মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে তরুণেরা ছিল টার্গেটে


এস এম শহিদুল্লাহ,একজন সমাজকর্মী ও কলাম লেখক। | প্রকাশিত: ০৯:৩২ পিএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার
মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে তরুণেরা ছিল টার্গেটে ছবি প্রতিকী

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের মতো নারায়ণগঞ্জ শহরেও পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল তরুণ ছাত্রসমাজ। শহরে তারা কোন তরুণ যুবককে দেখলেই ধরে নিয়ে যেত। এই পরিস্থিতিতে তরুণসমাজ ভারতে পাড়ি জমায়। ভারতে যেয়ে সামরিক ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ইতোমধ্যে ভারত থেকে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সপ্তাহখানেকের ট্রেনিং নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আসে। মান্নান, ইসলাম এঁরা দৌড়িয়ে উকিলপাড়ার কাছে এসে দাঁড়ায়। মোজ্জামেল পরপর দুটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে শান্তি কমিটির নেতা এম এ জাহেরের বঙ্গবন্ধু সড়কের বাসায়। এদিকে ওবায়েদউল্লাহ আইল্যান্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেয় `জয় বাংলা`। উকিলপাড়ার মোর থেকে মান্নান-ইসলামও `জয় বাংলা` স্লোগান দিয়ে নন্দীপাড়া রোড ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পালায়। এটিই ছিল নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অপারেশন। এটি ছিল এপ্রিল মাসের শেষের দিকের ঘটনা।

এপ্রিলেই পাকিস্তানি বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় শহরে শান্তি কমিটি গঠন শুরু হয়। এম এ জাহের, মোহাম্মদ আলী, আজিজ সর্দার, নাজিরউদ্দিন আহাম্মদ, আমির আলী, আলমাছ আলী, করিম মাস্টার প্রমুখ ব্যক্তির উদ্যোগে স্থানীয় কিছু লোকের সাহায্যে শান্তি কমিটি গঠিত হয়।

কমল ছিলেন একজন ভাল গায়ক। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনে তাঁর দেশাত্মবোধক গান ও গণসংগীত ছিল কর্মীদের উৎসাহের এক বিরাট অবলম্বন। কুখ্যাত মোহাম্মদ আলীর নির্দেশে কমলকে টিএন্ডটির মিলিটারি ক্যাম্পে  নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের শুভাকাঙ্খী নবীগঞ্জের শফি চেয়ারম্যান ও সোনাকান্দা ডকইয়ার্ডের ফজল ও ফকরুলকে। এমন আরও অসংখ্যক দেশপ্রেমিককে হত্যা করে হানাদার এবং তাদের দোসররা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আহবানে মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নারায়ণগঞ্জের ছেলেরা দলে দলে ভারতের `দেরাদুনে মিলিটারি একাডেমি` এবং আগরতলার `মেলাগড় ক্যাম্প` থেকে সামরিক ট্রেনিং গ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জে আসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে। কেউ কেউ প্রথম এসে গোগনগর ইউনিয়নের সৈয়দপুরে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ গ্রামের গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ডাক্তার মোসলেহউদ্দিন এসকল মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা করেন। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের জনসাধারণ সংক্ষেপে ‘মুক্তি’ ও ‘বিচ্ছু’ বলে ডাকতো। কানাইনগর, বক্তাবলী, আলীরটেক ইত্যাদি স্হানেও মুক্তিদের আস্তানা খোলা হয়।

এসময় ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে যাঁরা ফিরেছিলেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন, জানে আলম, আবদুুস ছাত্তার, সিরাজুল ইসলাম (পরবর্তীতে সাংসদ হয়েছিলেন), আজহার হোসেন (কমিশনার), আবদুর রব, মাহফুজুর রহমান, রতন, সালাউদ্দিন, তমিজউদ্দিন রিজভী (পরবর্তীতে চিত্র পরিচালক), জয়নাল আবেদিন টুলু (কমিশনার) প্রমুখ। এঁরা স্থানীয়ভাবে বহু যুবককে আবার ট্রেনিংও প্রদান করেন। গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা যখন সংগঠিত হচ্ছিল তখন তাদের প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তান বাহিনী অবাঙ্গালি ও বাঙ্গালী যুবকদের সমন্বয়ে গঠন করে  রাজাকার বাহিনী। নারায়ণগঞ্জে রাজাকার বাহিনীর মধ্যমনি ছিল টেরর অবাঙ্গালি গুলজার। বন্দর এলাকায় রাজাকার বাহিনীর মধ্যমনি ছিল মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী ও অবাঙ্গালি তাকসিন তামান্না। কুখ্যাত তাকসিন তার কলোনি বাড়িতে বহু বাঙ্গালী যুবককে আটক ও অত্যাচার করে হত্যা করে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের কঙ্কাল তাকসিনের বাড়ির কুয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

রাজাকারদের নয়জনের একটি দল একদিন রিকাবীবাজারের একটি ঘরে আমোদ-ফুর্তিতে মত্ত ছিল। এদের ধরে এনে ডিক্রিরচরের ক্যাম্পে এক বিচারে প্রাণদন্ড দেয়া হয়। এ অপারেশনে মুক্তিবাহিনী নয়টি রাইফেল এবং বেশ কিছু গুলি হস্তগত করে। এটি ছিল ডিক্রীরচরের মাহফুজুর রহমানের (স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ  মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক হয়েছিলেন) গ্রুপের প্রথম অপারেশন।

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখের ‘বাবুরাইল পুল অপারেশন’ নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে বিশিষ্টতার দাবি রাখে। তখন পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে রাজাকার বাহিনীও শহর ও মহল্লায় মহল্লায় টহল দিয়ে বেড়াতো। সেদিন সন্ধ্যায় জানে আলম, মাহফুজুর রহমান, শফিউদ্দিন ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইসলাম প্রমুখের একটি গ্রুপ নৌকায় কাশীপুর হতে জিমখানা পুলের একটু উত্তরে এসে দেখেন, পুলের ওপর ৫-৬ জন রাজাকার সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মুহুর্তে জানে আলম আর শফির স্টেনগান গর্জে উঠল। মুহূর্তে ধরাশায়ী হলো ৫-৬ জন রাজাকার। কিন্তু হায় যার উদ্দেশ্যে এ অপারেশন সেই কুখ্যাত রাজাকার গুলজার নির্ঘাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। কারণ সে মুহুর্তে সে পাশের এক বাড়িতে অবস্থান করছিল।

এ ঘটনার কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিনের অধীনে কয়েকজনযোদ্ধা মন্ডলপাড়া বিদ্যুৎ সাবস্টেশনে অপারেশন চালিয়ে স্টেশনটির প্রভূত ক্ষতি সাধন করে।

গোদনাইল জেলেপাড়া রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার জন্য ডিনামাইট ফিট করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন নিজের হাতই উড়িয়ে ফেলেন। বস্তুত তখন প্রতিদিনই নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা একটি না একটি অপারেশন চালাতেন।

বি: দ্র: লেখাটির তথ্য উপাত্ত লেখকের নিজস্ব সংগৃহীত। এসব তথ্যের দায় তার উপর বর্তাবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর