rabbhaban

মাসলম্যান ও ভূমিদস্যুদের কবলে রূপগঞ্জ


অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশিত: ০৮:১২ পিএম, ২৭ জুন ২০১৮, বুধবার
মাসলম্যান ও ভূমিদস্যুদের কবলে রূপগঞ্জ

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম। বৃটিশ থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, কিন্তু শোষন ও নির্যাতনের পরিবর্তন হয় নাই, পরিবর্তন হয়েছে পদ্ধতি। লুটেরা জনগণের সম্পদ লুন্ঠনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাদের নিজস্ব পন্থায় যার গতি পূর্বের চেয়ে কম নহে বরং বেশী। বৃটিশ এ দেশকে লুট করার জন্য এসেছিল, সফল হয়েছে, লুটকে গতিশীল করতে দেশী যে দালালদের সহযোগীতা নিয়েছিল তাদেরও ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু ছিন্নমূল হয়ে রয়েছে এ দেশের সাধারণ জনগণ যারা দিন দিন গরীব হচ্ছে এবং নুন আনতে পান্তা ফুড়ানো অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় অভাবে নাই এ দেশের কয়টি পরিবার রয়েছে? এ লুটেরা ও তাদের তাবেদার ছাড়া। একটু গোড়ার দিকে তাকালে লুটের এ নির্মম চিত্র সহজেই অনুমান করা যায়। বাংলার সম্পদ লুন্ঠনে ইংরেজরা একা ছিল না। তাদের পাশে ছিল এ দেশীয় দালাল, গোমস্তা ও বেনিয়া গোষ্টি। Macalay: Essays on Lord clive (পৃষ্ঠা-৬৩) বইতে লর্ড মেকেল লিখেছেন যে, “কোম্পানীর কর্মচারীরা তাদের প্রভূ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর জন্য নয়, নিজেদের জন্য, প্রায় সমগ্র অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ওপর একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। দেশী লোকদেরকে তারা অত্যন্ত কম দামে উৎপন্ন দ্রব্য বেঁচতে এবং অন্যদিকে খুবই চড়া দামে বিলাতী পণ্য কিনতে বাধ্য করতো। কোম্পানী তাদের অধীনে একদল দেশী কর্মচারী নিয়োগ করতো। এই দেশীয় কর্মচারীরা যে এলাকায় যেতো, সে এলাকা ছাড়খাড় করে দিতো। সেখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতো। ব্রিটিশ কোম্পানীর প্রতিটি কর্মচারী ছিল তার উচ্চপদস্থ (ইংরেজ) মনিবের শক্তিতে বলিয়ান। আর এই মনিবদের প্রত্যেকের শক্তির উৎস ছিল খোদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। (তাদের ব্যাপক লুন্ঠন ও শোষণের ফলে) শীঘ্রই কলকাতায় বিপুল ধন-সম্পদ স্তূপিকৃত হলো। সেই সাথে তিন কোটি মানুষ দুর্দশার শেষ ধাপে এসে দাঁড়ালো। বাংলার মানুষ শোষণ ও উৎপীড়ন সহ্য করতে অভ্যস্থ একথা ঠিক, কিন্তু এ ধরনের (ভয়ংকর) শোষণ ও উৎপীড়ন তারাও কোনদিন দেখেনি। (সূত্রঃ সুপ্রকাশ রায় প্রণীত ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পৃঃ ১০ )”

ঘুষের প্রচলন যে বৃটিশ আমল থেকেই শুরু হয়েছিল তা ১৭৭৩ সনে Fourth Parliamentary Report (পৃষ্ঠা ৫৩৫) এ উল্লেখিত মন্তব্য থেকে প্রমান পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, “উৎকোচ নামক দুর্নীতি এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে আমদানী করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীরা ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত মাত্র দশ বছরে ষাট লাখ পাউন্ড আত্মসাৎ করেছিল।”

“ব্যবসায়ের নামে ইংরেজ বণিক কোম্পানীর এই দস্যুতার মুখে বহু শিল্প কারিগর উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য নিজেদের বুড়ো আঙ্গুল কেটে ফেলে অসহনীয় উৎপীড়ন থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। অনেকে বাড়ী-ঘর ছেড়ে বন-জঙ্গলে পালিয়ে যায়। ১৭৫৮ থেকে ১৭৬৩ এই ছয় বছরে কৃষকদের সাথে কারিগরদের একটি অংশ স্থায়ী বেকারে পরিণত হয়। ইংরেজ লেখক রেজিনাল্ড রেনল্ডস উল্লেখ করেছেন, ‘‘ঐ সময়ের মধ্যে ঢাকার বিশ্বখ্যাত মসলিনের এক তৃতীয়াংশ কারিগর ইংরেজ বণিকদের শোষণ-পীড়নে অস্থির হয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে গিছেছিল। (সূত্র: রেজিনাল্ড রেনল্ডাস প্রনীত সাহিবস ইন ইন্ডিয়া, পৃঃ ৫৪)।”

দেশীয় দালাল সৃষ্টির মাধ্যমে বৃটিশ পাক-ভারত উপ-মহাদেশ সহ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলি শাসন শোষনের মাধ্যমে লুণ্ঠন করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে। পদলেহী হিসাবে ব্যবহারের জন্য বৃটিশরা বিভিন্ন উপাদি যেমন স্যার, খানবাহাদুর, রায় বাহাদুর প্রভৃতি উপাদি স্থানীয় অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে বিতরণ করতো যাতে অভিজাত শ্রেণীকে পোষ মানিয়ে নিরীহ জনগণ শাসন শোষণ করা যায়। যাদেরকে আমরা একনামে সম্মান করি তাদের ইতিহাসও খুবই বির্তকিত যা জানতে পারলে তাদের প্রতি সম্মান বোধটুকু থাকে না। বিচারপতিদের মধ্যেও বৃটিশরা তাদের দালাল বা তাবেদার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল, যদিও এখনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

উক্ত বিষয়ে আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা প্রণীত “বজ্রকলম” বইতে (পৃষ্ঠা ১৩৫) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে মন্তব্য করে লিখেন যে, “ভারতের হিন্দু-মুসলমান যখন বৃটিশের মার খাচ্ছে, গুলি খাচ্ছে ও ফাঁসিতে যাচ্ছে তখন বৃটিশ-বিরোধী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন ভূমিকাই ছিল না তাঁর। যখন বিচারপতিদের কাঁধে বন্দুক রেখে বিচারের প্রহসনে বৃটিশ সর্বনাশ করত ভারতীয়দের, সেই সময় আশুতোষকেও করা হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। সুতরাং তাঁর যোগ্যতা ও বিশ্বাসভাজনতার প্রতি বৃটিশের ছিল অগাধ বিশ্বাস। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরও হয়েছিলেন চারবার। ‘রাঁয়চাদ প্রেমচাঁদ’ পুরষ্কারও পেয়েছিলেন তিনি। লর্ড লিটন তাঁকে দিয়েছিলেন ‘টাইগার অব বেঙ্গল’ উপাধি। তাঁর ধারাবাহিক কর্ম, যোগ্যতা ও বিচারকার্যে খুশী হয়ে সরকার তাঁকেও দিয়েছিল ‘স্যার’ উপাধি।”

উক্ত বইতে ভারতে ধনীক শ্রেণী কর্তৃক বৃটিশদের মনরঞ্জনের একটি চিত্র ফুটে উঠে। উক্ত লেখক আরো লিখেছেন যে, “ঐ সমস্ত রাজা মহারাজা বাবু ও জমিদার ধনীরা প্রকাশ্যে বেশ্যাখানা যেতে দ্বিধাবোধ তো করতেনই না, বরং প্রতিযোগিতা করে বাহাদুরি দেখাতেন তাঁরা। সেই সময় নাচে গানে পটু বেশ্যাদের একটা সম্মানীয় নাম ছিল ‘বাঈজী’। ঐ সুন্দরী বেশ্যা বাঈজীর মধ্যে যারা ছিল খুব খ্যাতনামা তাদের নাম নিকি, সুপন, বকনাপিয়ারী, হিঙ্গুল প্রভৃতি। ঐ বাবু ও জমিদারেরা এদের ভাড়া করে আনতেন। নাচ, গান, বাজনা আর খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে বাজী পোড়ানো এবং আরও কুৎসিত আমোদ প্রমোদের উৎসব চলতো ঢালাওভাবে। বাড়ির এই উৎসবে ইংরেজ (বৃটিশ) মনিবদের নিমন্ত্রন করা হোত (সূত্র: বজ্রকলম পৃষ্ঠা-১৬৫)।”

বৃটিশদের “সাহেব” বানিয়েছে এদেশের দালালরা যারা ছিল ধনী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তী পর্যায়ে ভারত দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। কিন্তু এখানে দালাল শ্রেণীরাই সরকারী আধা সরকারী সব সেক্টরকে লুটে খাচ্ছে। ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় এরা কোন শ্রেণীভুক্ত হবে তা জানি না, তবে এখন দালাল না বলে সরকারী দলীয় লোক হিসাবে পরিচয় দিতে তারা বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

বলা হচ্ছে যে, দেশে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশ মধ্য আয়ের রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে, কিন্তু এখনো দেখা যাচ্ছে যে, জাকাতের টাকা আনতে যেয়ে পদ দলিত হয়ে মানুষের মৃত্যু, বেকারত্বের কারণে নৌকায় বিদেশে পাড়ি দেয়ার সময় সাগরে বাংলাদেশীর মৃত্যু, কাঙ্গালী ভোজে অংশ গ্রহণ করতে যেয়েও গরীব মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

সরকার একদিকে বলছে যে, ফসলী জমি নষ্ঠ করা যাবে না, পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না। অথচ ভূমিদস্যুদের কারণে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, জমি হারাচ্ছে কৃষক সমাজ। বৃটিশের মতই এলাকা এলাকায় দালাল শ্রেণী করে নদীতে ড্রেজার লাগিয়ে জোরপূর্বক বালি দ্বারা কৃষি ফসলী জমি ভরাট করছে আবাসন প্রকল্পের নামে। অথচ আবাসন প্রকল্প করার জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে কোন ছাড় পত্র গ্রহণ করে না। ভূমিদস্যুরা কৃষকদের নিকট থেকে জমি ক্রয় করে না, এক অথবা দেড় বৎসরের জন্য ভাড়া নিয়ে আবাসন প্রকল্পের নামে সাইনবোর্ড স্থাপন করে বালু ভরাট শুরু করে। অথচ এ দুবৃত্তায়ন বন্ধ করার দায়িত্ব যাদের (অর্থাৎ স্থানীয় জন প্রতিনিধি পরিবেশ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন প্রভৃতি) তারা ভূমি দস্যুদের অর্থিক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে নিরব দর্শকে ভূমিকা পালন করছে, অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পরিবেশ, ফসলী জিম ও কৃষক, জমির মালিক প্রমুখ।

২৭/৬/২০১৮ ইং তারিখে জাতীয় পত্রিকান্তরে প্রকাশ “নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে রূপগঞ্জে কৃষিজমি কমেছে ২ হাজার ১৬০ হেক্টর (আড়াই একরে এক হেক্টর)। ২০০৮ সালেও এলাকায় কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৬১০ হেক্টর। এখন আছে ১১ হাজার ৪৫০ হেক্টর। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কৃষিজমি ও জলাশয় কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বর্গাচাষি ও জেলেরা। তাঁরা বেকার হয়ে পড়ছেন। অন্যের সহায়তা এবং দিনমজুরের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন অনেকে।’’

রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ তাজুল ইসলামের বক্তব্য মতে, ১০ বছর আগে রূপগঞ্জে কৃষক পরিবার ছিল ৪৪হাজার ৬৪২টি। এখন ২২ হাজার ১১৬টি।

সমীক্ষায় দেখা যায় যে, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রাজউকের পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের জন্য রূপগঞ্জে দেড় হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর এখানে জমি বেচাকেনা বেড়ে যায়। ফলে প্রতিবছরই কৃষিজমি কমছে। কৃষিজমির মতো রূপগঞ্জে মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণও অস্বাভাবিক পরিমাণে কমছে। ভরাট হচ্ছে খালবিল, গড়ে ইঠছে আবাসন প্রকল্প। ২০০৮ সালে পুকুর ও দিঘি ছিল ১ হাজার ৪২৪টি। এখন রয়েছে ৯০০টি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর চন্দ্র বসাকের বক্তব্য মতে, মুক্ত জলাশয় কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক কারণেই প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া মাছের উৎপাদন কমে গেছে। গত ১০ বছরে বেকার হয়েছে ৫৫৪ জেলে।” এ মর্মে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে রূপগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান বলেছেন যে, “কৃষি ও জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে আবাসন কোম্পানীগুলোর কারণে। তারা ম্যাসেলম্যান পুষে। একটি জমির পাঁচজন অংশীদারের একজনকে কিছু টাকা দিয়ে পূরো জমি দখল করে নিচ্ছে অনেক কোম্পানী। তাদের শক্তি ও টাকার কাছে জনপ্রতিনিধিরাও অসহায়” (সূত্র: জাতীয় পত্রিকা ২৭/৬/২০১৮) এই ম্যাসেলম্যানরাই এখন দালালের ভূমিকায় অবর্তীন হয়ে লুটেরা ভূমিদস্যুদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আর সরকারী দলের লোক ছাড়া এ দেশে ম্যাসেলম্যান হওয়া যায় না। পুলিশ যাকে সালাম দেয় সেই ম্যাসেনম্যান এবং এ জন্যই সরকারী দলের লোক হওয়া চাই।

বর্তমানে আমাদের দেশে লুট হচ্ছে ব্যাংক, লুট হচ্ছে খাল বিল, নদী নালা ও ফসলী জমি, লুট হচ্ছে মানুষের অধিকার, ফলে এ অসহায়ত্বের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জাতীয় চেতনার উম্মেশ হউক, বিকশিত হউক স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা।


আপনার মন্তব্য লিখুন:
rabbhaban
আজকের সবখবর