নারায়ণগঞ্জে প্রথম শত্রুমুক্ত হয়েছিল আড়াইহাজার


মাসুম বিল্লাহ, স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:১৮ পিএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার
নারায়ণগঞ্জে প্রথম শত্রুমুক্ত হয়েছিল আড়াইহাজার

৯ ডিসেম্বর আড়াইহাজার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে সংগ্রামী জনতা এদেশকে স্বাধীন করেছে। জীবনবাজি রেখে পানির নিচ দিয়ে ডুব সাঁতার দিয়ে পিলারের নীচে ডিনামাইট ফিট করে পাঁচরুখী ব্রীজ উড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেই আড়াইহাজার উপজেলায় বিজয়ের সূচনা হয়। জেলায় প্রথম স্বাধীন পতাকা উড়ে আড়াইহাজারে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় সর্বপ্রথম শত্রুমুক্ত হয়েছিল আড়াইহাজার থানা।

৯ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানা শত্রুমুক্ত হয়েছিল। প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসুচী পালনের মাধ্যমে দিনটি উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকে। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আড়াইহাজার এলাকাটি শক্রমুক্ত হয়। উপজেলার পাঁচরুখী ব্রীজ, ডহরগাঁও এবং মেঘনা নদী দিয়ে বিভিন্ন শত্রুমুক্ত করতে অপারেশন চালানো হয়। প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকবাহিনী ওই সময় আড়াইহাজার থানা এলাকা ছেড়ে ভুলতা দিয়ে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা থানা সদরের ডাক বাংলায় অবস্থিত পাক বাহিনীর ক্যাম্প দখল করে নেয়। সেই সাথে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়িয়ে আনন্দ উল্লাস করতে থাকেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলার মধ্যে প্রথম শত্রুমুক্ত হয় আড়াইহাজার থানা। জেলায় প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ে আড়াইহাজারে। প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে পাকবাহিনী আড়াইহাজার ছেড়ে পালায়। থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমএ সামাদ আড়াইহাজার সদরে অবস্থিত ডাকবাংলোতে স্থাপিত পাকবাহিনীর ক্যাম্প দখল করে নেন। সে সাথে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়িয়ে আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়েন। আড়াইহাজার থানা কমান্ডার স্থল ও জলপথ দুই দিক দিয়েই ডিসেম্বরের প্রথমে সদরের পাক সেনাদের ক্যাম্পে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। রাজাকার মারফত খবর পেয়ে পাকবাহিনীর চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত তারা ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ছিল ভরা বর্ষাকাল। কিন্তু নভেম্বর ও ডিসেম্বরে এসে চারিদিকে শুকনো মাঠ-ঘাট। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পাকবাহিনী রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। ৯ ডিসেম্বর সকালে আক্রমণ চালাতে এসে মুক্তিযোদ্ধারা দেখেন কেউ নেই। কিছু হাড়ি-পাতিল, চাল, ডাল ও আটার বস্তা পড়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমএ সামাদ স্বাধীন দেশের পতাকা উড়িয়ে আড়াইহাজারে বিজয় ঘোষণা করেন।

‘সেই দিনটি ঈদের দিনের চেয়ে বেশি আনন্দের দিন ছিল। আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম। এই আমার দেশ। এই আমার দেশের মাটি। স্বাধীন করতে পেরেছি। দীর্ঘ ৪০ বছরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন রণাঙ্গণের বীর সেনা আড়াইহাজার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি  কমান্ডার কাজী ওয়াজ উদ্দিন।’

মুক্তিযোদ্ধা কাজী ওয়াজউদ্দিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘মফস্বল এলাকা বলে আড়াইহাজার থানা এলাকায় পাকবাহিনী মে মাসের শেষের দিকে ঢুকে। প্রথমেই আতংক সৃষ্টির জন্য তারা কয়েকটি গ্রাম থেকে হিন্দু মুসলমান মিলিয়ে ১৭ জন লোক ধরে নিয়ে যায়। কালীবাড়ী ব্রিজের পাশে (ঋষিপাড়ায়) খালপাড়ে সেই নিরীহ ১৭ জন গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে।

এখানে (ঋষিপাড়ায়) একটি গণকবর রয়েছে। মে মাসে পাঁচরুখী গ্রামে পাকবাহিনী আরো একটি গণহত্যা চালায়। ১৬ জন গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। পাঁচরুখীতেও একটি গণকবর রয়েছে। দুটি গণহত্যা চালিয়ে পাকবাহিনী ফিরে যায়। তারা প্রথমবার আড়াইহাজারের ভেতরে প্রবেশ করেনি। এরই মধ্যে মুক্তিকামী যুবক শ্রেণি যে যার মতো ভারতে চলে যায় ট্রেনিং এর জন্য।

মুক্তিযোদ্ধা মোঃ লাল মিয়া জানান, মে মাসে ট্রেনিং নিতে ভারতে যাই। ভারতের মেলাঘর এলাকায় ২নং সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ আমাদের ট্রেনিং দেন। টুআইসি ছিলেন মেজর হায়দার। আমরা ২২ জন যুবক ট্রেনিং শেষ করে অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে আগস্টের প্রথমে দেশে ফিরে আসি। এরই মধ্যে জুলাইয়ের প্রথম দিকে আড়াইহাজার থানা সদর ও ডাকবাংলোতে পাকহানাদার বাহিনী স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। বিভিন্ন গ্রামে শান্তিবাহিনীও গঠিত হয়েছে। রাজাকার আলবদরদের অপকর্ম চলছে। পাক বাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প করার কারণও জানা গেল। জুনের শেষের দিকে গিয়াস উদ্দিনের (বীর প্রতীক) নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জের একদল মুক্তিযোদ্ধা আড়াইহাজার থানায় দুঃসাহসিক অপারেশন চালিয়েছিল। নারায়ণগঞ্জের সেই গ্রুপের সাথে ঝাউগড়ার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজও ছিল। এই অপারেশনের পর আড়াইহাজার থানা সদরে পাক মিলিটারী বাহিনী স্থায়ী ক্যাম্প করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই তাদের কার্যক্রম চলতে থাকে। কিন্তু আগস্টে ভারত থেকে ফিরে মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়।

অপারেশন পাঁচরুখী ব্রিজ
মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, আড়াইহাজারের পশ্চিম অঞ্চলে প্রথম অপারেশনটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বুধবার গভীর রাতে এই অপারেশনটি পরিচালিত হয়। থানা কমান্ডার এমএ সামাদ কাজী ওয়াজ উদ্দিন জীবন বাজী রেখে অপারেশনটি পরিচালনা করেন।

অপারেশনটি ছিল পাঁচরুখী লোহার ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া। পাক বাহিনী ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এই ব্রিজ দিয়েই গোলাবারুদ নিয়ে দেশের পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত করতো। মুক্তিযোদ্ধরা পরিকল্পনা নেন এই ব্রিজটি উড়িয়ে দিলে পাক বাহিনীর স্থলপথে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের মানুষ অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবে। পাঁচরুখী ব্রিজটি ছিল ব্রিটিশ আমলের। লোহার এই ব্রিজটি ছিল খুবই মজবুত।

১৪০ পাউন্ড (পিকে) এক্সক্লুসিভ ব্যবহার করা হয়েছে এই অপারেশনে। যা দিয়ে একটি ১০ তলা বিল্ডিং সহজেই গুড়িয়ে ফেলা সম্ভব।

ঝুঁকিপূর্ণ এই অপারেশন সম্পর্কে কাজীওয়াজ উদ্দিন বলেন, ব্রিজের উপর খান সেনাদের পাহাড়া ছিল। দেখতে পেলেই গুলি করবে। অপরদিকে হাতে ছিল ডেটোনেটর এক্সক্লুসিভ। হিসাবে এক চুল পরিমাণ ভুল হলেই বিষ্ফোরণে দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। সামাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে রাত ১২টায় অপারেশন শুরু হল। পানিতে ডুব দিয়ে ব্রিজের গোল খাম্বা গুলোতে এক্সক্লুসিভ পেঁচিয়ে উপরে এক্সক্লুসিভ লাগাতে লাগাতে পৌনে এক ঘণ্টা সময় লাগে। এক্সক্লুসিভ লাগানোর পর ৫০ গজ দূরে এসে আমরা ডেটোনেটর চার্জ করি। রাত ১টায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাঁচরুখী ব্রিজ উড়িয়ে দিতে সক্ষম হই। ব্রিজ উড়ে গেলেও খাম্বাগুলোর কিছুই হয়নি। এই অপারেশনের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর মনে আতংক ধরিয়ে দেয়। আড়াইহাজারের এই সফল অপারেশনে জেলার অন্যান্য এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে। চরমপত্রেও বিচ্ছুবাহিনীর এই কৃতিত্বের কথা প্রচারিত হয়েছে।

অপারেশন ডহরগাঁও
সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ভাগে মুক্তিযোদ্ধারা তিতাস গ্যাসের জাতীয় গ্রিড লাইন উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধারা  দুপ্তারা ও গোলাকান্দাইলের বর্ডারে ডহরগাঁও গ্রামে ভিতরের পাইপলাইন (জাতীয় গ্রিড লাইন) ধ্বংসের ছক তৈরি করেন। ৭ ফুট গভীর সুরঙ্গ পথ তৈরি করতেই ২ রাত লেগে যায়। পাইপ লাইনের চারপাশের মাটি সরিয়ে এক্সক্লুসিভ পেচানো হয়। তারপর নিরাপদ দূরত্বে এসে ঘটানো হয় বিস্ফোরণ। প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটলে রাতের আকাশে কিছু সময়ের জন্য তৈরি হয় আলোর ফোয়ারা। যেন আতশবাজী ফুটছে। আশেপাশের গ্রামবাসী প্রথম ভয় পেলেও পরে বুঝতে পারে মুক্তিবাহিনীর কাজ। এই অপারেশনটিও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে কমান্ডার এমএ সামাদ ব্যাকআপ দেয়ার জন্য এক গ্রুপ মুক্তিযোদ্ধা রেখেছিলেন পেছনে। যাতে সমানের গ্রুপ নিরাপদে ফিরে আসতে পারে।

মুক্ত হল ভুলতা ক্যাম্প
জাতীয় গ্রিডলাইন (তিতাস গ্যাসের) উড়িয়ে দেয়ার পরদিন মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সতর্ক ছিলেন। ডহরগাঁও ও বাজবিতে মুক্তিবাহিনী বাংকার বানিয়ে পজিশন নেয়। তারা এমবুশ করা অবস্থায় ছিল। তিতাসের গ্যাস লাইন উড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় পাকবাহিনী বিপদ আঁচ করতে পেরেছিল ঠিকই। গ্রামে ঢোকার মুখেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে শেষমেষ লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। ঐ দিনই মৃত্যুভয়ে পাকবাহিনী ভুলতা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পটি দখল কের নেয়। এ বিজয়ের খবরে আড়াইহাজারের মুক্তিযোদ্ধারা আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠে। অক্টোবর মাসে প্রভাকরদীতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ এম্বুশ অবস্থায় ছিল। ফলে এদিকে আর পাকবাহিনী ধাবিত হয়নি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর