হয়না তার রং হয় শুধুই বেদনার। আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাইটির কবর জিয়ারত করলাম মন ভরে । আমি শক্ত মানুষ কিন্তু আজ ভাইটির কবরের সামনে গিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলামনা। কষ্টটা যে চাপা ছিল অনেক আগে থেকেই। " একি, আজকে আমার জন্মদিন আর তুই কি কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিস পমেল"। হয়ত তখন ও ওপার থেকে বলছিল। তোকে ছাড়া এমন জন্মদিন আমরা চাইনিরে ভাই.. তুই যেখানেই থাকিস ভাল থাকিস...শুভ জন্মদিন ভাইয়া.... ’

নিহত দিদারুল ইসলাম চঞ্চল নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের অনার্স বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়সেই চঞ্চল একজন সফল নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ ঐকিক থিয়েটারের একজন সক্রিয় সদস্যও ছিলেন। ক্ষনজন্মা এই নাট্যকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত-শত মানুষের হাজার স্বপ্ন, হাড় তরঙ্গ এবং বক্তাবলী নামে ৩টি নাটক রচনা করেছেন। ২০১২ সালের ১৩ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর উপলক্ষে ঢাকা শিল্প কলা একাডেমিতে যে ১০০টি মুক্তিযুদ্ধের নাটক মঞ্চস্থ হয় তার মধ্যে চঞ্চলের রচিত ‘বক্তাবলী’ নাটকটিও মঞ্চস্থ হয়। ওই নাটকের জন্য চঞ্চল প্রশংসিত হন এবং নিদর্শন হিসেবে একটি ক্রেষ্ট ও ৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়।   কি কারণে কেন তাঁর ছেলেকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে এ প্রশ্নটির উত্তর আজো খুঁজে ফিরছেন চঞ্চলের মা রুবিনা বেগমের। আদরের ধন বুকের মানিকের ঘাতকদের বিচার কি দেখে যেতে পারবেন এমন প্রশ্ন মা রুবিনা বেগমের। ক্ষোভ আর হতাশায় ভারাক্রান্ত তাঁর মন।   নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলএনএ রোডের আওলাদ হোসেন ও মা খালেদা আক্তার রুবিনার ছেলে দিদারুল ইসলাম চঞ্চল। ১৯৯২ সালের ৪ ডিসেম্বর চঞ্চল জন্মগ্রহন করে। ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে চঞ্চল ২য়।

নিহত দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের বড় ভাই পমেল বলেন, আমার ভাই একজন নাট্যকার ছিলো। সে নাটক করতো। নাটক লিখতো কখন কারো সাথে তর্ক বিতর্ক করতে দেখিনি। এমনকি তার নামে কোন অভিযোগ নাই। এলাকায় এমন কেউ নেই যে তাকে ভালোবাসতো না। কেন আমার ভাইয়ের এমন নির্মম পরিনতি হবে। দ্রুত আমার ভাইয়ের হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করে আপরাধীদের ফাঁসি দেয়া হোক।

নিহতের পরিবারের অভিযোগে জানা গেছে, ২০১২ সালের ১৭ জুলাই দিনগত গভীর রাতে নিখোঁজ হন তরুণ নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চল। ১৮ জুলাই শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশ উদ্ধার করা হলেও ১৯ জুলাই শনাক্ত করে নিহত চঞ্চলের পরিবার।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সাহিত্য-সংস্কৃতি -এর সর্বশেষ