নতুন এসপি জায়েদুলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৫৪ পিএম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার
নতুন এসপি জায়েদুলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার পদে পদায়িত করা হয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলমকে। ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ অধিশাখার উপসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ বদলী করা হয়।

মুন্সিগঞ্জে তিনি বেশ শক্ত অবস্থান ধরে রাখলেও নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সম্মুখিন হতে হবে। যেকারণে এক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হবে এই এসপি। কারণ এখানে আওয়ামীলীগের দুটি মেরুর রাজনীতিক অস্থিরতার পাশাপাশি রাজনীতির পেছনের রাজনীতি রয়েছে।

তাছাড়া নারায়ণগঞ্জের বিদায়ী এসপি হারুন অর রশিদ হকার উচ্ছেদ, অবৈধ স্ট্যান্ড, অবৈধ পার্কিং, ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী সহ অপরাধীদের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে অবস্থান করে নগরবাসীর জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছেন এই এসপি। এসপি হারুনের বদলীর পর ভারপ্রাপ্ত এসপি মনিরও তার দেখানো পথে হাঁটছেন। যেকারণে অন্য জেলার তুলনায় এ জেলায় দায়িত্ব পাওয়া পরবর্তী এসপির জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জে যোগদানের পরই মুন্সীগঞ্জ জেলার ছয়টি থানার প্রধান ফটকে গেইট নির্মাণ, রাস্তা প্রস্তুতকরণ, বিভিন্ন স্থাপনার উন্নয়ন এবং মুন্সীগঞ্জের প্রত্যকটি থানাকে সুসজ্জিতভাবে আধুনিক রূপে সাজানো হয়েছে। আনা হয়েছে পুলিশে শৃঙ্খলা। এতে করে মুন্সীগঞ্জ পুলিশ বিভাগে আলোর ঝিলিক পড়েছে। জেলা জুড়ে মাদক নির্মূল ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং কোনো ধরণের ঘুষ বা অর্থনৈতিক লেনদেন ছাড়াই পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন মুন্সীগঞ্জের নারী-পুরুষরা।

এ সব কাজের জন্য ইতোমধ্যে বেশ প্রশংসা পেয়েছেন মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম। ১০০ টাকায় পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের প্রবর্তক ছিলেন মুন্সীগঞ্জের এই পুলিশ সুপার।

এদিকে গত ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদকে পুলিশ হেড কোয়াটারে বদলি করা হয়। গত ৭ নভেম্বর জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিদায় জানানো হয়। তবে এর আগে বেশ চমক দেখানো কাজ করে বিতর্কিত ও অপরাধীদের জম হিসেবে নিজেকে জাহির করে গেছেন এই এসপি।

এসপি হারুনের দায়িত্বপালনের ১১ মাসের মধ্যে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গবন্ধু সড়কের উভয় পাশে ফুটপাত দখল মুক্ত থাকে। কিন্তু এসপি হারুনের বিদায় ঘোষণার পরই আবারও এক রাতের মধ্যে ফুটপাত দখল করে হকাররা বসতে শুরু করে। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এসপি আসবে যাবে তাই বলে প্রশাসনের কাজ থেমে থাকতে পারেন না।’ এমন বক্তব্যের একদিন পরই ভারপ্রাপ্ত এসপি মনিরুল ইসলামের নির্দেশে শহরে ফুটপাত অবমুক্ত করতে ও অবৈধ দখলদারদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে পুলিশের অভিযান শুরু হয়। শহরে চাষাঢ়া থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কের উভয় পাশের ফুটপাত আবারও অবমুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সড়কের উপর অবৈধ পাকিংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এসময় উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্বে থাকা এএসপি মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী ঘোষণা দেন ফুটপাতে হকার বসতে পারবে না কঠোর নির্দেশ রয়েছে।

এ অ্যাকশনের ধারাবাহিকতায় ১২ নভেম্বর বিকেলে ফতুল্লা থানার বিভিন্ন মামলায় ৮ হাজার পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। ওইদিন বিশাল বড় ব্যানারে ওই ৮ হাজার পলাতক আসামিদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। আর ওই নামের তালিকা ফতুল্লার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও সাংবাদিকদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে একাধিক দেয়ালে সাটিয়ে দেয়া হয়।

নগরবাসীর নিত্যদিনের চিরচেনা যানজট নিরসনেও নেওয়া হয় বিশেষ পদক্ষেপ। দিনের বেলায় শহরে ট্রাক সহ ভারী যানবাহন প্রবেশের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেটাও আবারও জোরালো করা হয়েছে। ১২ নভেম্বর বিকেল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের শিবু মার্কেট এলাকায় নারায়ণগঞ্জ শহরমুখী পন্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ইউটার্ন করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিবাহন থেকে চাঁদাবাজী, স্ট্যান্ডের নামে চাঁদাবাজী, চুরি, ছিনতাই, জুয়া, মাদক ব্যবসা সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- চলমান রয়েছে। এসব বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করাই মূলত কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ এসপি হারুন এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে বিতর্কিত হয়েছেন। অভিযানে জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা, সংগঠনের নেতা, রাজনৈতিক নেতাদের নাম চলে এসেছে। এজন্য উপর মহলের তদবির, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে থাকতে হয়েছে। এসপির বিরুদ্ধে সভা, সমাবেশ, মিছিল এমনকি সংবাদ সম্মেলন করেও হুশিয়ারী দেয়া হয়। তবে এসব কিছুই তোয়াক্কা না করে নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য কাজ চালিয়ে গেছেন এসপি হারুন।

এসপি হারুন যেমন অপরাধীদের জন্য কঠিন ছিলেন তেমনি অসহায় সাধারণ মানুষের জন্য ছিলেন সিংহাম খ্যাত। গরীব দুঃখী ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সব সময়। ঈদ কিংবা পূজায় গরীব দুঃখী মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন। উৎসব আয়োজনে যেন কোন প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেজন্য আগে থেকেই নিজের নেতৃত্বে পদক্ষেপ নিয়েছেন। এবং সফলভাবে যেকোন অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেছেন। এসপি অফিসে সমস্যা নিয়ে গেলে তাৎক্ষনিক সমাধান করেছেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতি সামলানোর পাশাপাশি বাড়তি চাপ থাকে আওয়ামীলীগের দুই মেরুর দ্বন্দ্বকে ঘিরে। কারণ কোন ইস্যু পেলেই দুই মেরু একে অপরকে দোষারোপ সহ সমালোচনা শুরু করে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী দুই মেরুকে শক্ত হস্তে সামলাতে না পারলেও ভীষণ চাপে পড়তে হয়। কারণ দুই মেরুর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিগত দিনে নানা কারণে মামলা হয়েছে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দিয়ে কিংবা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ প্রকাশ পেলেই পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়ে। যেকারণে অন্য সব জেলার তুলনায় নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসপিদের তুলনামূলক বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হতে হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর