পানিতে বিষিয়ে উঠা এক জনপদের গল্প


সোহেল রানা,স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:০৫ পিএম, ২৪ জুলাই ২০২০, শুক্রবার
পানিতে বিষিয়ে উঠা এক জনপদের গল্প

ফতুল্লা ইউনিয়নের লালপুর পৌষা পুকুরপাড় এলাকা। প্রায় এক যুগ ধরে জলাবদ্ধতা এই এলাকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে এতদিন শুধু নিচু এলাকায় পানি থাকলেও এবারের অতি বর্ষণে পানি উঠেছে লালপুরের সবচেয়ে উচু এলাকাতেও। আর নিচু এলাকায় কোমর পানি। মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে আশেপাশের বিভিন্ন ডাইংয়ের বিষাক্ত বর্জ্য। সব মিলিয়ে এই এলাকার মানুষের জীবন বিষিয়ে উঠেছে। বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে অর্ধেকেরও বেশি বাসিন্দা। ফলে এক সময়কার জাকজমকপূর্ণ লালপুর এখন জনমানবহীন সুনশান জলাভূমিতে পরিণত হচ্ছে।

স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায় প্রায়, এক যুগ ধরে জলাবদ্ধতার কারণে ধীরে ধীরে এলাকায় নতুন ভাড়াটিয়ার আগমন কমতে থাকে। জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা ভাড়াটিয়ারাও। অল্প কিছু ভাড়াটিয়া নিয়ে রীতিমতো জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বাড়িওয়ালারা বসবাস করলেও অতিষ্ঠ হয়ে এখন তাঁরাও এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। যে কারণে এলাকার অধিকাংশ বাড়ি এখন প্রায় ফাঁকা। জনমানবহীন এলাকায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া অধিকাংশ দোকন এবং ছোট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে।

২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায় এমন লালপুর এলাকার এমন দৃশ্য। সাড়িসাড়ি বহতল এবং টিন সেট বাড়ি থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে কোনো ভাড়াটিয়া নেই। কোনো কোনো বাড়িতে দুই একটি ভাড়াটিওয়া আছে। আবার কোনো কোনো বাড়িতে শুধুই বাড়িওয়ারা বসবাস করছেন। মানুষ না থাকায় এলাকার অধিকাংশ দোকান ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। পুরো এলাকাজুড়ে এখন শুধুই থৈ থৈ করছে বিভিন্ন ডাইংয়ের কেমিক্যাল মিশ্রিত দুর্গন্ধ যুক্ত বিষাক্ত পানি। আর সেই পানির মধ্যে চলাচলের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে নৌকা।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘শীতের মধ্যে আশপাশে দেখবেন কুয়াশা আর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখবেন পানি। ১৫ বছর ধরে আমরাদের এই সমস্যা। কিন্তু আমরা কোনো সুরাহা পেলাম না। প্রতি বছর যখন বর্ষা মৌসুম আসে তখন সবাই আশ্বাস দেয় যে এবারই শেষ। পরের বার থেকে আর পানি থাকবে না। কিন্তু প্রতি বছরই এমন দুর্ভোগ নিয়ে আমরা বসবাস করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এলাকা ছিল সব থেকে জাকজমকপূর্ণ এলাকা। রাত ১২টা পর্যন্ত এই এলাকায় মানুষ থাকতো। ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতো। কারণ পাশের রাস্তায় সুনশান থাকতো। তাই অনেকে চুরি ছিনতাইয়ের ভয়ে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতো। কিন্তু এখন এই এলাকায় দিনের বেলাতেও মানুষ পাওয়া যায় না। শুনশান হয়ে গেছে।’

এই এলাকায় একসময় লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করতো। তবে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ার এখন এলাকায় কত সংখ্যক মানুষ বসবাস করেন তা জানাতে পারেনি এলাকাবাসী। তবে কিছু মানুষ এই জলাবদ্ধতার মধ্যেও বসবাস করছেন। যাদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী, অসুস্থ রোগী রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। যাতায়াতের জন্য নৌকা এবং ভ্যানগাড়ি থাকায় যুবকদের ভোগান্তি তুলনামূলক কম হলেও শিশু, বৃদ্ধ, রোগী এবং গর্ভবতী নারীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতার কারণে ভয়াবহ দুর্ভোগের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে ওই এলাকার ফার্মেসীর মালিক মোল্লা মিয়া নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘কোমর পর্যন্ত পানি তাই কোনো গাড়ি চলাচল করে না। আমাদের চলাচলের একমাত্র ভরসা এখন নৌকা। এলাকায় মাত্র চারটা নৌকা চলে। ৩ টা চেয়ারম্যানের। আর ১ টা এলাকার একজনের কেনা। কিন্তু জরুরি প্রয়োজন হলে অনেক সময় পাওয়া যায় না। কয়েকদিন আগেই গর্ভবতী এক নারীকে জরুরী হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। একটা ভ্যানগাড়ি কি নৌকা কিছুই পাচ্ছিলাম না। ওই নারীর আত্মীয় স্বজন কান্না করতেছিল যে এই এলাকা থেকে একবার বের হতে পারলে আর জীবনে পা রাখবে না। এই অভিজ্ঞতা অনেকের সাথেই হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় মানুষ কমতে কমতে এখন শেষের দিকে। আমার মত যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিল সবার ব্যবসা শেষ। এলাকায় মানুষ নাই ব্যবসা করবো কিভাবে? যারা শুধু বাড়ি ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতো তাঁরাও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘সব সময় ডাইংয়ের নোংরা পানি পাড়াতে পাড়াতে এলাকাবাসীর প্রায় সবাই বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। অধিকাংশ মানুষের চর্মরোগ হয়েছে। ওষুধ খেলেও ভালো হয় না। কারণ সকালে ওষুধ খাবে একটু পরে আবার বেরিয়ে এই পানিই পাড়াতে হবে।’

স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায়, ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন সহ আরো তিনটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। কিন্তু লালপুর পৌষা পুকুরপাড় এলাকাটির জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ এখনো কেউ নিতে পারেনি। সেই সাথে ওই এলাকার কয়েকটি ডাইংয়ের পানিতে প্রতিনিয়ত এলাকাটি প্লাবিত হলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি। বাধ্য হয়ে নিজেদের অর্থায়নে তিনটি পাম্প বসিয়ে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এলাকাবাসী।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এখানে শুধু বৃষ্টির পানি না। কয়েকটা ডাইংয়ের পানি আমাদের এলাকায় ফেলা হয়। তাঁরা ডাইং চালিয়ে কোটি টাকা আয় করে আর আমদেরকে গাধার খাটুনি খাটতে হয়। নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে তাঁদের ডাইংয়ের পানি আমাদেরকে সরাতে হয়। ডাইংয়ের পানি ফেলার জন্য কয়েকদিন আগে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জরিমানা করেছিল। কিন্তু কিছুই বদলায় নাই। এখন তাঁরা আবার পানি এখানেই ফেলছে।’

জলাবদ্ধতায় আটকা পড়া এলাকাটির পশ্চিম দিকে মাত্র ১০০ মিটারের মত দূরেইে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা নদী। কিন্তু সেই নদীতে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এলাকাটির পানি এখন সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে পড়ে। এলাকাটির পানি নিষ্কাশনের জন্য বুড়িগঙ্গার সঙ্গে যুক্ত করে দিলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না বলে জনিয়েছেন অনেকে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব হোসেন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমাদের এলাকার বাড়ির ছাদ থেকে তাকালেই বুড়িগঙ্গা নদী দেখা যায়। কিন্তু সেই নদীতে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নাই। আমাদের এলাকার পানি সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে পড়ে। এত দূরে ফেরার কি প্রয়োজন ছিল আমার জানা নাই। কারণ এলাকার পাশেই তো বুড়িগঙ্গা নদী আছে। আমার মনে হয় যদি বুড়িগঙ্গা নদীতে এই এলাকার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমাদের এলাকার পানি নেমে যাবে।’

এ প্রসঙ্গে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এলাকাটিতে যেহেতু কোনো খাল নাই তাই জলাবদ্ধতা নিরসন অসম্ভব। আমাদের হাতে কিছু করার নাই। আর পাশে কোনো বুড়িগঙ্গা নদী আছে কিন্তু সেখানে নিষ্কাশন ব্যবস্থাও সহজ বিষয় না।’

ডিএনডি প্রজেক্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি এই এলাকাকে যাতে ডিএনডি প্রজেক্টের মধ্যে নেওয়া যায়। কিন্তু ডিএনডি প্রজেক্টের কাজ এখনো শেষ হয়নি। প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে তো আমরা নতুন করে কোনো এলাকাকে যক্ত করতে পারবো। ডিএনডি প্রজেক্টের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু করার নেই।

ডাইংয়ের বর্জ্য ফেলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও ইউএনও মহোদয় এসে জরিমানা করে গেছেন। ডাইং মালিক মুচলেকা দিয়েছেন যে আর ফেলবেন না। কিন্তু এর পরেও তাঁরা ফেলে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা প্রমাণ না পাওয়ার কারণে কিছু করতে পারছি না। কারণ যখন ভারি বৃষ্টি হয় তখন লুকিয়ে পানি ছেড়ে দেয়। প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতাম।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর