rabbhaban

রক্ত ঝরে রোগীর, এসি রুমে শীতল ডাক্তার


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:২৮ পিএম, ২৬ জুন ২০১৯, বুধবার
রক্ত ঝরে রোগীর, এসি রুমে শীতল ডাক্তার

বাংলাদেশের ধনী জেলা এখন নারায়ণগঞ্জ। সেই তুলনায় নারায়ণগঞ্জের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম নাগরিক সেবাও পান না নগরবাসী এমন অভিযাগ ভুক্তভোগীদের। বর্হিবিভাগে যেমন গরমে হাসফাস করতে রোগীদের তেমনি রোগী নিয়ে জরুরি বিভাগে গেলে পাওয়া যায় না ডাক্তারের হদিস। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ২শ শয্যা থেকে ৩শ শয্যা এরপর ৫শ শয্যায় উন্নিত করার কাজ হলেও সেবার দিক থেকে দিন দিন নিচের দিকেই যাচ্ছে।

গত ৯ জুন সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়ার নারায়ণগঞ্জে শেষ আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে জেলা সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে নারায়ণগঞ্জে সরকারি হাসপাতাল সহ সব হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সিভিল সার্জনও আশ্বাস তখন বলেছিলেন তিনি খুব দ্রুতই হাসপাতালগুলোতে অভিযান পরিচালনা করবেন।

কিন্তু শহরের হাসপাতালগুলোতে এখনো কোনো অভিযান দেখা যাচ্ছে না। ফলে শহরের বেসরকারি হাসপাতালগুলো হচ্ছে বেপরোয়া আর সরকারি হাসপাতালগুলোর ডাক্তার, নার্স সহ অন্যান্য বকর্মকর্তারা বনে যাচ্ছেন জমিদার। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কোনো রোগী আসলে ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না। রোগীকে যত জরুরি অবস্থা নিয়ে হাসপাতালে আসলে ডাক্তারের দেখা পাওয়া যায় না। এদিকে রোগীর অবস্থা আরো অবনতির দিকে যায়। এমন অবস্থাতেও রোগীর আত্মীয় স্বজনদের আকুতি মিনতি যেন তাদের হৃদয় ছুঁতে পারে না। এদিকে ডাক্তারদের অবহেলায় মৃত্যু পথে যাত্রি হচ্ছেন অনেকের প্রিয়জন।

নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নিজের ছেলের চিকিৎসা করাতে এসে এমনি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন দৈনিক যুগান্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদ। পা কেটে রক্ত পড়া অবস্থায় ছেলেকে নিয়ে ২৬ জুন বুধবার ৩০০শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসেছিলেন। ৩০ মিনিট অসহায়ের মত জরুরি বিভাগে অপেক্ষা করেও তিনি ডাক্তারের দেখা পাননি। অসহায় হয়ে বারবার ডাক্তারের জন্য আকুতি মিনতি করেও ডাক্তারের কাছে আনতে পারেননি। এদিকে ছেলের পা দিয়ে রক্ত পরতে পরতে অজ্ঞান হবার উপক্রম। কোন উপায়ান্ত না পেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা করাতে হয় তাকে।

সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের এমন দায়িত্বহীন আচরণে নিজের নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে পোস্টে তিনি লিখেন, ‘খানপুর ২শ’শয্যা থেকে ৩শ’শয্যা করেন আর বহুতল ভবনই করেন, মিটিং করেন, কাড়ি কাড়ি টাকা দেন, কোন লাভ নাই। মানুষ প্রথমেই আসে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। যেখানে ডাক্তারের রুমে এসি আর রোগী গরমে ঘামে আরো বেশী অসুস্থ্য হয়ে যায়। এতশত দানবীর এই শহরে, তারা চিকিৎসা দেশের বাইরে করান কিন্তু কেউ একটা এসি দান করেন। তার চেয়েও বড় বিষয় হল, জরুরী বিভাগের ডাক্তার বাবুদের নবাবী চাল। আমার মত পরিচয়ওয়ালা মানুষের ছেলেকে নিয়ে ৩০মিনিট ডা. অমিত নামের জানোয়ারকে কয়েকবার আকুতি করেও ছেলের কাছে আনতে পারি নাই। পায়ের রক্তে বেড ভরে গেছে, বারবার বলেও সেটা পরিস্কার করাতে পারলাম না। এতো রক্ত দেখে ছেলে আমার চিৎকার করতে করতে অজ্ঞান হওয়ার অবস্থায় গেল। শেষে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিতে হয়েছে, ৩মিনিটে ৩ সেলাই হয়ে গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও এরা ভয় পায় না। ওই মুহূর্তে বাবা হিসেবে কতটা অসহায় ছিলাম বলে বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছিল জানোয়ারটাকে জুতা দিয়া পিটাই। কিন্তু উনি আবার সংথ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিনা। এরপর আবার বের হবে উনি ওই সংগঠনের নেতা, তমুক নেতার আত্মীয়। আমার কমপক্ষে ১০জন সিনিয়র ডাক্তার বন্ধুু আছে, একসাথে লেখাপড়া করেছি। ওরা তো এমন না।’

এর আগে ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ঢাকার মহাখালীস্থ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ডা. মোঃ খলিলুর রহমান। ওই সময়ে তিনি হাসপাতালের জরুরী বিভাগ, প্যাথলজী বিভাগ, এক্সরে ও ইসিজি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, ব্ল্যাড ব্যাংকসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

হাসপাতালের জরুরী বিভাগ পরিদর্শনকালে ডা. মোঃ খলিলুর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জবাসী অনেক ভদ্র বিধায় জরুরী বিভাগের ইট খুলে নেয়নি। নয়তো জরুরী বিভাগের যে অবস্থা তাতে এখানে অবকাঠামো ঠিক থাকার কথা নয়। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ২৪ ঘন্টার জন্য একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট নিয়োগ দিতে হবে।

পাশাপাশি মেডিকেল অফিসারও থাকবেন। ওয়ার্ডগুলো পরিদর্শনকালে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়া গাইনী ওয়ার্ডটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া এক্সরে ও আলট্রাসনোগ্রাম বিভাগেরও হতশ্রী অবস্থা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকদের দেরীতে আসা এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ব্লাড ব্যাংক পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৫০ লাখ লোকের জন্য এই ৩০০ শয্যা হাসপাতাল। এটা কোন উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্লাড ব্যাংক নয়। এই হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক আরো আধুনিক হতে হবে। ব্লাড ব্যাংকটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রতকরণ করা ছাড়াও প্রসেসিং ল্যাব, কালেকশন রুম ও ব্লাড ব্যাংক স্টোর পৃথকীকরণের দিক নির্দেশনা দেন তিনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর