rabbhaban

সময় পেলে ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জের কিছু দর্শনীয় স্থানে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৩২ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, শনিবার
সময় পেলে ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জের কিছু দর্শনীয় স্থানে

ইট পাথরের যান্ত্রিক এ জীবনে মাঝে মধ্যেই মন চায় কিছুটা প্রকৃতির সাথে সাক্ষাত করতে। যান্ত্রিক জীবন আর কোলাহলমুক্ত পরিবেশে একদিকে যেমন মন প্রশস্ত হয় তেমনি প্রাণে লাগে প্রশান্তির ছোয়া। ছুটির দিনগুলো কিংবা অবসরে ঘুরে আসতে পারেন রাজধানী ঢাকা লগুয়া নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান থেকে।

মূলত নারায়ণগঞ্জের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে সোনারগাঁও যাদুঘর, তাজমহল, পানাম নগরী, রুপগঞ্জের জিন্দাপার্ক, হাজীগঞ্জের দূর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ, কদমরসুল দরগাহ, মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি, দেওভোগ লেক, হাতিরঝিল পার্ক।

সোনারগাঁও জাদুঘর :
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনটি সোনারগাঁও জাদুঘর হিসেবেই পরিচিত। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে।

সোনারগাঁও এক সময় মসলিনের জন্য জগৎ বিখ্যাত ছিল। মসলিনের বিকল্প জামদানি শাড়ি সরাসরি তৈরি করতে দেখা যাবে কারুপল্লীর ভেতরে। এখানে দেখার মতো রয়েছে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন জাদুঘর এবং ফাউন্ডেশন চত্বর। লেকঘেরা ফাউন্ডেশন চত্বরে রয়েছে কারুপল্লি, নৌকা ভ্রমণ ও টিকিট কেটে মাছ ধরার ব্যবস্থা।

বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁ দীর্ঘদিন সোনারগাঁও শাসন করেছেন। সোনারগাঁওয়ের চারদিকে নদী দিয়ে ঘেরা ছিল বলে সহজে সোনারগাঁওকে কোনো শত্রু আক্রমণ করতে পারতো না। ১৯৭৫ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর। কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা, আর বিদেশি পর্যটকদের জন্য ১শ টাকা।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গোয়ালদী গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানামনগর। পানামনগরের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক পানাম পুল। যারা জাদুঘর দেখতে আসেন তারা সাধারণত একটি বারের জন্য ঢুঁ মেরে যান পানাম নগরীতে।

বাংলার তাজমহল
২০০৮ সালে সোনারগাঁওয়ের মতো অজপাড়া গায়ে ভারতের আগ্রার তাজমহলের আদলে নির্মিত “বাংলার তাজমহল” এর ফটক সকলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে বসানো টাইলস, বিদেশি ডায়মন্ড ও পাথর, গম্বুজের ওপরে ব্রোঞ্জের তৈরি চাঁদ-তারায় আরো দৃষ্টিনন্দন বাংলার তাজমহল। প্রবেশ মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৫০ টাকা।

চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আহসানউল্লা মনি নিজস্ব অর্থে পেরাব গ্রামে নিজ বাড়িতে ১২ বিঘা জমির ওপর তাজমহলটি নির্মাণ করেন। তাজমহলে ব্যবহৃত টাইলস আনা হয়েছে ইতালি থেকে। বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে ১৭২টি বিদেশি ডায়মন্ড, পাথর। গম্বুজের ওপরে চাঁদ-তারা তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে চার মণ ওজনের ব্রোঞ্জ।

মনি জানান, সম্রাট শাহাজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রীর সমাধির ওপর ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ তাজমহল নির্মাণ করেন। যা বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সময়ের আবর্তে তাজমহলটি এখন বিশ্ববাসীর ভালবাসার মহান স্মৃতির চিহ্ন বহন করছে। এ কারণেই দেশের সাধারণ মানুষ যারা তাজমহল দেখতে ভারতের আগ্রায় যেতে পারবেন না তারা অনায়াসেই বাংলার তাজমহলটি দেখতে পারবেন।

পানাম নগরী
বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ের পানাম নগরী বীর ঈশা খাঁর সময়কালে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। সোনারগাঁয়ের রাজকার্য পরিচালিত হতো পানাম নগরী থেকে। বর্তমানে যে পানাম দাঁড়িয়ে আছে তার অবকাঠামো ব্রিটিশ আমলের। প্রাচীন পানাম চাপা পড়ে আছে আধুনিক পানামের নিচে। এখানে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য অট্টালিকা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুরঘর, গোসলখানা, নাচ ঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাকশাল, দরবার কক্ষ, প্রশস্ত দেয়াল, ভোজনালয়, বিচারালয়, প্রমোদ কুঞ্জ ইত্যাদি।

পানাম নগরীতে দেখা যায় চারশ’ বছরের পুরনো মঠ-বাড়ি। এর পশ্চিমে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি ‘নীলকুঠি’ রয়েছে। আছে পোদ্দার বাড়ি, কাশিনাথের বাড়ি, সোনারগাঁয়ের একমাত্র আর্টগ্যালারিসহ নানা প্রাচীন ভবন। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খিরাজ খাল। শেরশাহ আমলে নির্মিত সোনারগাঁ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইলের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড-ট্রাংক রোডের কিছু অস্তিত্ব পানামে আজো দৃষ্ট হয় বলে হাল আমলে তা পাকা করা হয়।

জিন্দা পার্ক
জিন্দা পার্ক এর অবস্থান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। এলাকার ৫ হাজার সদস্য নিয়ে “অগ্রপথিক পল্লী সমিতি” ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে। যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ ৩৫ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগের ফসল এই পার্কটি।

প্রায় ১০০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা জিন্দা পার্কে রয়েছে একটি কমিউনিটি স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী বিশিষ্ট একটি লাইব্রেরি, মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান, রয়েছে একটি রেস্তোরা. প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিজন ১০০ টাকা। ছোট বাচ্চাদের ৫০টাকা। খাবার নিয়ে প্রবেশ করলে টিকিটের মুল্য হবে ১২৫টাকা। এছাড়া লাইব্রেরিতে প্রবেশমূল্য ১০ টাকা এবং পুকুরে নৌকায় ঘুরে বেড়াতে পারেন, খরচ পড়বে ৩০ মিনিট ২০০ টাকা।

২৫০ প্রজাতির ১০ হাজারের বেশী গাছ-গাছালী আছে পার্কটিতে। যা পার্কের পরিবেশকে করেছে শান্তিময় সবুজ, কলকাকলীতে মুখর করেছে অসংখ্য পাখীরা। শীতল আবেশ এনেছে ৫ টি সুবিশাল লেক। তাই গরম যতই হোক পার্কের পরিবেশ আপনাকে দেবে শান্তির ছোঁয়া।

ফ্যামিলি পিকনিকের জন্য জিন্দা পার্ক এখন বেশ পরিচিত জায়গা। কাঠের ব্রিজ পার হয়ে দিঘির মাঝামাঝি তৈরি করা বাঁশের টি রুমে বসে প্রিয়জনের সঙ্গে এক কাপ চা কিংবা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার সময়গুলো দারুণ উপভোগ করবেন।

কদমরসুল দরগাহ
নারায়ণগঞ্জ শহরের ঠিক উল্টোপাশে নবীগঞ্জ এলাকায় রয়েছে এ কদমরসূল দরগাহ। সুউচ্চ দরগাহে যেতে উঠতে হয় উচূ টিলায়। রয়েছে বিশাল তোড়ন গেইট।

মির্জা নাথান ১৭শ শতকে রচিত তার বিখ্যাত “বাহির-স্থানই গায়েবী” বইটিতে সর্বপ্রথম নবীগঞ্জের এই পাথরটির কথা উল্লেখ করেন। ১৫৮০ সালে সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান সেনাপ্রধান মাসুম খান কাবুলি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তার অনেক পরে ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১৭৭৭-১৭৭৮ সালে নবীগঞ্জের একটি উঁচু স্থানে একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট দরগাহ নির্মাণ করে সেখানে পবিত্র সেই পাথরটি স্থাপন করেন। পরে কদম রসুল দরগার প্রধান ফটকটি গোলাম নবীর ছেলে গোলাম মুহাম্মদ ১৮১৪ সালে নির্মাণ করেন।

দেওভোগ লেক
এটি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে অবস্থিত। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এ পার্কটি নির্মান করা হয়েছে। পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে শেখ রাসেল পার্ক। এখানে হাতিরঝিলের আদলে করা হয়েছে একটি পার্ক। সাথে রয়েছে দেওভোগ লেক। নারায়ণগঞ্জ সিটির নগরবাসীর বিনোদনের জন্য এ পার্কটি নির্মান করা হয়েছে। যদিও পার্কটির পুরোপুরি কাজ এখনো শেষ হয়নি। পার্কটি অনেক বিশাল যায়গা নিয়ে করা হয়েছে। রাতের বেলায় পার্কের আলোকসজ্জা মুগ্ধ করে সকলকে। পার্কটির সাথে শহরের কয়েকটি প্রধান প্রধান লেক সংযুক্ত রয়েছে।

হাজীগঞ্জের দূর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ, মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি
হাজীগঞ্জ দূর্গ বা হাজীগঞ্জ কেল্লা শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। এটি বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত একটি কেল্লা। এখানে বর্তমানে বিভিন্ন নাটকের শ্যূটিং হয়, এ ছাড়াও দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন।

সোনাকান্দা দূর্গ বন্দরের সোনাকান্দায় অবস্থিত। এখানেই বিশাল যায়গাজূড়ে এই কেল্লা নির্মিত। কথিত আছে একটি কেল্লা থেকে আরেকটি কেল্লায় যাবার সুড়ঙ্গ ছিল মাটির নিচ দিয়ে যদিও তার কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি।

রুপগঞ্জের মুড়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত এ জমিদার বাড়ি। এখানে প্রাচীন জমিদার বাড়ির সকল কিছুই রয়েছে। রয়েছে রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন ঐতিজ্য। রয়েছেন জমিদারদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাব ও তৈজসপত্র।

এ ছাড়াও শহরের শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী পাথরঘাট, আড়াইহাজারের চৌদ্দার চর, সোনারগাঁয়ের বারদী ইউনিয়নের মেঘনা নদীর ঠিক মাঝখানে জেগে উঠা মায়াদ্বীপ, রুপগঞ্জের বাঙ্গাল বাড়ি, জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর