rabbhaban

লিজ ছাড়াই থান কাপড় মার্কেটে সিন্ডিকেটে তোলাবাজি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৩০ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার
লিজ ছাড়াই থান কাপড় মার্কেটে সিন্ডিকেটে তোলাবাজি

নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং রেল গেইট মার্কেট যেটা কাটা কাপড়ের বা থান মার্কেট নামে পরিচিত সেটা গুড়িয়ে দেয়ার পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

শুধু ওই মার্কেটই নয়, ২নং গেইট থেকে উকিলপাড়া এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা তোলা হয়েছে বছরের পর বছর শুধুমাত্র রেলওয়ের উপরের মহলে দেয়ার নাম করে।

উচ্ছেদ অভিযান হলেও এই মার্কেট রক্ষা করা হবে এমন আশ্বাসেই হতো এই তোলাবাজি।

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, উচ্ছেদের মাত্র কয়েক দিন আগেও উচ্ছেদ ঠেকানোর কথা বলে সিন্ডিকেটের লোকজন প্রায় অর্ধকোটি টাকা উত্তোলন করেছে। অনেকে এখন টাকা ফেরত চাইতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন এবং টাকা ফেরত না দিলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ও জেলা পুলিশ সুপারকে জানাবেন বলেও জানান অনেক ব্যবসায়ী।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শহরের ২নং রেলগেইট এলাকায় গত দেড় দশক আগে গড়ে উঠে কাটা কাপড় বা থান কাপড়ের মার্কেটটি। একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন নামে এখানে মার্কেট তৈরী করেন। ধীরে ধীরে এসব মার্কেটের দোকান সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজারের মত। ওই সিন্ডিকেট দাবী করে আসছিলো এসব জায়গা রেলওয়ের হলেও তারা লীজ এনে সেখানে মার্কেট তৈরী করেছেন।

তথ্যানুসন্ধানে ও বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটে প্রধান হলেন স্থানীয় একজন বিএনপির নেতা যিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাড়াশি অভিযান শুরু হলেই গা ঢাকা দেন এবং বেশ কিছু কাল তিনি হোসিয়ারী সমিতির নেতা ছিলেন। সিন্ডিকেটের অপর সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের একজন প্রথম সারির নেতা যিনি নিজেও থান ও ঝুটের ব্যবসার সাথে জড়িত।

এছাড়াও আছেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের একজন শীর্ষ নেতা, ছাত্রলীগের সবেক এক শীর্ষ নেতা ও তার ভাই। তবে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য শেল্টারদাতা বনে যান মহানগর আওয়ামীলীগের একজন শীর্ষ নেতা।

বিস্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় হাজার দোকান থেকে ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি রেলওয়ে কর্মকর্তাদের নামে আলাদাভাবে প্রতি মাসেই বিশেষ হারে চাদা নেয়া হোত।

ওই সূত্র জানায়, লীজ না নেয়ার বিষয়টি রেলওয়ের স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানতেন বলে তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে এই চাঁদার একটি অংশ পৌছে দেয়া হোত এবং বাকি টাকা সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হোত। এভাবে গত দেড় দশকে এই সিন্ডিকেট এই মার্কেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রেলওয়ের উচ্ছেদ অভিযানের কয়েকদিন আগেই এই সিন্ডিকেটের লোকজন দোকান প্রতি ৫ হাজার টাকা করে নিয়েছে। আমাদেরকে বলা হয়েছে মামলা করে হলেও উচ্ছেদ ঠেকিয়ে রাখা হবে। কিন্তু মামলা করা তো দূরে থাক তারা নিজেদের দোকান ঘর হোটেল ঠিকই রক্ষা করেছে।

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, মামলা করতে তারা পারবে না কারণ আমরা জেনে গেছি এই জায়গার কোন লীজই ছিল না। কিন্তু আমরা কেউ এককভাবে পুরো বিষয়টির প্রতিবাদও করতে পারছি না কারণ তারা খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। আমরা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তারা ৭০ভাগই দোকান মালিক নই, সকলেই ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতাম। আর বাকিরা মার্কেট মালিকদের কাছ থেকে দোকানের পজিশন কিনে রেখেছিল। এই অবস্থায় মার্কেট মালিকদের ক্ষতি হয়েছে শূন্যভাগ। কারণ তারা ১০বছর আগেই টাকা উঠিয়ে ফেলেছেন।

এদিকে বাংলাদেশ রেওয়ের বিভাগীয় এস্টেট অফিসার ও ডেপুটি কমিশনার নজরুল ইসলাম নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ২নং রেইল গেইটের গড়ে উঠা মার্কেটের কোন লীজ ছিল না কোন কালেই। এখানে জমি দখল করে মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত  রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জে কয়েক হাজার অবৈধ স্থাপনা, দোকান ঘর ও মার্কেট উচ্ছেদ করেছে যার মধ্যে অর্ধেকই ছিল ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান হোসিয়ারী কারখানা। শ্রমিকেরা বিভিন্ন এনজিও বা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে এ কারখানাগুলো চালিয়ে থাকেন। এ উচ্ছেদের কারণে সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা ওইসব কারখানার শ্রমিকেরা।

১৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় শহরের ২নং রেল গেট এলাকা থেকে ঢাকা রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশ সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইন ডাবল করা হচ্ছে। যার ফলে বর্তমান লাইনের উভয় পাশে ৪৫ ফুট করে জায়গা দখল মুক্ত করা হচ্ছে। এজন্য বুধবার থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ৪৫ ফুট হিসেবে ২নং রেল গেট থেকে শুরু করে উকিলপাড়া রেল লাইন পর্যন্ত উভয় পাশে যেসব দোকানঘর ভাঙা হয়েছে সবই ছিল প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের থান কাপড়ের দোকান। উচ্ছেদের খবর জানতে পেরে নিজেদের মালামাল দ্রুত সরিয়ে নিয়েছে। আর তাদের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ফলে দোকান ভেঙে ফেলায় সাময়িক ক্ষতি হলেও দ্রুত তা কটিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু উকিলপাড়া রেল লাইন মোড় থেকে কাসেম মার্কেট, পেয়ার আলী মার্কেট ও জাকির মার্কেটের শতাধিক দোকান ভেঙে ফেলা হয়। আর ওইসব দোকানে ভাড়ায় হোসিয়ারী কারখানা পরিচালনা করতেন শ্রমিকেরা।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর