‘লাশটি পাশের ঘরে আছে নিয়ে যান’ এ যেন এক কেয়ামতের ময়দান


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:৫২ পিএম, ০৯ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার
‘লাশটি পাশের ঘরে আছে নিয়ে যান’ এ যেন এক কেয়ামতের ময়দান

করোনা সন্দেহে মারা গেছে খবরে একের পর এক ফোন পেয়ে চারজনকে নিয়ে ছুটে নিজ ওয়ার্ড জামতলায় ছুটে যান স্থানীয় ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। সে বাসায় গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। অন্য রুমে থাকা স্ত্রী আর সন্তানেরা ‘প্রিয়’ বাবার ঘরটি দেখিয়ে দেয় খোরশেদকে বলেন ‘পাশের ঘরে ওই রুমে লাশটি পড়ে আছে নিয়ে যান’।

যাদের বছরের পর বছর লালন পালন করেছেন, যাদের জন্য নিজের শ্রম দিয়ে অট্টালিকা গড়েছেন, ধন সম্পদ বানিয়েছেন বিদায়ের বেলাতে অনেকটা নির্মমতায় বিদায় নিত হলো ৭০ বছর বয়সী আফতাবউদ্দিনকে।

খোরশেদ নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এ যেন এক কেয়ামতের আলামত। এ যেন এক কেয়ামতের ময়দান। কারণ কেয়ামতের ময়দানেও আমরা ইয়া নফসি ইয়া নফসি করবো। সেখানে বাবা চিনবে না মাকে, স্ত্রী চিনবে না স্বামীকে, সন্তান বাবা মা কেউ কাউকে চিনবে না।’

তিনি বলেন, ‘জামতলায় আফতাবউদ্দিনের বাড়িতে সে ধরনের এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। স্বজনেরা আফতাবউদ্দিন যে ঘরে মারা গেছে সেই ঘর দেখিয়ে দেয়। ঘরে গিয়ে দেখি মাথা অর্ধেক ঘাটের উপর আর শরীরে অর্ধেক ফ্লোরে। কেউ লাশ ধরতে আসে নাই। পরিবারের কেউও ঘরে আসে নাই। পাশের ঘরে থেকেই আমাদের লাশ দেখিয়ে দেয়।’

খোরশেদ বলেন, ‘আমাদের মৃত্যুর পরে লাশের সঙ্গে কেউ যাবে না এটা নির্মম সত্য হলেও নিজের পরিবারের লোকজনদের জানাযা দেওয়া যাচ্ছে না। মৃতদেহও শেষ সময়ে কেউ দেখতে পারছে না। এর চেয়ে বড় নির্মম আর কি হতে পারে। কিন্তু এটাই এখন বাস্তবতা। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এ ধরনের করোনাতে মৃত্যু হলে বড় কষ্ট লাশের পাশে কেউ থাকছে না। পরিবার পরিজন স্ত্রী সন্তান স্বামী বাবা মা কাউকেই পাশে পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘করোনায় মৃত্যুবরণ করা হলে আশেপাশের লোকজনও সরে যাচ্ছে। কেউ করোনাতে আক্রান্ত হলে ওই বাড়ির উপর আক্রোশে ফেটে পড়েন আশেপাশের লোকজন। এটা ঠিক না। এটা এইডস রোগ না। এটা বিশ্বের একটি মহামারী। অনেক দেশের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

করোনা থেকে মুক্তি পেতে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঘরে থাকার বিনীত অনুরোধ জানান এ কাউন্সিলর।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে করোনা উপসর্গ কিংবা এ রোগে কেউ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে দাফনের ঘোষণা ছিল ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের। সেই ঘোষণা মোতাবেক ৮ এপ্রিল বুধবার দুপুরে মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে একজনের দাফন কাফন সম্পন্ন করেছেন তিনি।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলা এলাকায় ৫ দিন ধরে করোনার উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ থাকায় পর আফতাব উদ্দিন (৭০) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। বুধবার (৮ এপ্রিল) পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে তাকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) পক্ষ থেকে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ঘরের ভেতরে একটি খাটে মৃতদেহ পড়ে থাকলেও পরিবারের কেউ সেটা ধরেনি। পরে কাউন্সিলর লোকজন নিয়ে মৃতদেহ নিয়ে মাসদাইরে কবরস্থানে দাফন করেন।

নাসিক ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ জানান, পরিবারের দাবি করোনা ভাইরাসের সকল উপসর্গ নিয়ে গত ৫ দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। পরে বুধবার দুপুরে তিনি মারা যান। মারা যাবার পর পরিবার কেউ করোনা আতংকে কাছে ঘেঁষছিলেন না। আমাদেরকে দাফনের জন্য অনুরোধ করলে আমরা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের সার্বিখ সহযোগিতায় সকল নিয়ম মেনে মাসদাইরে সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করেছি।

খোরশেদ বলেন, কথা দিয়েছিলাম করোনা আক্রান্ত মরদেহ দাফন করবো। আজ বুধবার বাদ ফজর ফোন পেলাম জামতলায় আফতাব উদ্দিন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেসে। স্বেচ্ছাসেবক আরিফুজ্জামান হীরা, হাফেজ আকরাম ও জুনায়েদকে নিয়ে মেয়র মহোদয় ও ফতুল্লা পুলিশের সহযোগিতায় বাসা থেকে লাশ সংগ্রহ করে, কবর খনন, গোসল ও জানাজা শেষে দাফন করলাম।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর