rabbhaban

ওয়াজিদ ও সোহায়ের পড়াশোনা থেকে মৃত্যু সবকিছু ছিল একসাথে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০৮ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
ওয়াজিদ ও সোহায়ের পড়াশোনা থেকে মৃত্যু সবকিছু ছিল একসাথে

নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে ভবন ধসের ঘটনায় দুই খালাতো ভাই মৃত্যুবরণ করেছে। নির্মম মৃত্যুর শিকার ওয়াজিদ ও সোহায়ের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সবকিছু একসাথে করতো। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুটাও একইসাথে ঘটেছে। তবে দুজন বিপরীত মেরুর ছিল। একজন নম্র, ভদ্র হলে অপরজন বেশ চঞ্চল ও ডানপিটে ছিল।

৬ নভেম্বর মৃত ওয়াজিদ ও সোহায়েহের বিদ্যাপিঠ সানরাইজ মডেল স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়।

জানা গেছে, ইফতেখার আহমেদ ওয়াজিদ (১১) সানরাইজ মডেল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে মেধা তালিকায় সপ্তম হয়েছিল। তার খালাতো ভাই মো. সোহায়ের (১২) একই স্কুলের একই শ্রেণিতে মেধা তালিকায় অষ্টম হয়েছিল।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক এস এম মহাসিন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘দুইজন ছাত্র হিসেবে ভাল ছিল। ওয়াজিদের রেজাল্ট সোহায়ের তুলনায় ভাল ছিল। ওয়াজিদ পড়াশোনার ভাল হওয়ার পাশাপাশি বেশ নম্র ও ভদ্র ছিল। আর সোহায়ের খুব চঞ্চল ও ডানপিটে ছিল। খেলাধুলা নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকতো সোহায়ের। এ বছরই তারা দুজনে এই স্কুলে পড়াশোনা শুরু করে। চলতি বছরে ষষ্ঠ শ্রেণির অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষায় সোহায়ের ৪৪৯ নম্বর পেয়েছে। আর ওয়াজিদ ৪৭৩ নম্বর পেয়ে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। তবে দুজনের উপস্থিতির দিক দিয়ে একেবারে অনিয়মিত ছিল।

তিনি আরো বলেন, তাদের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত। তাদের মত আর কোন মায়ের বুক যেন খালি না হয়। ওদের মত শিক্ষার্থীরা যারা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তাদের অভিবাবকরা যেন আরো সচেতন হয় সেই আহবান করবো।

সহকারী প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, আমার কাছে স্কুলের পাশাপাশি প্রাইভেট পড়তো তারা দুজনে। আমি তাদের ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে প্রাইভেট পড়াতাম। তারা দুজনের পড়াশোনায় মোটামুটি ভাল ছিল। তবে ওয়াজিদ একটু বেশি ব্রিলিয়েন্ট ছিল। তবে সোহায়ের অন্য দিক দিয়ে এক্সপার্ট, যেমন-খেলাধুলা ইত্যাদি।

গণিত শিক্ষক কেয়া আক্তার নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘‘ওরা দুভাই সব সময় বাম পাশের দ্বিতীয় বেঞ্চে একসাথে বসতো। তবে মাঝে মধ্যে ঝগড়াঝাটি করলে আমরা দুজনকে পৃথক বেঞ্চে বসিয়ে দিতাম। তবে আমরা (শিক্ষকরা) চলে গেলে তারা আবারো একই বেঞ্চে এসে বসতো।’’

তিনি আরো বলেন, সোহায়ের ওয়াজিদকে খোঁচা দিয়ে সব সময় ঝগড়া করতো। তখন ওয়াজিদ শিক্ষকদের কাছে নালিশ করতো, “টিচার সোহায়েব আমাকে মারতেছে”। তখন দুজনকে আলাদা করে দিতাম কিন্তু চলে গেলে দুজনে ফের এক বেঞ্চে এক সাথে বসতো। স্কুলে আসতো এক সাথে বাড়িতে যেত একসাথে। সবকিছুই এক সাথে করতো। তবে যেদিন ভবন ধসের ঘটনা ঘটে সেদিন কেন যেন ওয়াজিদ একা এসেছিল। স্কুল অনেক ফাঁকি দিত। একাধারে ৫-৭ দিন পর্যন্ত স্কুলে অনুপস্থিত থাকতো। ওয়াজিদ গণিত বিষয়ে সোহায়েবের তুলনায় ভাল ছিল।

ক্লাস টিচার আকলিমা আক্তার নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, মাস খানেক আগে হঠাৎ করে তারা দুজনের বলে আমরা আর স্কুলে আসবোনা। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেও এর জবাবে তেমন কোন ব্যাখ্যা না দিয়ে বলে ‘এমনি আসবেনা’।

সহপাঠী মেঘলা আক্তার নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানায়, ওয়াজিদ স্কুলের শেষ দিন (ভবন ধসের ঘটনার দিন) ওয়াজিদ আমার সাথে শুধু শুধু ঝগড়া করেছিল। তবে টিফিনের সময় অন্য সহপাঠী জুবায়ের টাকা ধার চায়। আমিও তাকে টাকা ধার দিয়ে দেই। পরবর্তীতে ওয়াজিদ আমার কাছে ৫ টাকা ধার চায়। কিন্তু টাকা না থাকায় আমি দিতে পারিনি। এরপর পরই ওয়াজিদ জানায় আগামীকাল আমি স্কুলে আসবোনা। তবে কেন আসবেনা এমন প্রশ্নের জবাবে জানায়, ‘এমনি আসবোনা, ভাল লাগেনা’।

এর আগে ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের বাবুরাইল এলাকায় নির্মাণাধীন চারতলা একটি ভবন ধসে পড়ে। ওই সময়ে সোহায়ের মারা যান। ওই ঘটনায় নিখোঁজ স্কুলছাত্র ইফতেখার আহমেদ ওয়াজিদের (১২) মৃতদেহ প্রায় সাড়ে ৪৭ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় ভবনের নিচ তলায় একটি দেয়ালে চাপাপড়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, ভবনটি মূলত একটি ডোবার উপর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানকার মানুষরাও এ ব্যাপারে অনেকবার নিষেধ করেছিলেন। ভবনটি কোন সয়েল টেস্ট কিংবা রাজউকের অনুমতি ছাড়াই নাকি পাইলিং ছাড়া নির্মান করা হয়েছিল। ছিলনা কোন ফাউন্ডেশনও। ভবনটি তিন তলা পর্যন্ত করার পরও লোড নিতে পারছিল কিন্তু সম্প্রতি ভবনটির চারতলার ছাদ ঢালাই দেয়া হয়। আর এ লোড নিতে না পেরে রোববার ধসে পড়ে ভবনটি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর