rabbhaban

পর্যটন পিপাসুদের জন্য নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা প্রয়োজন


রণজিৎ মোদক | প্রকাশিত: ০৮:১৬ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
পর্যটন পিপাসুদের জন্য নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা প্রয়োজন

মানুষ সৌন্দর্য পিপাসু। রূপের পূজারী। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। আদিবাসীরা এখনও বন-পাহাড় এলাকাকে বসবাসের স্থান হিসেবে বেছে নিয়ে জীবনযাপন করে আসছে। প্রকৃতির সাথে নিজেদেরকে মিলিয়ে নিচ্ছে, তারা যেন প্রকৃতির সন্তান।

নগরায়নের এ যুগে বিশাল বিশাল অট্টালিকায় মানুষ বাস করছে। ঘিঞ্জি পরিবেশে তাদের যেন কারাগারে বসবাস। বরং কারাগারের সামনে মাঠ বা ফাঁকা জায়গা থাকে। “ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায়, দারুণ মর্ম ব্যাথা” উত্তম কুমার অভিনীত ‘শাপ মোচন’ সিনেমার গানটি অনেকেই শুনেছেন। মানুষ কর্মের তাগিদে হোক বা নিরাপত্তার কারণেই হোক বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। আত্মীয় পরিজন সুদূর গাঁ গেরামে ফেলে নগর জীবনযাপন করছেন। মানুষ একটু অবকাশের জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে।

ঈদ-পূজা পার্বণে তাইতো ঘরমুখো মানুষের ঢল লক্ষ্য করা যায়। মানুষ নাড়ীর টানে গ্রামে স্বজনদের সান্নিধ্য পেতে অনেক কষ্টকে বরণ করে হলেও গ্রামের টানে ছুটে যায়। কথায় আছে, মানুষের সৃষ্ট শহর আর ঈশ্বরের সৃষ্টি গ্রাম। এই ৬৮ হাজার গ্রাম নিয়েই আমাদের বাংলাদেশ। সুজলা-সুফলা, শস্য শ্যামলা আমাদের এ দেশ। তাইতো কবি বলেছেন, “বিশ্ব কবির সোনার বাংলা নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপনী বাংলা রূপের যে তার নাইকো শেষ।” কোথাও সুউচ্চ পাহাড়, কোথাও নদী নালা ঝর্ণার কলকল শব্দ, কোথাও সমতল শস্য শ্যামল সবুজ প্রান্তর, মাঝে মাঝে গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রাম। এই এই গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রামের মানুষগুলোই কাজের ফাঁকেই বন-বাদাড়ে নিজেদেরকে মিলিয়ে নেয়। ভোগ করে প্রকৃতির অজশ্র সৌন্দর্য। এই রূপ সৌন্দর্যের কারণেই অতীতে বিদেশী পর্যটকেরা এসেছেন এ দেশে।

বিশ্ব পরিব্রাজক ইবনে বতুতার বর্ণনায় আমরা অনেক কিছুই জানতে পারি। বর্তমান দেশ শিল্প সমৃদ্ধি ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নত হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ দেশ-বিদেশে কাজ করছেন। তারা আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থ ভাণ্ডারে বৈদেশিক মুদ্রার যোগান দিচ্ছেন। এটা কম কথা নয়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাপান আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে রয়েছে। বিশাল জনবহুল রাষ্ট্র চীন বিশ্বের উন্নত অর্থনৈতিক দেশগুলোর সাথে শিল্প ক্ষেত্রে টক্কর দিয়ে বিভিন্ন দেশের বাজার দখল করে নিচ্ছে। এতো গেল শ্রম শিল্পের কথা। পর্যটক শিল্প নগরী সিঙ্গাপুর এর কথা যদি বলি তারা এক সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। বিশ্বের ভ্রমণ প্রিয় মানুষ নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড পরিভ্রমন করছে। এতে করে লাভবান হচ্ছে ঐসব দেশের সাধারণ মানুষ ও সরকার। তবে আমাদের এত কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা পিছিয়ে কেন? এ প্রশ্ন আসতেই পারে!!

আমাদের দেশের এক শ্রেণীর মাথা ভারী বুদ্ধিদাতাদের কারণে অতীতে যেমন পিছিয়েছি। তার প্রমাণ ব্যাঙ ও সামুদ্রিক কাঁকড়া রফতানী করে আমরা পর্যটক হারিয়েছি। এরশাদ আমলের এ ঘটনার কথা বলছিলাম কাঁকড়া শূণ্যতার কারণে সমুদ্রের পানিতে এক জাতের পানি পোকা বৃদ্ধি পায়। সেই সব পানি পোকাড় কামড়ে পর্যটক সংখ্যা হ্রাস পায়। এতে আমরা বৈদেশিক আয় থেকে বঞ্চিত হই। পরবর্তীতে ১ শত ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সমুদ্রের পানি পরিষ্কার করা হয়। একশত কোটি টাকার কাঁকড়া আমদানি করে। আরও ২৫ কোটি টাকা সরকারকে অধিক গচ্ছা দিতে হয়েছিল। বিমান বন্দরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফুল গাছ লাগানো হয়। দুর্ভাগ্য ফুল গাছগুলোর। বিমান  উঠা-নামার সময় ঝড়ো বাতাসে দশ কোটি টাকার গাছের ফুল আর গাছের পাতা ছিন্ন পাতা মর্মরে ঝরে পরে। এসব কথাগুলো কল্পকাহিনীর মতোই মনে হচ্ছে। আসলে কল্প কাহিনী নয় বাস্তব সত্য।

গোলায় চাল থাকতে অথবা পকেটে মহর থাকতে যারা না খেয়ে থাকে তাদের কথাই বলছিলাম। “সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি, এমন দেশটি খুঁজে পাবে না কো তুমি” কবির কবিতার সাথে একমত পোষণ করেই বলছি। ষড়ঋতু বেষ্টিত সৌন্দর্যে রাণী বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, রয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপও হতে পারে পর্যটকদের আকর্ষণের দৃষ্টিনন্দ ভূমি। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। সাগর তীরে গেলে যে মানুষের হৃদয় আকাশের ন্যায় উদার হয়, তা সাগর তীরে না গেলে কেউ অনুভব করবে না।

দুনিয়ার যেসব দেশ পর্যটনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে বাংলাদেশ তার মধ্যে এসে যায়। পর্যটন বান্ধব পরিবেশের অভাব দীনতার জন্য দায়ী। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার মত মূলধন বা অবস্থান থাকা সত্ত্বেও দেশ পিছিয়ে থাকছে নানা সীমাবদ্ধতার কারণ। দেশের হাওর বিলঝিল এলাকা পর্যটন আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম সুন্দরবন আমাদের অহংকারের অংশ। এ বন উজার হতে চলেছে। এ বনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সুনাম বিশ্বজুড়ে। চিতল হরিণের তুলনা সে নিজেই। কুয়াকাটা সমদ্র সৈকতের সূর্যাদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য সবাইকে মুগ্ধ করে। পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পর্যটনের স্বর্গ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবী রাখে। হযরত শাহ জালালের পবিত্র দুটি একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। পাহাড়টিলায় নয়নাভিরাম পরিবেশে মুগ্ধ হতেহ বাধ্য যেকোন পর্যটক।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। পর্যটনের বিকাশে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হলেও নয় বছরে পর্যটনকেন্দ্রিক কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। গত বছর বিশ্বের মোট জিডিপির ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত থেকে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এ খাতের অবদান ছিল ২ হাজার ৯৩৯ বিলিয়ন ডলার যা অর্থনীতির ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। পর্যটনে কর্মসংস্থান ছিল ১৭৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন, যা মোট কর্মসংস্থানের ৯ দশমিক ৩ ভাগ। গত পাঁচ বছরে প্রতি পাঁচটি নতুন চাকরির একটি সৃষ্টি হয়েছে পর্যটন খাতে। ২০১৭ সালে বৈশ্বিক জিডিপির ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে পর্যটন থেকে, যেখানে বাংলাদেশে এ খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। এ অবস্থা দেশের জন্য সম্মানজনক নয়, দুঃখজনকও বটে। দেশে ঐতিহাসিক স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার পুনঃসংস্কার সহ পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে আনা প্রয়োজন। বাংলা বাঙালীর ইতিহাসকে ম্লান করার জন্য বেওয়ারিশদের অভাব নেই। পুরাতন স্বভাব পাল্টিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও দর্শনীয় স্থানগুলো আরও সৌন্দর্যময় করে তোলা সময়ের দাবী। এতে দেশের অর্থনৈতিক আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবেশ খাতে সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর