সেই ৬ দফা : ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে ১০ জন নিহত’


এস এম শহিদুল্লাহ | প্রকাশিত: ০৮:৪১ পিএম, ০৬ জুন ২০২০, শনিবার
সেই ৬ দফা : ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে ১০ জন নিহত’ দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ জুন ১৯৬৬ খ্রিঃ

৭ জুন ছয় দফা দিবস। ছয় দফাকে বলা হয় থাকে বাঙালির মুক্তির সনদ। ছয় দফা আন্দোলনে স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। ছয় দফা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের অবদান ছিল উল্লেখ করার মতো। যা আজও স্মরণীয়।

১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ চলে ১৭ দিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের দ‚তিয়ালিতে তাসখন্দে পাকিস্তান-ভারত শীর্ষ বৈঠক শুরু হয় ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারি। ১০ জানুয়ারি একটা সমঝোতা চুক্তিতে সই দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। তাসখন্দ চুক্তিতে ভারতের কাছে পাকিস্তানের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগে পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব খান সমালোচিত হন।

তাসখন্দ চুক্তি পর্যালোচনা করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদরা ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে একটি জাতীয় সম্মেলন ডাকেন। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নসরুল্লাহ খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানকে এ সম্মেলনে যোগ দিতে বলেন।

৪ ফেব্রুয়ারি তাজউদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে শেখ মুজিব লাহোরের উদ্দেশে রওনা হন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ২১ জন রাজনীতিবিদ এ সম্মেলনে যোগ দেন।

৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসায় কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে সম্মেলন শুরু হয়। সাবজেক্ট কমিটির সভায় শেখ মুজিবুর রহমান একটি ‘ছয় দফা’ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উপস্থিত অন্য সবার আপত্তির মুখে শেখ মুজিবের প্রস্তাব সম্মেলনের এজেন্ডায় রাখা হলো না। শেখ মুজিব ক্ষুব্ধ হয়ে সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছয় দফার কথাগুলো তুলে ধরেন।

১০ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সঙ্গে আলোচনা না করে এই পর্যায়ে তাসখন্দ চুক্তি সম্বন্ধে তিনি কিছু বলবেন না। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে লাহোর সম্মেলনে সাবজেক্ট কমিটিতে দেওয়া প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দেওয়া ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত করে আন্দোলনের জন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হলে তিনি তার সঙ্গে থাকবেন।

ছয় দফা নিয়ে একটা চূড়ান্ত ফয়সালার উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব ১৮-১৯ মার্চ (১৯৬৬) ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভা ডাকেন। সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের অনুপস্থিতিতে সভায় সভাপতিত্ব করেন সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কাউন্সিল সভায় ছয় দফা অনুমোদন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং তাজউদ্দিনআহমদকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিও গঠন করা হয়।

আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ২০ মে কার্যকরী কমিটির সভায় ৭ জুন মঙ্গলবার, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের আহবান জানায়। সে আহবানে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বিপুলভাবে সাড়া দেয়। বিশেষ করে ৭ জুন হরতালের দিন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা জড়িয়ে পড়ে। ৭ জুন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও তেজগাঁয় পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহত ও অগণিত মানুষ আহত হন। এ সংক্রান্ত সংবাদ দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক ৮ জুন সংখ্যায় প্রধান সংবাদ ছাপে।

যা ছিল
‘নারায়ণগঞ্জ এক উচ্ছৃংখল জনতা সকাল ৬-৩০ মিনিটের সময় গলাচিপা রেলওয়ে ক্রসিং এর নিকট ঢাকাগামী ট্রেন আটক করে। পরে জনতা নারায়ণগঞ্জগামী ৩৪ নং ডাউন ট্রেন আটকাইয়া উহার বিপুল ক্ষতি সাধন ও ড্রাইভারকে প্রহার করে। জনতা জোর করিয়া যাত্রীদের নামাইয়া দেয়। যাত্রীদের উদ্ধারের জন্য আগত একটি পুলিশ দল আক্রান্ত এবং বহু সংখ্যক পুলিশ কর্মচারী আহত হন। পুলিশ দল লাঠিচার্জের সাহায্যে জনতা ছত্রভঙ্গ করিয়া দেয়। অতঃপর বন্দুকসহ মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে একদল জনতা নারায়ণগঞ্জ থানা আক্রমণ করিয়া দারুণ ক্ষতিসাধন এবং বন্দুকের গুলিতে পুলিশ অফিসারদের জখম করে। উচ্ছৃঙ্খল জনতা থানা ভবনে প্রবেশ করার পর পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণ করার ফলে ছয় ব্যক্তি নিহত আরও ১৩ ব্যক্তি আহত হয়। ৪৫ জন পুলিশ আহত হন এবং তাঁহাদের মধ্যে কয়েকজনের আঘাত গুরুতর।

পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী জনাব এম, এ, তাহেরের মোটর গাড়ী ভস্মীভুত ও তাহার বাড়ী লুন্ঠিত হয়। নারায়ণগঞ্জ ও চাষারার মধ্যে রেলওয়ে সিগন্যালিং লাইন বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলা হয়।... দুপুরে আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ডেমরা এলাকার শ্রমিকগণ ১৪৪ ধারা লংঘন করিয়া শোভাযাত্রা সহকারে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হইতে থাকে। ঢাকা নগরীর দুই মাইল দূরে ই, পি, আর বাহিনীর একটি দল শোভাযাত্রার গতিরোধ করে।..."৮ জুন ১৯৬৬ খ্রিঃ, দৈনিক ইত্তেফাক।

এর পূর্বে ছয় দফার প্রণেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার পক্ষে জন-জাগরণের উদ্দেশ্য নিয়ে দেশব্যাপী মিটিং করেন। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ টাউন হল মাঠে (বর্তমান এখানে শহীদ জিয়া হল প্রতিষ্ঠিত) ৮ মে বিরাট জনসভা করে ঢাকায় ফিরে রাতে গ্রেফতার হন। ৭ জুন (১৯৬৬) শেখ মুজিব ছিলেন জেলে আবদ্ধ।

সে অবস্থায় তিনি ৭ জুন সম্পর্কে যা লিখেন (যা `কারাগারের রোজনামচা` গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে) :৭ জুন ১৯৬৬ : মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কি হয় আজ? আব্দুল মোনায়েম খান যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হয় কিছু একটা ঘটবে আজ। কারাগারের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে খবর আসলো দোকান-পাট, গাড়ী, বাস রিকশা সব বন্ধ। শান্তিপ‚র্ণভাবে হরতাল চলছে। এই সংগ্রাম একলা আওয়ামী লীগই চালাইতেছে। আবার সংবাদ পাইলাম পুলিশ আনছার দিয়ে ঢাকা শহর ভরে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই জনগণ বে-আইনী কিছু করবে না। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার প্রত্যেক্টি গণতান্ত্রিক দেশের মানুষের রয়েছে। কিন্তু এরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে দিবে না।

আবার খবর এলো টিয়ার গ্যাস ছেড়েছে। লাঠিচার্জ হতেছে সমস্ত ঢাকায়। আমি তো কিছুই বুঝতে পারি না। কয়েদিরা কয়েদিদের বলে। এই বলাবলির ভিতর থেকে কিছু খবর বের করে নিতে কষ্ট হয় না। তবে জেলের মধ্যে মাঝে মাঝে প্রবল গুজবও রটে।

অনেক সময় এসব গুজব সত্যই হয়, আবার অনেক সময় দেখা যায় একদম মিথ্যা গুজব। কিছু লোক গ্রেপ্তার হয়ে জেল অফিসে এসেছে। তার মধ্যে ছোট ছোট বাচ্চচাই বেশী রাস্তা থেকে ধরে এনেছে।

১২ টার পরে খবর পাকাপাকি পাওয়া গেলো যে হরতাল হয়েছে, জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। তারা ছয়দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়, বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যাক্তি স্বাধীনতা চায়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, কৃষকের বাঁচবার দাবি তারা চায় - এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যে হয়েই গেল।

এ খবর শুনলেও আমার মনকে বুঝাতে পারছি না। একবার বাইরে একবার ভিতরে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। বন্দি আমি জনগণের মঙ্গল কামনা ছাড়া আর কি করতে পারি ! বিকেলে আবার গুজব শুনলাম গুলি হয়েছে, কিছু লোক মারা গেছে। অনেক লোক জখম হয়েছে। মেডিকেল হাসপাতালেও একজন মারা গেছে। একবার আমার মন বলে, হতেও পারে, আবার ভাবিসরকার কি এত বোকামি করবে ? ১৪৪ দেওয়া হয় নাই। গুলি চলবে কেন ? একটু পরেই খবর এল ঢাকায় ১৪৪ জারি করা হয়েছে। মিটিং হতে পারবে না। কিছু জায়গায় টিয়ার গ্যাস মারছে সে খবর পাওয়া গেল।

বিকালে আরো বহুলোক গ্রেপ্তার হয়ে এল। প্রত্যেককে সামারী কোর্ট করে সাজা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাহাকেও এক মাস, কাহাকেও দুই মাস। বেশীরভাগ লোকই রাস্তা থেকে ধরে এনেছে শুনলাম। অনেকে নাকি বলে রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম ধরে নিয়ে এল। আবার জেলও দিয়ে দিল। সমস্ত দিনটা পাগলের মতোই কাটলো আমার। তালাবদ্ধ হবার পূর্বে খবর পেলাম, নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁ, কার্জন হল, পুরানা ঢাকার কোথাও কোথাও গুলি হয়েছে। তাতে লোক মারা গেছে। বুঝতে পারি না সত্য কি মিথ্যা ! কাউকে জিজ্ঞাসা করতে পারি না। সেপাইরা আলোচনা করে, তার থেকে কয়েদিরাশুনে আমাকে কিছু কিছু বলে।

তবে হরতাল যে সাফল্যজনকভাবে পালন করা হয়েছে সে কথা সকলেই বলছে। এমন হরতাল নাকি কোনদিন হয় নাই। এমনকি ২৯শে সেপ্টেম্বরও না। তবে আমার মনে হয় ২৯শে সেপ্টেম্বরের মতই হরতাল হয়েছে।

গুলি ও মৃত্যুর খবর পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। শুধু পাইপটা টানছি - যে এক টিন তামাক বাইরে আমি ছয়দিন খাইতাম, সেইটিন এখন চারদিনে খেয়ে ফেলি। কি হবে ? কি হতেছে ? দেশকে এরা কোথায় নিয়ে যাবে, নানা ভাবনায় মনটা আমার অস্থির হয়ে রয়েছে। এমনিভাবে দিন শেষ হয়ে এল। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা জেলে আছি। তবুও কর্মীরা, ছাত্ররা ও শ্রমিকেরা যে আন্দোলন চালাইয়া যাইতেছে, তাদের জন্য ভালবাসা দেওয়া ছাড়া আমার দেবার কিছুই নাই।

মনে শক্তি ফিরে এল এবং আমি দিব্যচোখে দেখতে পেলাম `জয় আমাদের অবধারিত`। কোন শক্তি আর দমাতে পারবে না।

অনেক রাত হয়ে গেল, ঘুম তো আসে না। নানা চিন্তা এসে পড়ে। এ এক মহাবিপদ। বই পড়ি, কাগজ উল্টাই - কিন্তু তাতে মন বসে না। ভুুুলে গেছি, বিকালে কয়েক মিনিটের জন্য জেলার সাহেব আমাকে দেখতে এসেছিলেন। তাঁর শরীরও ভাল না দেখলাম। আজ অসুখ থেকে উঠে এসেছেন। আমার মন ভাল না তাই বললাম, কিছু কথা আছে, দুই একদিন পরে আসবেন। তিনি বললেন, `আসবো`। বিদায় নিলেন।

দৈনিক আজাদ পত্রিকা সংবাদ পরিবেশন ভালই করেছে, ‘আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আজ প্রদেশে হরতাল’। হরতালকে সাফল্যমÐিত করার জন্য আওয়ামী লীগের একক প্রচেষ্টা।’ প্রোগ্রামটাও দিয়েছে ভাল করে।

পাকিস্তান অবজারভার হেড লাইন করেছে ‘হরতাল’ বলে। খবর মন্দ দেয় নাই। মিজানের বিবৃতিটি চমৎকার হয়েছে। হলে কি হব, `চোর নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী।`

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর