মামলা ইস্যুতে বিতর্কে বিঁধছে পুলিশ ও ডিবি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০৪ পিএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
মামলা ইস্যুতে বিতর্কে বিঁধছে পুলিশ ও ডিবি

নারায়ণগঞ্জে একের পর এক মামলার বিপরীতে পুলিশকে বিতর্কে বিঁধাতে শুরু করেছে বিএনপি। আর সুযোগ পেয়ে বিএনপি নেতারাও পুলিশকে ভর্ৎসনা করছে। এছাড়া শহরের বরফকল এলাকাতে ডিবির একটি ঘটনার মামলা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলায় গত কয়েকদিনের ব্যবধানে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তবে এর মধ্যে এমন কয়েকজনকে আসামী করা হয়েছে যাঁরা বর্তমানে হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে রয়েছেন। আবার কেউ বা আছেন দেশের বাইরে।

২৬ আগস্ট শহরের খানপুর বরফকল খেয়াঘাট সংলগ্ন চৌরঙ্গী ফ্যান্টাসী পার্কের সামনে খাবার খেয়ে বিল না দেয়াকে কেন্দ্র করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সঙ্গে যুবলীগ নেতাকর্মীদের ব্যপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছে অন্তত ১০জন।

পরদিন ডিবির একজন এএসআই বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেন যেখানে একটিতে সরকারী কাজে বাধা ও অপরটিতে ডিবি সদস্যদের উপর হামলার অভিযোগ তোলা হয়।

২৭ আগস্ট ভোর পৌনে ৪টায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় ওই মামলাটি দায়ের করা হয়। তবে দুটি মামলাতেই প্রকৃত ঘটনা আড়ালের অভিযোগ উঠেছে।

মূলত ডিবির দুইজন এএসআই চৌরঙ্গী পার্কের পাশের একটি দোকানে মিল্কসেইক খেয়ে বিল না দিয়ে চলে আসার সময়ে বাকবিতন্ডার জের ধরে ওই ঘটনা ঘটলেও মামলাতে এর কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, রোববার রাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে টহল দেওয়ার সময়ে চৌরঙ্গি পার্কের সামনে দুই দল হকারদের মধ্যে মারামারি ঘটে। তখন ডিবির সদস্যরা সেখানে গেলে তাদের উপর হামলা চালায়।

দুটি মামলার একটিতে ৫০ ও অপরটিতে ৩০জন অজ্ঞাতজনকে আসামী করা হয়েছে। এছাড়া একটি মামলায় ১১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সহ সভাপতি ও মাইলাইফ নামের ফাস্টফুড দোকান মালিক জালাউদ্দিন, তার স্ত্রী রিনা বেগম, দুই ছেলে আলামিন ও রবিনের নাম উল্লেখ করা হয়। অপর একটি মামলাতে এ চারজন সহ সাইদুরের নাম উল্লেখ করা হয়। ইতোমধ্যে রীনা বেগম মামলায় কারাভোগ করে জামিন পেয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে খানপুর বরফকল খেয়াঘাট সংলগ্ন চৌরঙ্গী ফ্যান্টাসী পার্কের সামনে মাইলাইফ কেয়ার ফাস্টফুড নামের একটি দোকানে পরিবার পরিজন নিয়ে খেতে যান এএসআই আমিনুল ও এএসআই বকুল। এসময় মিল্কসেইক খাওয়ার পরে ওই মিল্কসেইকটি ভাল হয়নি দাবি করে বিল দিতে রাজী হয়নি দুইজন। তখন তাদের সঙ্গে ফাস্টফুডটির মালিক ১১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সহ সভাপতি জালালের ছেলে আলামিন ও রবিন বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে। বাকবিতন্ডার এসময় তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এসময় যুবলীগ নেতা জালাল ও তার স্ত্রী রিনা ইয়াসমিন ঘটনাস্থলে আসলে ডিবির দুই এএসআই মিলে তাদেরকে মারধর করে। এতে করে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এসে ওই দুই এএসআইকেও বেধড়ক পিটুনী দেয়। এসময় খবর পেয়ে ডিবির পরিদর্শক মাসুদ, এসআই মিজান ও এসআই সায়েম ঘটনাস্থলে আসলে লাঠিসোটা দিয়ে তাদেরকেও বেধড়ক পিটুনী দেয়া হয়। পরে অতিরিক্ত ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদেরকে উদ্ধার করে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। আহতদের মধ্যে ডিবির এসআই মিজান ও এসআই সায়েম, যুবলীগ নেতা জালাল, ছেলে আলামিন ও রবিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে একের পর এক ঘটনাহীন মনগড়া মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামী করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দলের নেতাকর্মীরা। বিএনপির জেলার শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এসব মামলায় আসামী করা হচ্ছে।

৩০ আগস্ট দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্টে গোপন বৈঠকের অভিযোগ এনে রুপগঞ্জ থানায় বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আনোয়ার সাদাত সায়েমসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। এতে অজ্ঞাত আরও ২০/২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এরপরে আরেকটি মামলা হয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নাশকতার অভিযোগে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ৩৫ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোস্তফা কামাল খান বাদী এ মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনির, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আনোয়ার সাদাত সায়েমসহ ৩৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার অভিযোগ করেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব নেতারা প্রার্থী ও যারা আওয়ামী লীগের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে তাদের নামেই মামলা হচ্ছে।

তৈমূর বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনকে টার্গেট করেই এখন নারায়ণগঞ্জে মামলা হচ্ছে। আর মামলার ভিত্তিও খুব কম। কারণ সোমবার আমার সহ অন্যদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সেটা বানোয়াট। মামলায় বলা হয়েছে রোববার আমি সহ অন্যরা নাকি গোলাকান্দাইলে জড়ো হয়েছিলাম। অথচ রোববার আমি সেখানে ছিলাম না। রাজধানীতে কয়েকটি কাজ করে বিকেলে আমি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে গিয়েছিলাম। সেখানে সুইমিং করেছি। আমার মোবাইল ট্র্যাকিং করলেই পাওয়া যাবে অবস্থান। সিসি ক্যামেরার ফুটেজও আছে যেসব স্থানে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেও আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক উদ্দেশ্য প্রণেদিত মামলা হচ্ছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক নজরুল ইসলাম আজাদের বাড়িতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য সুস্থ্যতা কামনায় আয়োজিত দোয়া পন্ড করে দিয়েছে পুলিশ। ওই সময়ে সেখান থেকে তিনজনকে গ্রেফতার ও নজরুল ইসলাম আজাদকে প্রধান আসামী করে বিস্ফোরক সহ বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে পুলিশ। তবে আজাদের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ পুনর্মিলনী ও বিএনপির নেতাদের নামে দোয়া পালন করতে গিয়েই পুলিশের তান্ডবের শিকার হয়েছেন। বাড়িতে আয়োজিত রান্না করা খাবার ফেলে দিয়েছে পুলিশ।

২৫ আগস্ট সকালে আড়াইহাজার থানার এস আই আবুল কাশেম বাদী হয়ে ওই মামলাটি দায়ের করেন। এর আগে ২৩ আগস্ট আড়াইহাজারের আরো একটি মামলায় আজাদ ও তার অনুগামীদের আসামী করা হয়।

এদিকে আজাদ জানিয়েছেন, এর আগে ২৩ আগস্ট আড়াইহাজারে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অথচ ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম না। পরদিন ২৪ আগস্ট প্রতি বছরের মত এবারও আমি নেতাকর্মীদের নিয়ে আমার বাড়িতে বসেছিলাম। তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুস্থ্যতা কামনায় দোয়া পালন করছিলাম। তখনই পুলিশ হানা দিয়ে দোয়ার পরে বিতরণের জন্য প্রস্তুত করা খাবার ফেলে দিয়েছে পুলিশ। আমাদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করেছে। এর আগে এ বাড়ি থেকেই আমাকে একবার টেনে হিচড়ে গ্রেফতার করে পুলিশ।

জানা গেছে, সোনারগাঁও উপজেলায় নাশকতার প্রস্তুতির চেষ্টার অভিযোগে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে পুলিশ। এছাড়া ওই মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে জেলা ছাত্রদলের সেক্রেটারী খায়রুল ইসলাম সজীব সহ ১৪জনকে।

২৯ আগস্ট দুপুরে সোনারগাঁও থানার পিএসআই সেন্টু সিংহ বাদী হয়ে ওই মামলাটি দায়ের করেন। ওই মামলায় বুধবার দুপুরেই রাজধানীর বসুন্ধরার নিজ বাড়ি হতে সজীবকে গ্রেফতার করে সোনারগাঁও পুলিশের একটি টিম।

তাদের কাছ থেকে ৪টি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে মামলায় উল্লেখ করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, কাঁচপুর মোড়ে সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছিল গ্রেফতারকৃত ১৩ জন সহ ৩৩জন জ্ঞাত ব্যক্তি। এছাড়া তাদের সঙ্গে অজ্ঞাত আরো ৩৩ জন ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টেরে পেয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে সজীবকে বুধবার দুপুরে গ্রেফতার করা হয়। মামলায় আসামীদের মধ্যে সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু জাফর ও কাঁচপুর ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারী মোমেন খান বর্তমানে হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন জানা গেছে।

এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে সোনারগাঁও থানা পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) আবুল হাসান বাদী হয়ে একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলাটি দায়ের করেন। উক্ত মামলায় আসামীদের মধ্যে রয়েছেন দেড় বছর আগে মারা যাওয়া বিএনপি নেতা ও বছরখানেক ধরে প্যারালাইজড থাকা এক যুবদল নেতা। মামলার এজাহারে ৫ নং আসামী করা হয়েছে সোনারগাঁ থানা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও সাবেক শাম্ভুপুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমানকে। তিনি এলাহীনগরের মৃত লাল মিয়ার ছেলে। এমনকি তিনি নিজেও দেড় বছর আগে মারা গেছেন।

এর আগে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এস আই জয়নাল আবেদীন খান বাদী হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন যেখানে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ১৫জনকে আসামী করা হয়।

মামলার আসামীদের একজন মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক রানা মুজিব জানান, তিনি দক্ষিণ কোরিয়াতে আছেন গত ১০ জানুয়ারী হতে। পাসপোর্টে ভিসা ও বাংলাদেশ বিমানবন্দরের বহিগমন সীলও আছে।

এদিকে গত ৩০ আগস্ট আড়াইহাজারে মাদক দিয়ে এক অটোচালককে ফাঁসাতে গিয়ে ৪ পুলিশ কর্মকর্তাকে গণধোলাই দেয় এলাকাবাসী। এতে পুলিশকে খবর দেয়া সেই পুলিশের সোর্স মুক্তা আক্তারকে (২৪) ৭০ পিচ ইয়াবা ও ৫ পুইরা হেরোইন সহ গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরন করেছে পুলিশ।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ৩০ আগষ্ট বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে উপজেলার আড়াইহাজার পৌরসভাধীন ঝাউগড়া এলাকায় মুক্তা নামের এক নারীর তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের উপপরিদর্শক আবুল কাশেম, পিএসআই মোফাজ্জল, এএসআই মোস্তফা ও এএসআই হেলাল সাদা পোষাকে রমজানের বাড়িতে গিয়ে রমজানকে আটক করে হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসার সময় রমজানের বোন লিপি আক্তার পুলিশ তাকে কেন নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ এর কারণ জানতে চান। ওই সময় পুলিশ রমজানের পকেটে মাদক গুজে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ নিয়ে তাদের সাথে তর্কবিতর্ক হলে পুলিশ রমজান ও তার বোনকে বেধরক পিটাতে থাকে। তাদের চিৎকারে এলাকার লোকজন এসে পুলিশকে তাদের কেন পিটানো হচ্ছে কারণ জানতে চাইলে পুলিশ তাদেরকেও পিটায়। তখন এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে গণপিটুনী দেয়। এ ঘটনাটি রাতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ও পুলিশের উর্ধতন মহলে জানাজানি পুলিশের টনক নড়ে।

অটোচালক রমজান জানান, তাদের সাথে মুক্তা আক্তার দ্বন্দ্বের কারণে সে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
-->
newsnarayanganj24_address
আইন আদালত এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর