rabbhaban

নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে ওয়াটার বাস : ৫ বছরে গচ্চা ২ কোটি টাকার বেশী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:১৩ পিএম, ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে ওয়াটার বাস : ৫ বছরে গচ্চা ২ কোটি টাকার বেশী

প্রতি ট্রিপে একটি ওয়াটার বাসে ডিজেল লাগে প্রায় ১০০ লিটার। যার খরচ আনুমানিক ৭ হাজার টাকা। জনবলের পেছনে প্রতি ট্রিপে আরো খরচ রয়েছে অন্তত দুই হাজার। সবমিলিয়ে প্রতি ট্রিপে খরচ কমপক্ষে ৮ হাজার টাকার উপরে। অথচ প্রতি ট্রিপে আয় হয় মাত্র চার থেকে পাঁচশ’ টাকা। কোন কোন দিন আয়ের খাতা শূণ্যই থেকে যায়। নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে গত ৫ বছরে ২ কোটি টাকার বেশী গচ্চা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। সরকারের কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন শীতলক্ষ্যার জলে গচ্চা গেলেও দেখার যেন কেউ নেই।

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর থেকে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে ওয়াটারবাস সার্ভিস চালু করে বিআইডব্লিউটিসি। উদ্বোধনের পরে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩ বছর ব্যপী নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টায় টঙ্গীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতো একটি ওয়াটারবাস। বিকেল ৩ টার দিকে আবার টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসতো। তবে অব্যাহত লোকসানের কারণে গেল ২ বছর ধরে একদিন পর পর ছেড়ে টঙ্গীর উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি একদিন পর পর নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে টঙ্গী থেকে ছেড়ে আসছে। নারায়ণগঞ্জ টঙ্গী নৌরুটের দূরত্ব ৪০.৫ কিলোমিটার। ভাড়া নেয়া হয় ১১০ টাকা। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে কাঁচপুর ৩০ টাকা, ডেমরা ৪০ টাকা, রাজখালী ৮০ টাকা, বেরাইদবাজার ৮৫ টাকা, ইছাপুর ১১০ টাকা, টঙ্গী ১১০ টাকা। ওয়াটারবাসের ধারনক্ষমতা ৪৬ জন যাত্রী। প্রতি ট্রিপে সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘন্টা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি ওয়াটার বাসে অন্তত ৩ জন করে কর্মচারী আছে। তাদের বেতন প্রতি মাসে কমপক্ষে অর্ধলাখ টাকার উপরে। প্রতি ট্রিপে (যাওয়া-আসা) একটি ওয়াটার বাসে ডিজেল লাগে প্রায় ১০০ লিটার। অর্থাৎ এক ট্রিপে জ্বালানি বাবদই ব্যয় হয় অন্তত ৭ হাজার টাকা। ডিজেল, জনবলসহ প্রতি ট্রিপে দৈনিক ব্যয় অন্তত ৮ হাজার টাকার উপরে। ওয়াটারবাসের ধারনক্ষমতা ৪৬ জন যাত্রী। তবে যাত্রী হয় হাতে গোনা কয়েকজন। প্রতি ট্রিপে দৈনিক আয় চার থেকে পাঁচশ টাকা মাত্র। অনেক সময় যাত্রী না থাকায় আয়ের খাতা শূণ্য থাকে। অর্থাৎ একটি ট্রিপে লোকসান হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। সে হিসেবে প্রথম তিন বছরে প্রতিদিন দু’টি ট্রিপ অর্থাৎ মাসে ৬০টি ট্রিপে লোকসান দাড়িয়েছে অন্তত সাড়ে ৪ লাখ টাকা যা বছরে কমপক্ষে ৫৪ লাখ টাকা। প্রথম ৩ বছরে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে ওয়াটার বাস সার্ভিসে বিআইডব্লিউটিসি লোকসান গুনেছে কমপক্ষে ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। গেল দুই বছর ধরে একদিন পরপর চলাচল করায় মাসে ট্রিপের সংখ্যা দাড়ায় ৩০টি। অর্থাৎ গেল ২ বছর ধরে প্রতি মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা লোাকসান গুনেছে যা বছরে ২৭ লাখ টাকা এবং গেল ২ বছরে ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ গেল ২ বছরে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে চলাচলরত ওয়াটার বাস সার্ভিসে বিআইডব্লিউটিসির লোকসান হয়েছে ২ কোটি টাকার উপরে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিসির একাধিক কর্মচারী জানান, বিআইডব্লিউটিসির কিছু কর্তাব্যক্তির অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সংস্থাটি ডুবতে বসেছে। ওয়াটারবাসগুলো যদি স্বল্প দূরত্বের রুটে চালানো হতো তাহলে ওয়াটারবাস অবশ্যই লাভজনক হতো। কিন্তু ওয়াটারবাস যে চালু হয়েছে কিংবা টঙ্গী রুটে চলাচল করছে সেটিই অনেকেই জানেনা। প্রচারণা নেই বললেই চলে। কোন কোন ট্রিপে ৫০ থেকে ১০০ টাকাও জমা দেয়া হচ্ছে। অথচ একেকটি ট্রিপে সরকারের ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ যাচ্ছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন শীতলক্ষ্যার জলে গচ্চা গেলেও দেখার যেন কেউ নেই। অথচ এই রুট বাদ দিয়ে যেখানে যাত্রী বেশী যাতায়াত করে সেসকল রুটে ওয়াটার বাস চালানো যেত। এতে যাত্রীরাও যেমন উপকৃত হতো তেমনি সরকারও লাভবান হতো।

বিআইডব্লিউটিএ ারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের নৌ-নিট্রা বিভাগের উপ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বাবু লাল বৈদ্য জানান, ওয়াটার বাস কখন আসে কখন যায় আমরা কিছুই জানিনা। যাত্রীও তেমন একটা দেখা যায়না। শুধু জানি এখান থেকে একটি ওয়াটার বাস টঙ্গীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আবার টঙ্গী থেকে ছেড়ে আসে।

নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে চলাচলরত ওয়াটার বাস-১১ এর মাস্টার বেলাল হোসেন জানান, উদ্বোধনের পর ৩ বছর প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী আসা যাওয়া করতো। তবে যাত্রী সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় গেল দুই বছর ধরে একদিন টঙ্গীর উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। পরদিন নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে টঙ্গী থেকে ছেড়ে আসছে। তিনি জানান, প্রতি ঘন্টায় তেল লাগে ১৫ থেকে ১৬ লিটার। আসন সংখ্যার তুলনায় যাত্রী সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। যাত্রী সংখ্যা কম হওয়ায় প্রতি ট্রিপেই লোকসান হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিসি নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) ফিরোজ শেখ জানান, আগে ৪টি ওয়াটারবাস চললেও বর্তমানে একটি ওয়াটারবাস চলছে। বেশীরভাগ দিনেই যাত্রী ২-৩ জন হচ্ছে। কোন কোনদিন যাত্রীও হয়না। একটি ট্রিপে তাদের তেল খরচ ৫ হাজার টাকার বেশী। এছাড়া স্টাফ খরচও রয়েছে। ফলে আয়ের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। তারপরেও উর্ধ্বতনদের নির্দেশে তারা নিয়মিত শিডিউল মেইনটেইন করছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর