বিয়ের ফাঁদে ফেলে মুক্তিপণ আদায় ছিল মারিয়া ও তার পরিবারের মিশন


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৫৪ পিএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শনিবার
বিয়ের ফাঁদে ফেলে মুক্তিপণ আদায় ছিল মারিয়া ও তার পরিবারের মিশন

নিজের সৌন্দর্য্যকে পুঁজি করে যুবকদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করতো সুন্দরী মারিয়া আক্তার মন্টি (২৩)। এরপর নানা অজুহাতে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে মামলা অথবা অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করতো। এই অপহরণকারী চক্রে শুধু মারিয়া আক্তার মন্টিই নয় তার বাবা বাদল মিয়া ও ভাই পাপ্পু মিয়াও জড়িত ছিল। চক্রের সদস্য ছিল মারিয়া আক্তার মন্টির সাবেক প্রেমিক অভিত মিয়াসহ কয়েকজন। গত কয়েক বছরে কমপক্ষে ৫ জন যুবক সুন্দরী মারিয়ার প্রেমের ফাঁদে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছেন। ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে র‌্যাব-১১ এর একটি আভিযানিক দল নরসিংদী জেলার সদর থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের ৪ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো, মোঃ বাদল মিয়া (৫৮), তার মেয়ে মারিয়া আক্তার মন্টি (২৩), ছেলে মোঃ পাপ্পু মিয়া (২৮) এবং মারিয়ার সাবেক প্রেমিক অভিত মিয়া (২৮)। গ্রেফতারকৃত আসামীরা নরসিংদী জেলার সদর থানার স্থায়ী বাসিন্দা।

নির্যাতনের শিকার রাসেল জানান, তিনি ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার কসবা এলাকায় থাকেন। নরসিংদীর সদর থানা এলাকায় তার চাচাতো ভাইয়ের একটি টেইলারিং এর দোকান রয়েছে। ওই দোকানে মারিয়া আক্তার মন্টি নিয়মিতই তার জামাকাপড় সেলাই করাতে আসতো। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় ও প্রেম। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তিনি মারিয়া আক্তার মন্টিকে বিয়ে করেন। বিয়ের ১৭ দিন পরে তিনি সৌদিআরবের দাম্মামে চলে যান। সেখানে তিনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিয়ের পরে মারিয়া ৮ মাস তাদের বাড়িতে অবস্থান করেছিল। পরে সে তার মায়ের বাড়িতে চলে আসে। সৌদি যাওয়ার পরে সে বিভিন্ন সময়ে স্ত্রী মারিয়ার কাছে টাকা পাঠাতো। তার সমন্ধী পাপ্পুকে বিদেশে পাঠানোর নামেও ২ লাখ টাকা ধার নেয় তার শ^শুর বাদল মিয়া। ৭ মাস পূর্বে রাসেল সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে আসেন। কিন্তু শ^শুর বাড়িতে যাওয়ার পরে তারা রাসেলের সঙ্গে মারিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করে। পরে রাসেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দেয় স্ত্রী মারিয়া ও তার পরিবার। ওই মামলায় ১৩ দিন জেলহাজতে থাকার পরে জামিন লাভ করে রাসেল। ওই মামলার কারণে আর সৌদি আরবে যাওয়া হয়নি রাসেলের। মিমাংসার কথা বলে রাসেলকে নরসিংদী ডেকে নেয় মারিয়া ও তার পরিবার।

২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নরসিংদীর আদালতপাড়ার সামনে থেকে ভুয়া পুলিশ দিয়ে ডিবি পরিচয়ে তাকে অপহরণ করে একটি ফ্ল্যাট বাসায় আটকে শারিরীক নির্যাতন করা হয় এবং ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সে মুক্তিপণ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তার যৌনাঙ্গ সিগারেট জ¦ালানোর লাইটারের সাহায্যে পুড়িয়ে দেয়। এর আগে তার নগ্ন ছবি ও জোরপূর্বক অস্ত্র হাতে নেয়া ছবিও তুলে রাখা হয়। নির্যাতনের সময়ে তার শ^শুর ও সমন্ধীও ঘটনাস্থলে ছিল। পরে রাসেলের পরিবার কোন উপায় না পেয়ে বিকাশের মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকা এবং রাসেলকে হস্তান্তর করা হলে বাকী টাকা নগদে প্রদান করবে বলে সম্মত হয়। পরদিন ২৯ ডিসেম্বর রাতে নরসিংদীর শাপলা চত্বরে রাসেল প্রসাব করতে যাওয়ার কথা বলে গাড়ি থেকে নেমে ডাকাত ডাকাত চিৎকার করতে থাকলে অপহরণকারীরা তাকে রেখে কৌশলে পালিয়ে যায়। অপহরণকারীদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে সে এক সপ্তাহ চিকিৎসা নেয়। পরে সে নরসিংদী থানায় মামলা দায়েরে প্রস্তুতি নিলেও তার মুঠোফোনে হুমকী দিতে থাকে মামলা দায়ের করলে তার নগ্ন ছবি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল করে দেয়া হবে। তাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে বলেও হুমকী দেয়।

রাসেল আরো জানায়, তার সঙ্গে বিয়ের পূর্বেও মারিয়া আক্তার মন্টির আরো ৪টি বিয়ে হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। যার মধ্যে চাঁদপুরের এক যুবক তাদের বিরুদ্ধে চাঁদপুরের আদালতে মামলাও দায়ের করেছে। এছাড়া বানেরচর, বাঞ্ছারামপুরের দুই যুবকসহ ৪ জনের বিষয়টি তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। যারা মারিয়া ও তার পরিবারের প্রতারণার খপ্পড়ে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে। রাসেল আরো বলেন, মারিয়া ও তার পরিবার আমার উপর যে অমানবিক নির্যাতন করেছে তাতে তারা মানুষের কাতারে পড়েনা। আমি এর উপযুক্ত বিচার দাবি করছি।

পরে রাসেল গত ২০ ফেব্রুয়ারি র‌্যাব-১১ নারায়ণগঞ্জ বরাবরে অভিযোগ দায়ের করলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলেপউদ্দিনের নেতৃত্বে র‌্যাব সদস্যরা ২১ ফেব্রুয়ারী অভিযান চারিয়ে অপহরণকারীদের গ্রেফতার করে।

র‌্যাব-১১ জানায়, গ্রেফতারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা অপহরণের উদ্দেশ্যে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে মাইক্রোবাস যোগে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ বুঝে বিভিন্ন এলাকার বিত্তশালী লোকদের অপহরণ করে চেতনা নাশক ওষুধ প্রয়োগ করতঃ অবচেতন করে গোপন স্থানে নিয়ে জিম্মি করে বিভিন্ন শারিরিক নির্যাতন করাসহ প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মোটা অংকের টাকা মুক্তিপণ নিয়ে থাকে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর