আগামী দিনগুলি আমাদের জন্য কঠিন সময়


হাবিবুর রহমান বাদল | প্রকাশিত: ০৯:০২ পিএম, ২৩ মার্চ ২০২০, সোমবার
আগামী দিনগুলি আমাদের জন্য কঠিন সময়

করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ^ এখন স্তব্ধ বলা চলে। বিশে^র এক একটি দেশ এক একটা দ্বীপের মত নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। প্রাণঘাতি এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য লোক মৃত্যুবরণ করেছে। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত। এখনো পর্যন্ত এই প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের প্রতিশেধক আবিস্কৃত না হওয়ায় মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পরই মারা যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে চীনসহ অন্যান্য দেশগুলি আক্রান্ত হতে শুরু করে।

ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিশে^র অধিকাংশ দেশে এই প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লেও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও প্রাণঘাতি এই ভাইরাসে বাংলাদেশের কেউ আক্রান্ত হয়নি। এমতাবস্থায় বিশে^র বিভিন্ন দেশে যখন করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে দেখা দেয় তখন সেখান থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে আসতে শুরু করে।

প্রথমে প্রবাসী বাংলাদেশীদের তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় শুধু মাত্র চলতি মাসেই নারায়ণগঞ্জে ইটালী প্রবাসীসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা দেশে প্রবেশ করে স্বজনদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা করতে থাকে।

যদিও সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশে আসার পর ১৪ দিনের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য বার বার তাগিদ দেয়ার পরও দেশে ফিরে প্রবাসী বাঙ্গালীরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইসব উপদেশ না মেনে ইচ্ছামত চলাফেরা করেছে। ফলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত অনেকের সংস্পর্শে এসে তাদের স্বজনরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ধারণা বিপুল সংখ্যক ইটালী প্রবাসীসহ ভাইরাস আক্রান্ত দেশ থেকে আসা লোকজনের সংস্পর্শে এসে তা অনেকের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। যা নিয়ে সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন অনেকটাই চিন্তিত।

দেশের সাধারণ মানুষ করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির আশায় পরম করুণাময় আল্লাহ’র দরবারে প্রাথর্ণাসহ প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষায় শ্রষ্টার করুণা প্রার্থণা করে চলেছেন। কেবল মাত্র নারায়ণগঞ্জেই চলতি মাসে ইটালীসহ আক্রান্ত দেশগুলি থেকে সাড়ে ৫ হাজার বিদেশ ফেরত লোক ঢুকেছে এদের মধ্যে মাত্র ৩জন বিদেশী নাগরিকসহ ১৬২জন কোয়ারাইনন্টেনে রয়েছেন। বেশ কিছু প্রবাসী ইতিমধ্যে কোয়ারাইন্টেট থেকে অবস্থান শেষে বাড়ি ফিরেছে।

বাংলাদেশে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় নারায়ণগঞ্জে। চলতি মাসে ৮ তারিখে শহরের অবস্থানরত ইটালী প্রবাসী এক যুবক ও তার স্ত্রী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সনাক্ত হওয়ার পর দেশব্যাপী সকলের টনক নড়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে করনীয় সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন করা শুরু করলেও নারায়ণগঞ্জের জনপ্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এমনকি প্রশাসনও তেমন কোন কঠোর অবস্থানে যায়নি।

বরং গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় অনুষ্ঠান করে বিভিন্ন ধরনের লোক সমাগম করা হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করলেও নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের বিশাল সমগম ঘটিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়। অবশ্য সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছাত্র-ছাত্রীদের সমাগম দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও স্কুল পরিচালনা পরিষদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

আরেকটি স্কুলে ঘটাকরে ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী নেতা ছাত্রীদের নিয়ে বিশাল সমাগম ঘটিয়ে অনুষ্ঠান করে নিজের নামফলক স্থাপন করে। এ নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রশাসন এ ব্যপারে তেমন কোন কঠোরতা অবলম্বন করেনি। বরং হাসপাতাল দু’টিতে ঘুরে দেখা গেছে ময়লা আবর্জনা আর মশার উপদ্রবে রোগীরা অতিষ্ট প্রায়।

পাশাপাশি ডাক্তারগণ রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে দুরত্ব বজায় রেখে কোনমতে দায় সারছেন। এ ব্যাপারে ডাক্তারদের বক্তব্য, আমাদের প্রয়োজনীয় পার্সোনাল প্রটেকিভ ইকোইভম্যান্ট সরবরাহ করা হয়নি। এ অবস্থায় আমরা নিজেরইে রয়েছি ঝুঁকিতে।

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে সমগ্র নারায়ণগঞ্জ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও জনপ্রতিনিধিরা এ ব্যপারে সাধারণ মানুষ যাতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হয় এই জন্য কোন প্রকার হাত ধোয়ার সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা রাখার মত সামগ্রী বিতরণ না করে সচেতন থাকার জন্য বক্তিতা বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। পাশাপাশি কতিপয় সংগঠন সাধারণ মানুষকে সচেতন না করে নিজেদের ফটো স্যাশন করতে দেখা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরশেন করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কোন প্রকার বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ নেয়াতো দূরের কথা শহরকে পরিস্কার পরিছন্ন রাখার পাশাপাশি মশক নিধনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেও গ্রহণ করেনি। অবশ্য এক্ষেত্রে কাউন্সিলর মাকসুদ আলম খন্দকার খোরশেদ ও কাউন্সিলন শওকত হাসেম শকু তাদের সামর্থ অনুযায়ী করোনা ভাইরাস যাতে আঘাত হানতে না পারে সে জন্য সীমিত আকারে হলেও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম বিতরণ করে আসছেন। আর এরই মধ্যে গণমাধ্যম কর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা ভাইরাসের খবর সংগ্রহ করে চলেছেন।

নারায়ণগঞ্জে সাড়ে ৫ হাজার প্রবাসীর সংস্পর্শে এসে আরো কত জন আক্রান্ত হয়েছেন এটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি। সোমবার নারায়ণগঞ্জ ৩শ’ শয্যা হাসপাতালে যোগাযোগ করা হলে বলা হয় তারা পিপিই এখনো পারনি। যে কারণে নিজেরাই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্টেটদের মধ্যে পিপিই বিতরণ করা নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।

অপরদিকে নারায়নগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ আহাম্মেদ জানান, সকল হাসপাতালের মত নারায়ণগঞ্জেও ডাক্তারদের জন্য সরকারি ভাবে পিপিই দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ হাসপতালে ডাক্তারগণ পিপিই পারনি কেন এর জবাবে জানান, যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিবেন তাদের জন্য এই সামগ্রী। বর্হিবিভাগের ডাক্তারদের জন্য পিপিই প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা।

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কেউ চিহিৃত না হলেও শহরে একধরণের আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়া অনান্য সকল মাকের্ট আগামী কাল থেকে বন্ধ হয়ে যাবে।

দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, আক্রান্ত দেশগুলি থেকে যারা ইতিমধ্যে দেশে এসেছেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কোরাইনন্টাইনে রাখা গেলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতনা। তবে এখনো সরকার যদি কঠোর ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে বিদেশ ফেরতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোরাইনন্টাইনে নিতে পারে তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। আর এজন্য সকলকে সর্তকতার সাথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোন ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত সবকিছু ইতিমধ্যেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সামনে দিনগুলি আমাদের জন্য কি সংবাদ বয়ে আনবে এ একমাত্র সৃষ্টি কর্তাই বলতে পারে। এমতাবস্তায় করোনা ভাইরাস আতঙ্কের সুযোগে কেউ যেন ফায়দা না লুটে এ জন্য সবাইকে যেমন সজাগ থাকতে হবে তেমনই রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে জাতীয়ঐক্য সৃষ্টি করে এই প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের হাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর