হারুনের চেয়েও বেশী কঠোর মনিরুলের পুলিশ প্রশাসন


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
হারুনের চেয়েও বেশী কঠোর মনিরুলের পুলিশ প্রশাসন

নারায়ণগঞ্জে সদ্য বিদায় নেওয়া পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদের বদলীর পর থেকে ‘পুলিশ প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেল, কঠোরতা শিথিলতায় পরিণত হয়েছে’ এমন নানা প্রশ্ন উঠে শহরময়।

কারণ এসপি হারুনের বিদায়ের পর থেকে স্বস্তির নগরীতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। তবে সম্প্রতি পুলিশ স্টেশনে মারধরের ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার সহ ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ দলের পদধারী নেতা মীর সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এতে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে যাওয়া প্রশ্ন একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ছে। কারণ এসপি হারুনের বিদায়ের পরেও পুলিশ প্রশাসন তাদের অনড় অবস্থানে রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এখনো অব্যাহত রেখেছে।

জানা গেছে, এসপি হারুনের বিদায়ের পর এ জেলায় ভারপ্রাপ্ত এসপির দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি-প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম যিনি এসপির পদোন্নতি পেয়েছেন আরো এক বছর আগেই। তবে পোস্টিং না হওয়ায় এখনও নারায়ণগঞ্জে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে ভারপ্রাপ্ত এসপির দায়িত্ব পালন করাটা তাঁর জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে তেমনি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। গত ৭ নভেম্বর জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসপি হারুনকে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিদায় জানানো হয়। তারপর থেকেই ভারপ্রাপ্ত এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন কারছেন এএসপি মনিরুল ইসলাম।

এদিকে সর্বশেষ গত ১৪ বৃহস্পতিবার বিকেলে ফতুল্লায় মীর হোসেন মীরু বাহিনীর সদস্যরা মুরাদ নামের একজন ব্যবসায়ীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেয়। মুরাদের ভাই সেলিম এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় বৃহস্পতিবার রাতে একটি লিখিত অভিযোগ দেয়।  আর এ অভিযোগের ব্যাপারে তদন্তকারী অফিসার এসআই মিজান সেলিমকে শুক্রবার রাতে থানায় আসতে বলে। সেলিম শুক্রবার রাতে থানায় প্রবেশের সময় জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেলের সাথে দেখা হয়। এসময় মীর সোহেল ও তার সাথে থাকা শাহীন থানা গেটের সামনে সেলিমকে মারপিট করে। এক পর্যায়ে তাকে টেনে হিচড়ে পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হাসানুজ্জামানের রুমে তাকে নিয়ে যায়। সেখানেও হাসানুজ্জামান তাকে শাসিয়েছে বলে অভিযোগ। সেলিমের উপর থানার ভেতরে অনাকাঙ্খিত ঘটনায় কুতুবপুরে সন্ত্রাসী মীরুর বিরুদ্ধে রাতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে এলাকাবাসী। এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। স্থানীয়রাও এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

পরবর্তীতে এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হাসানুজ্জামানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এবং জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর সোহোলে বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এদিকে এএসপি মনিরুল ইসলাম দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পরদিনই জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এর এস আইয় আরিফ  টাকার উপর ঘুমানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করেন এবং এসআইয়ের টাকার উৎস উদঘাটনের জন্য তদন্ত শুরু করেন।

একই দিন রাতে মাসদাইর পুলিশ লাইন্সের সামনে শিক্ষিকা রাস্তা পারাপার হওয়ার সময় ব্যাটারী চালিত অটোরিকশার ধাক্কায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন যিনি পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। এ ঘটনায় মনিরুল ইসলাম দুঃখ প্রকাশ করে দ্রুত অবৈধ ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা চলাচলের উপর অভিযান শুরু করেন। দুই দিনের অভিযানে ৪৮টি অটোরিকশা আটক করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে অবৈধ অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করে দেন।

জানা গেছে, এসপি হারুনের ১১ মাসের মধ্যে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গবন্ধু সড়কের উভয় পাশে ফুটপাত দখল মুক্ত থাকে। কিন্তু এসপি হারুনের বিদায় ঘোষণার পরই আবারও এক রাতের মধ্যে ফুটপাত দখল করে হকাররা বসতে শুরু করে। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এসপি আসবে যাবে তাই বলে প্রশাসনের কাজ থেমে থাকতে পারেন না।’ এমন বক্তব্যের একদিন পরই মনিরুল ইসলামের নির্দেশে শহরে ফুটপাত অবমুক্ত করতে ও অবৈধ দখলদারদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে পুলিশের অভিযান শুরু হয়। শহরে চাষাঢ়া থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কের উভয় পাশের ফুটপাত আবারও অবমুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সড়কের উপর অবৈধ পাকিংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এসময় উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্বে থাকা এএসপি মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী ঘোষণা দেন ফুটপাতে হকার বসতে পারবে না কঠোর নির্দেশ রয়েছে।

এ অ্যাকশনের ধারাবাহিকতায় ১২ নভেম্বর বিকেলে ফতুল্লা থানার বিভিন্ন মামলায় ৮ হাজার পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। ওইদিন বিশাল বড় ব্যানারে ওই ৮ হাজার পলাতক আসামিদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। আর ওই নামের তালিকা ফতুল্লার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও সাংবাদিকদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে একাধিক দেয়ালে সাটিয়ে দেয়া হয়।

নগরবাসীর নিত্যদিনের চিরচেনা যানজট নিরসনেও নেওয়া হয় বিশেষ পদক্ষেপ। দিনের বেলায় শহরে ট্রাক সহ ভারী যানবাহন প্রবেশের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেটাও আবারও জোরালো করা হয়েছে। ১২ নভেম্বর বিকেল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের শিবু মার্কেট এলাকায় নারায়ণগঞ্জ শহরমুখী পন্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ইউটার্ন করে দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এসপির দায়িত্ব পালন করা এএসপি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসন হার্ডলাইনে অবস্থান করে ক্ষমতাসীন দলের ও পুলিশ প্রশাসনের বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফের জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে এসেছে। এসপি হারুনের বিদায়ের ফলে জনমনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল তা দূর হয়েছে পুলিশের চলমান কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর